মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০

পোয়েটিকস অব গ্রিন ডেল্টা || মুন্তাকিম আল মাহিয়ান

বেশ কিছুদিন ধরেই একটা বিষয়ে লিখবার জন্য ভেতর থেকে ধাক্কা খাচ্ছি, আর তা হলো অনুবাদ সাহিত্য। অবশ্য এর পেছনে কারণও আছে; যা আমার এই লেখার মাধ্যমেই বুঝতে পারবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে অনুবাদ বিষয়টা খুবই জটিল এবং চ্যালেঞ্জিংও বটে।

এই বিষয়ে জ্যাক দেরিদা, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন এর একটি বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছিলেন,

‘Translation ensures the survival of a text’.

অর্থাৎ, অনুবাদ কোন গ্রন্থ বা মুদ্রিত পাঠ্যবস্তুর টিকে থাকা নিশ্চিত করে। তিনি এও বলেছেন,অনুবাদ সাহিত্যকর্মের অন্যজীবন দেয়-এক নতুন মৌলিক অস্তিত্ব সৃষ্টি করে অপরাপর ভাষায়। তার কথার সাথে আমি একমত কারণ অনূদিত না হলে কি আমরা পারতাম সাত দশকের গ্রীক মহিলা কবি স্যাফোর কবিতা পড়তে? পারতাম না এবং আরো অনেক কিছুই পারতাম না।

আসা যাক মূল কথায়; বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের শুরুটা সম্ভবত হয়েছিল কৃত্তিবাস ওঝার মাধ্যমে যিনি রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন এবং তা তৎকালীন সময়ে সমাদৃত হয়েছিল। তারপর অনেকেই অনুবাদ করেছেন এবং তা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। আমাদের মাইকেলও কিন্তু ইংরেজিতে অনূদিত হোমারের মহাকাব্য পড়েই মেঘনাধবধ কাব্য রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।আবার, বাংলা কবিতায় এডগার এলান পো এবং বোদলেয়ার এর প্রভাব আমাদের জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় বেশ তীক্ষ্ণভাবে স্পষ্ট। এইসব বলার কারণ হচ্ছে, আমরা বিশ্বসাহিত্যের প্রায় সকল অলিগলির সাথে পরিচিত শুধুমাত্র অনুবাদের কারণে। গ্যেটে, দস্তোয়ভস্কি, পুশকিন,পাজ কিংবা লরকা এই সবার সাথে আমরা পরিচিত অনুবাদের মাধ্যমেই।এখন কথা হচ্ছে, তাদের মূল গ্রন্থ কিন্তু আমরা পড়িনি মানে তাদের নিজ ভাষার মূলকে দেখা হয়নি কারণ তার জন্য আপনাকে বহুভাষাবিদ হতে হবে কিন্তু তা আমাদের জন্য মোটামুটি অসাধ্য। তাই এই কাজটার ভাগ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে ইংরেজি ভাষা বেশ অনেককাল ধরেই। আমরা যে বাংলা অনুবাদ পড়ি তার ৯৮ ভাগই ইংরেজি থেকে অনূদিত আর বাকি ২ ভাগ মূল থেকে। এখন কথা হচ্ছে আমরা কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের প্রায় সকল শাখায়ই প্রবেশ করতে পারছি এই অনুবাদের মাধ্যমে, কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের বাংলা সাহিত্য বিশ্বমাজারে কী খুব একটা পরিচিত বা সমাদৃত?

উত্তর হচ্ছে না, এবং এটাই দুঃখের কারণ অথচ আজকে যদি সঠিক উদ্যোগ নেয়া হত তাহলে আমাদের বাংলা সাহিত্য অনেক উঁচুতেই থাকতো বলে আমি বিশ্বাস করি।এক মাইকেল কিছুদিন চেষ্টা করেছিলেন,বিধিবাম পোড়া কপাল তার, সাথে আমাদেরও। তারপর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তার গীতাঞ্জলীর অনুবাদের কারণেই নোবেল পেয়েছিলেন।

তারপর? আর কেউ কি ওইভাবে বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিশ্বমাজারে গিয়েছিলেন অথবা ন্যূনতম চেষ্টা করেছিলেন? হয়তো করেছিলেন কেউ কেউ, অথবা করেননি। আমার মতে কেউ কোনও তাগিদই অনুভব করেননি। কিন্তু এই কাজটা আমাদের সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত জরুরী এবং কর্তব্য বলে মনে করি। আমরা এখন আমাদের কাজ নিজেরা অনুবাদ করে নিজেরাই পড়ছি কিন্তু আমাদের এই ধনরত্ন তো শুধু আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিৎ না বরং পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া উচিৎ।

যাই হোক, অনুবাদ সহজ বিষয় না আগেই বলেছি। এর জন্য দরকার সাহস, ধৈর্য এবং আরো কিছু মৌলিক গুণাবলী।

এখন আসা যাক আসল কথায়, কোথায় যেনো আমি কিছু হবার শব্দ পাচ্ছি। হ্যাঁ, পাচ্ছি। এই সাহস, ধৈর্য নিয়ে একদল তরুণ দিনরাত কষ্ট করে যাচ্ছেন বাংলা কবিতাকে বিশ্বের সাথে নতুনভাবে পরিচিত করার জন্যে। আলোড়ন শুরু হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। তারা বাংলা কবিতাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করবেন এবং সে বই প্রকাশিত হবে ইংল্যান্ড থেকে। দাঁড়ান, What?

জ্বি মশাই এই কাজটাই করা হচ্ছে এবং এই কাজের মূল কারিগর কবি নাঈম ফিরোজ এবং কবি মোসাব্বির আহে আলী। নাঈম ফিরোজ পেশায় জজ এবং উনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পড়াশুনা করছেন।তাদের সাথে আছেন অগ্রজ কবি ও কৃতি অনুবাদক জুয়েল মাজহার ও আমেরিকা প্রবাসী কবি ও অনুবাদক রাজিয়া সুলতানা, আছেন কবি ডাল্টন সৌভাত হীরা, নাহিদ ধ্রুব এবং আরো দুইজন স্বপ্নবাজ।

জানেন, তাদের এই পরিশ্রম আমি টের পাই! আমার মনে হয় কোথাও কিছু একটা হচ্ছে।এই সাহস এবং পরিশ্রম বৃথা যাবার পথ খোলা নেই। Poetics of Green Delta বাংলা কবিতাকে পৌঁছে দিবে বিশ্বদরবারে।

এখন কথা হচ্ছে, অনুবাদ সাহিত্যে সবচেয়ে কঠিন চ্যাপ্টার হচ্ছে কাব্যানুবাদ। কোনও কবিতা অনুবাদ করতে হলে তার মূল ভাষা এবং যে ভাষায় অনুদিত হবে ঐ দুই ভাষার উপরই উপযুক্ত দখল থাকা লাগে। আর একটা কথা হচ্ছে একজন অনুবাদক অবশ্যই একজন মৌলিক লেখক হতে হবে নাহলে অনুবাদ তার প্রান হারাবে এবং পাঠকদের কে মূলের রস থেকে বঞ্চিত করা হবে।আমাদের স্বপ্নের চোখ আরও উপরে উঠে যায় এই কারণে যে, এই উদ্যোগের পেছনের সবাই লেখক এবং সবাই তাদের নিজেদের ধারা তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এটা অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক তাছাড়া, কবি নাঈম ফিরোজ এঁর ইংরেজি ভাষার উপর দখল ঈর্ষা জাগানিয়া। তাহলে এখন শুধু অপেক্ষার পালা এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উনাদেরকে সাহায্য করা কর্তব্য বলে মনে করি।ভালো কিছুর আশা করতেই পারি যদি মানের সঠিক বিচার হয় এবং কবি নাঈম ফিরোজও এই ব্যাপারে দ্বিমত করবেন না আশা করি।

ডাডলে ফিটস একজন মার্কিন অনুবাদক।

উনি বলেছেন,

‘কবিতা অনুবাদে অনুবাদকের অপেক্ষাকৃত কম উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া এবং অধিক পরিমাণে প্রগলভ হওয়া বাঞ্ছনীয়।‘

তাঁর মতে,

‘কবিতা হল একটি ভিন্নতর জনরা যার নিজস্ব সাবলীলতা থাকতে হয়। ফলে ভাষান্তরে নতুন কবিতা সৃষ্টি করা অনুবাদকেরই কাজ’।

শেষ করতে চাই গ্রাসম্যান এর একটি উক্তি দিয়ে,

‘Translation affects creative artists in another. The impact of the kind of artistic discovery that translation enables is profoundly important to the health and vitality of any language and literature’.

অনুবাদ শুধুমাত্র মূলকে স্থানচ্যুতই করেনা অনেক সময় কালচ্যুত ও কৃষ্টিচ্যুতও করে। ফলে অনুবাদকের কাজ জটিলতর হয়ে উঠে।নাঈম ফিরোজ ও এই মহতী উদ্যোগের সাথে জড়িত সবাই জেনেশুনেই এই কাজে হাত দিয়েছেন কারণ তিনি জানেন তিনি কি করছেন, তাঁরা জানেন তাঁরা কি করছেন।

আর এদিকে আমরা শুধু অপেক্ষায় থাকলাম বাংলা কবিতার নতুন পথচলা দেখার।

বাংলা কবিতার জয় হোক।

(লেখাটি আগে ওঙ্কার-এ প্রকাশিত)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত