সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

পৃথিবীতে প্রথম কোন ভাষার জন্ম?

হাসান হামিদ
পৃথিবীতে প্রথম উচ্চারিত শব্দ কী এ নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল থাকলেও সেটি জানার উপায় নেই। কয়েক দিন ধরে জানতে চেষ্টা করেছি, কোন ভাষাটি সবচেয়ে পুরোনো আর সেটির জন্ম কিভাবে হলো। যদিও সকলেই মোটামুটি জানি, ভাষার মা হলো চিত্রকলা। মানুষ যখন কথা বলা শেখেনি, তখন ভাব প্রকাশ করতো ছবি এঁকে।
 
প্রথম উচ্চারিত শব্দ আর প্রথম ভাষা এক কথা নয়। যখন মনের ভাব মুখে প্রকাশ শুরু হলো, সেই সময়টি কবে? সেই ভাষাটি কোনটি? মানবসভ্যতার ইতিহাসে আকার-ইঙ্গিতের নির্বাক অথবা প্রাক-ভাষা থেকে অন্তত একবার মৌখিক ভাষার জন্ম হয়। এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। কিন্তু এর বেশি কিছু জানা যায় না। বরং বলা হয়ে থাকে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা যেসব জায়গায় অক্ষমতা প্রকাশ করেছে, ভাষার উৎপত্তিবিষয়ক গবেষণা তেমনই একটি স্পর্শকাতর জায়গা। (H. Christiansen, Language evolution. Oxford University Press. pp. 77-93)
 
অ্যাথনোলোগ নামে ভাষার জরিপ প্রকাশকারী একটি সংস্থা আছে। অ্যাথনোলোগের সর্বশেষ তথ্য মতে, পৃথিবীতে মোট সাত হাজার ৯৯টি ভাষা বর্তমানে চলমান। ভাষার শুরুটা কিভাবে হয়েছে, কিভাবে এতগুলো ভাষার জন্ম হয়েছে, কিভাবে ভাষার ক্রমবিকাশ ঘটেছে, এ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের বিরোধের অন্ত নেই। বহু আগ থেকেই এ বিরোধ চলে আসছে। বলা হয়ে থাকে, সর্বপ্রথম প্রাণী ও পাখির আওয়াজ থেকে ধ্বনি তৈরি হয়েছে। এ তত্ত্বের নাম ‘ওউ-ভৌ’ (wow-Bow) তত্ত্ব। এ তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন জার্মান লেখক ও দার্শনিক জুহান গটপ্রেড হার্ডার (Johann Gottfried Herder.)
 
চার্লস ডারউইন বলেছেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ভাষার উৎপত্তি হয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শব্দের ইঙ্গিত, প্রাণীদের আওয়াজ ও মানুষের স্বভাবগত উচ্চারিত ধ্বনির অনুসরণ ও সংশোধন করে।’ (The Descent of Man, and Selection in Relation to Sex, 2 vols. London : Murray, p. 56.)
 
নোয়াম চমস্কি, বিংশশতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ তিনি। এ সম্পর্কে তার একটি অভিমত আছে। তার মতে, ‘ভাষা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। ভাষা মানুষের সৃজনী চেতনার সঙ্গে যুক্ত।’ অবশ্য অনেক ভাষাবিজ্ঞানী এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে ইন্দো-ইউরোপীয় আদি ভাষা থেকে সব ভাষার উৎপত্তি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০ থেকে ৩৫০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে এ ভাষার জন্ম হয়। তবে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়।
 
১৮৬৬ সালে প্যারিসের ভাষাতাত্ত্বিক সমিতি (Linguistic Society of Paris) ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে এত জটিলতা থাকার কারণেই ভাষার উৎসসংক্রান্ত যেকোনো গবেষণাপত্র পাঠে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আজও বেশির ভাগ ভাষাবিজ্ঞানী ভাষার উৎস সম্পর্কে কথা বলতে তেমন আগ্রহী নন, কেননা তাদের মতে ভাষার উৎস নিয়ে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত এতটাই কল্পনাপ্রসূত যে এগুলোকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া সম্ভব নয়।
 
গ্রিক ইতিহাসবিদ হোরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে মিসর সফরে গিয়েছিলেন। মেম্ফিসের মন্দিরের পুরোহিতরা তাকে একটি অদ্ভুত গল্প শুনিয়েছিলেন। কাহিনীটা ছিল মিসরের এক ফ্যারো সামেটিকাসকে নিয়ে।
 
সামেটিকাসের শাসনের আগে মিসরীয়রা ভাবত, তারাই দুনিয়ার প্রাচীনতম জাতি। কিন্তু সামেটিকাসের মনে খুঁতখুঁতানি ছিল, তিনি চেয়েছিলেন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে। তাই তিনি পদক্ষেপ নেন মানুষের প্রথম ভাষা কোনটি তা নির্ণয় করতে। তিনি দুটি সমগোত্রীয় শিশুকে এক মেষপালকের হাতে তুলে দেন। মেষপালকের ওপর কঠোর নির্দেশ ছিল, সে যেন শিশু দুটির সামনে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করে। তার ওপর দায়িত্ব ছিল শিশু দুটিকে কোনো নির্জন স্থানে রেখে আসার এবং নিয়মিত তাদের খাবার-পানি ও অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র সরবরাহ করার। ফ্যারোর ধারণা ছিল, শিশু দুটি প্রথম যে শব্দ উচ্চারণ করবে, সেটাই দুনিয়ার প্রথম ভাষা। আর সে ভাষায় জাতি দুনিয়ার প্রাচীনতম বলে বিবেচিত হবে। মেষপালক একদিন শুনতে পেল, একটি শিশু ‘বেকোস’ বলে চিত্কার করছে। ফ্রাইজিয়ান ভাষায় বেকোস অর্থ রুটি। এ থেকে সামেটিকাস এ উপসংহার টানেন যে ফ্রাইজিয়ান হচ্ছে দুনিয়ার প্রাচীনতম ভাষা। অবশ্য হেরোডোটাসের অর্ধশতক আগে মাইলেটাসের হেকাটিয়াসও মিসরে গিয়ে এ গল্প শুনেছিলেন।
 
অবশ্য দুনিয়ার প্রথম ভাষা ফ্রাইজিয়ান কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও দুনিয়ার প্রাচীন কিছু ভাষা সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়। বিধিবদ্ধ ভাষার আগমন অন্তত ১০ হাজার বছর আগে। প্রথম ভাষা কোনটি, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দুনিয়ার প্রাচীনতম দুটি ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায় ভারতবর্ষে; একটি সংস্কৃত, অন্যটি তামিল। লিপির বয়স অনুসারে সংস্কৃত ভাষার আবির্ভাব খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার অব্দে। ভারতের কিছু গ্রামে এখনো সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার হয়। তামিল ভাষার জন্ম ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে। আবার অনেকে মনে করেন, এ ভাষা আরো পুরনো। তামিল ভাষা এখনো ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। গ্রিক ভাষার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে, যা এখনো ইউরোপে বহুল ব্যবহূত। চীনা ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ অব্দে, শাং রাজত্বে। এ ভাষা বর্তমানে চীনের কোটি কোটি মানুষ ব্যবহার করে। হিব্রু ভাষার বয়স ধরা হয় প্রায় পাঁচ হাজার বছর। ল্যাটিন ভাষার ব্যবহার শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্যে। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫ অব্দকে এ ভাষার ব্যবহার শুরুর বছর হিসেবে গণ্য করা হয়। সংস্কৃতের মতো লাতিনও অনেক ভাষার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ভাষা আরবির প্রথম লিখিত দলিল পাওয়া যায় ৫১২ খ্রিস্টাব্দে। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো লিখিত ভাষা হচ্ছে সুমেরীয় ভাষা, যা কাদার ফলকে লেখা হতো এবং ইরাকে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে লিখিত ফলক পাওয়া গেছে। মিসরের হায়েরোগ্লিফিকের কথা সবারই জানা। চিত্র দিয়ে বাক্য তৈরি হতো এ ভাষায়। এ ভাষার অস্তিত্ব সুমেরিয়া ভাষার কাছাকাছি সময়েই।
 
ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ল্যাংগুয়েজ ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি’র গবেষণায় শনাক্ত করা হয়েছে ৫৭৩টি বিলুপ্ত ভাষা। অবশ্য এসব পরিসংখ্যান নিয়ে কেউ পূর্ণতার দাবি করেন না। কারণ ভাষায় অতল সাগরের তল খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। আর সম্ভবও হবে না, কারণ ভাষায় অনেক উপাদান তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নতুন খোঁজ পাওয়া একটি ভাষা সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মতভাবে জানার আগেই সে ভাষায় শেষ বক্তাটি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে।
 
প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, আগামী ১০০ বছরে দুনিয়া থেকে অন্তত তিন হাজার ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিংগুয়িস্টিকস’-এর তথ্যমতে, দুনিয়ায় ৫১টি এমন ভাষা আছে, যার সর্বশেষ একজন বক্তা জীবিত আছেন। ১০০ জনের কম জানে, এমন ভাষা আছে ৫০০টি। ১ হাজার জন বলতে পারে, এমন ভাষায় সংখ্যা ১ হাজার ৫০০।
 
১৯৯২ সালে এক খ্যাতনামা মার্কিন ভাষা গবেষক দুনিয়াকে চমকে দিয়ে জানিয়েছিলেন ২১০০ সালের মধ্যে দুনিয়ার ৯০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ভিন্ন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুনিয়ার পাঁচটি অঞ্চল থেকে ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। অঞ্চলগুলো হলো সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চল, অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাংশ, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যাঞ্চল, ওকলাহোমা ও দি ইউ. এস. প্যাসিফিক নর্থ-ইস্ট। গত ৫০০ বছরে দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে অর্ধেক ভাষা এবং এখন ভাষা বিলুপ্তির গতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
 
আজ দুনিয়ায় মানুষ যতগুলো ভাষায় কথা বলছে, গতকাল বলেছিল তার চেয়ে বেশিসংখ্যক ভাষায়। সামনের দিনে মানুষের ভাষার সংখ্যা আরো কমে যাবে। ভাষার গুরুত্ব বুঝতে একটি সহজ বিষয় মাথায় নেয়া যায়, বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের অর্জিত জ্ঞানকে সংরক্ষণ করে রাখে। এ ভাষা হারিয়ে গেলে হারায় তাতে মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ভাষাবৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ফেলেছে। বর্তমানে প্রচলিত ভাষার অর্ধেকই চলে গেছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। এর ৯০ শতাংশই এ নতুন শতকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য ইউনেস্কোর প্রতিবেদনের। প্রতিবেদনটি আরো জানাচ্ছে, প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা ব্যবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। ভাবা যায়?


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!