শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

পুঁথি সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান

মাহবুব জামিল

আঠারো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত এক বিশেষ শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের নাম পুঁথি। এ সাহিত্যের অধিকাংশ রচয়িতা এবং পাঠক ছিল মুসলমান সম্প্রদায়।

রেভারেন্ড জেমস লং এ ভাষাকে বলেছেন ‘মুসলমানি বাংলা’ আর এ ভাষায় রচিত সাহিত্যকে বলেছেন ‘মুসলমানি বাংলা সাহিত্য’। বাংলার ঘরে ঘরে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল এ পুঁথি। সন্ধ্যা নামলেই বসত পুঁথি পাঠের আসর, খানিকটা বর্তমানে তালিমে বসার মতো। মুসলিম কবিদের হাতে রচিত পুঁথি বাংলাভাষায় উন্মোচন করেছিল নতুন এক দিগন্তের।

মুসলিম কবিরা পুঁথি সাহিত্য রচনা করার আগে হিন্দুরাও কাব্য রচনা করতেন। কিন্তু তাদের কাব্য ছিল একান্তভাবেই পৌরাণিক; যা কেবল দেব-দেবী ও অতিপ্রাকৃত বস্তুর সঙ্গে জড়িত ছিল। তাতে ছিল না মানবসমাজের প্রসঙ্গ। ছিল না মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেমপ্রীতি, অনুরাগ-বিরাগ, বিরহ-মিলনের কোনো দৃশ্যায়ন। মুসলিম কবিরাই প্রথম পুঁথি সাহিত্যের মাধ্যমে সাহিত্যকে নামিয়ে আনেন একদম মানুষের কাছে, মানুষের হৃদয়ে। তারা তুলে ধরেন মানুষের প্রেম, দুঃসাহসিক অভিযান, অনুভূতির অনাবিল উচ্ছ্বাস। তাদের বর্ণনায় কল্পনা ও অতিকল্পনা ছিল না এমন নয়, তবে কল্পনার নায়ক নায়িকা ছিল এ দৃশ্যমান জগতেরই মানুষ, কোনো দেবতা নয়। হয়তো মানুষের এত কাছে নিয়ে আসার কারণেই মুসলমানদের ঘরে ঘরে পুঁথি এতটা জায়গা করে নিতে পেরেছিল।

বিষয় বিচারে পুঁথি সাহিত্যকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়। ১. রোমান্টিক প্রণয়কাব্য, ২. জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য, ৩. নবি-আউলিয়ার জীবনীকাব্য, ৪. লৌকিক পির পাঁচালি, ৫. ইসলামের ইতিহাস, ধর্ম, রীতিনীতিবিষয়ক শাস্ত্রকাব্য এবং ৬. সমকালের ঘটনাশ্রিত কাব্য।

‘ইউসুফ-জুলেখা’ লিখে রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের সূচনা করেন কবি মুহাম্মদ সগীর। পরে অন্য মুসলিম কবিরা এ ধারায় লিখতে শুরু করেন। ১২৭১ সালে মুন্সী মুহাম্মদ লিখেন ‘লায়লা-মজনু’। ১৩৬৯ সালে মুন্সী খালেক মুহাম্মদ লিখেন ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’। ১৩১৭ সালে মুনশী কমরুদ্দিন লিখেন বেনজির-বদরে মুনীর। জঙ্গনামা কাব্যে রয়েছে আরব-ইরানের ইসলামপূর্ব ও ইসলাম উত্তর যুগের বীর পুরুষদের যুদ্ধবিগ্রহ, রাজ্য জয় ও ইসলাম প্রচারের বর্ণাঢ্য বিবরণ। ১৩৬৮ সালে ইমাম হোসেনের শাহাদাত নিয়ে মোক্তার হোসেন লিখেন ‘ছহি বড় জঙ্গনামা’। ১৩৩৬ সালে মুন্সী মাজহার আলী লিখেন ‘শাহাদতনামা’। ১৩৬০ সালে মুন্সী জোনাব আলী লিখেন ‘জঙ্গে খয়বর’। এতে খায়বার বিজয়ের ঘটনা বিবৃত হয়েছে। এ শ্রেণির কাব্যের মধ্যে রয়েছে আমীর হামজা, জৈগুনের পুঁথি, হাতেম তাই প্রভৃতি গ্রন্থ।

ঐতিহাসিক নবি, পির, আউলিয়ার জীবনকথা, চরিত্র-মাহাত্ম্য ও ধর্ম-প্রচার নিয়ে রচিত হয়েছে নবি-আউলিয়ার জীবনীকাব্য। সুলতান ইউসুফ শাহের সভাকবি শেখ জৈনুদ্দিন লিখেন ‘রাসূল বিজয়’। শেখ ফয়জুল্লাহ মুজাহিদ দরবেশ মেখ ইসমাইল গাজীর জীবন অবলম্বনে লিখেন ‘গাজীবিজয়’। এ শ্রেণির পুঁথির মধ্যে রয়েছে কাসাসুল আম্বিয়া, তাজকিরাতুল আউলিয়া ইত্যাদি। এ শ্রেণির উদাহরণ সত্যপিরের পাঁচালি, গাজীকালু চম্পাবতী, বনবিবির জহুরনামা, লালমোনের কেচ্ছা প্রভৃতি।

পঞ্চম শ্রেণির কাব্যে উঠে এসেছে ইসলামের ইতিহাস, নসিহত, ইসলামের আচরণবিধি ও নীতি-উপদেশ। এরই মধ্যে ১৩২৮ সালে শেখ ওমরুদ্দিন লিখেন ‘খয়রল হাসর’। মুসলিম জাহানের বিশেষ কাহিনিগুলো একত্রিত করে এ পুঁথি লিখেন তিনি। আদম (আ.), হাবিল-কাবিল, নূহ (আ.) এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এতে। এ শ্রেণির আরেকটি কাব্য ‘জওরাকল ঈমান। ১৩৩৫ সালে আছগার লিখেন এটা। এর একটি উপদেশ ‘উপকার কর ভাই খোদার বান্দার/তবে তো করিবে খোদা তব উপকার।’ ১৩২৬ সালে মৌলভী আতাউল্লাহ লিখেন ‘হায়রাতুল ফেকা’। এটি ফিকহের বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরে সাজানো। এ শ্রেণির আরও কয়েকটি কাব্য হলো-মৌলভী ছাজ্জাদ আলীর মোহছেনল ইসলাম, মুন্সী আমানুল্লাহর আহকাম জবে, মুন্সী ফছিহউদ্দীনের ছহি মেছবাহল ইসলাম ইত্যাদি।

মুসলিম কবিরা ভাষা এবং বিষয়বস্তুর দিক দিয়েই কেবল নতুনত্ব আনেননি, বরং আঙ্গিকের দিক দিয়েও প্রবর্তন করেছিলেন নতুন রীতি। মুসলিম কবিদের হাতেই বাংলা সাহিত্য হয়ে ওঠে গতিশীল।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত