সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর : টাকা নিয়ে বদলির ‘ভুয়া’ আদেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ জন সহকারী শিক্ষককে বদলির ‘ভুয়া’ আদেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। আদেশ হাতে পেয়ে শিক্ষককরা কর্মরত বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র নিয়ে গত ১৫ দিনেও কোনও বিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষকদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব আদেশ দিয়েছে অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পলিসি ও অপারেশনের পরিচালক খান মো. নুরুল আমিন এর অফিসিয়াল ইমেল থেকে ([email protected]) চট্টগ্রামের পাঁচ জন সহকারী শিক্ষকের বদলির আদেশ পাঠানো হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের অফিশিয়াল ([email protected]) ইমেলে। পরিচালকের অফিশিয়াল মেইল থেকে এই ইমেল পাঠানো হয়েছে ওই দিন দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটের সময়।

আদেশ পাওয়া শিক্ষদের মধ্যে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার সুখছড়ি রহমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রিমা দাসকে বদলি করা হয়েছে পাঁচশাইল উপজেলায় (যেকোনও স্কুলে)। ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব ফরহাদাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাসিনা বেগমকে ডবলমুরিং উপজেলার মাদারবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আনোয়ারা উপজেলার পূর্ব বোয়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাহমিনা ফেরদৌসীকে পাহাড়তলীর যেকোনও স্কুলে। বোয়ালখারী উপজেলার ২৮ নম্বর শাকপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিলকিস আরা বেগমকে বদলি করা হয়েছে বন্দর উপজেলার দরবেশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এছাড়া আরও একজন শিক্ষককে ‘ভুয়া’ বদলির আদেশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর।

আদেশগুলোর প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক জালাল উদ্দিন (পলিসি ও অপারেশন) স্বাক্ষর করেন। তবে আদেশের মূল স্বাক্ষরকারী হিসেবে তার নাম থাকলেও স্বাক্ষরের জায়গা ফাঁকা। এই আদেশ উপপরিচালকের দফতরে পাঠানো হলেও জেলা শিক্ষা অফিস কিংবা উপজেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়নি। তবে আদেশের কপি পৌঁছে গেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের হাতে হাতে। শিক্ষকরা আদেশ হাতে পেয়ে কর্মরত বিদ্যালয় থেকে বদলি করা স্থানে যোগদানের জন্য যান। কিন্তু জেলা শিক্ষা অফিস যোগদান করাতে গিয়ে তাদের আদেশগুলো দেখে সন্দেহ হলে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এরপর থেকে বদলি হওয়া পাঁচ শিক্ষক ঘুরছেন যোগদানের জন্য।

অধিদফতর থেকে ইমেলে পাঠানো আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. সুলতান মিয়া বলেন, ‘ইমেইল পেয়েছি। এই ইমেলের বিষয় নিয়ে অধিদফতরকে জানিয়েছি।’

চট্টগ্রামের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানা বলেন, ‘পাঁচ শিক্ষককের আদেশ উপরিচালকের দফতরে পাঠানো হলেও জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠানো হয়নি। আদেশগুলো নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় শিক্ষকদের যোগদান করতে দেওয়া হয়নি।’ গত ১৬ এপ্রিল মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

অধিদফতের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) খান মো. নুরুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাকে এ বিষয়টি অবহিত করে সেলফোনে ম্যাসেজ দেওয়া হয় এবং কয়েক দফায় ফোন দেওয়া হলেও তিনি কোনও উত্তর দেননি।

আদেশ স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) মো. জালাল উদ্দিনের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। সেলফোনে ম্যাসেজ দিয়ে বিষয় সম্পর্কে জানান চেষ্টা করলেও কোনও উত্তর দেননি এই কর্মকর্তা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন বলেন, ‘বদলির আদেশের এই ইমেইল কীভাবে গেল বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। বদলির আদেশে যদি কোনও টাকার লেনদেন হয়ে থাকে তাহলে যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের সবার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘ভুয়া’ আদেশ পাওয়া শিক্ষকদের স্বজনরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অধিদফতরের পলিসি ও অপরাশেন পরিচালকের দফতর আদেশ দিয়েছে প্রতি শিক্ষকের কাছ থেকে চার লাখ করে টাকা নিয়ে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিসে মেইল পাঠিয়ে ভুয়া আদেশেই যোগদান করাতে চেয়েছিলেন অধিদফতরের কর্মকর্তারা। কিন্তু চট্টগ্রাম জেলার শিক্ষা অফিসারের আদেশ দেখে সন্দেহ হলে তা আটকে দেন।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত