সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

ফিকশন লিখছেন তো?

আন্দালিব রাশদী

‘পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজগুলোর একটি হচ্ছে ফিকশন লেখা।’ আমার এই কথাটি শোনার পরপরই যে কেউ বলতে পারেন, এত সহজ কাজই যখন, আপনি এসব ছাইপাস কী লিখছেন? ওগুলো তো কিছুই হচ্ছে না। বানিয়ে বানিয়ে একটার পর একটা বাক্য বসিয়ে গেলেই গল্প হয় না, উপন্যাস হয় না। আপনি পরাবাস্তববাদ বোঝেন? জাদুবাস্তববাদ? উত্তরাধুনিকতাবাদ সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার?

এই কথাগুলো যিনি বলছেন, তিনি ঠিক ধরে ফেলেছেন, ওসব বাদ-বিসম্বাদ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। গপ্পো-উপন্যাস লেখার ডিগ্রি দূরে থাক, ওসবের কোনো প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, ক্লাস, টিউটোরিয়াল কোনোটাতেই আমি যাইনি; যাবার সুযোগও পাইনি।

তার কথাতে একটি বড় ধরনের স্বীকৃতি কিন্তু রয়েছে। তা হচ্ছে :বানিয়ে বানিয়ে লিখতে পারা।

আমি বানিয়ে বানিয়ে ভালো হোক মন্দ হোক লিখতে পারি। আপনি কি পারেন? অবশ্যই পারেন। এখনই হিসেব করতে বসুন বিভিন্ন সময়ে আপনার প্রিয়জন ও বন্ধুদের উল্লেখযোগ্য কোন কোন মিথ্যে কথা বলেছেন। আপনি যখন নেহায়েত অপ্রাপ্তবয়স্ক, গভীর মনোযোগ দিয়ে ‘অনলি ফর অ্যাডাল্ট’ ধরনের একটি বই পড়ছেন, মা জিজ্ঞেস করলেন, কী পড়ছিস?

আপনি বললেন, বাংলা সেকেন্ড পেপার, একের ভেতর পাঁচ।

আপনি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় বসলেনই না, অথচ রেজাল্টের পর বাড়ি বাড়ি মিষ্টি পাঠিয়ে বললেন, অল্পের জন্য ফার্স্টক্লাস মিস হয়ে গেল। আপনার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটির বিরুদ্ধে যখন মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাকে রক্ষা করার জন্য চোরাই সেটটি নিয়ে আপনি হাজির হয়ে বললেন, আসলে চুরিটা আমিই করেছি।

আপনার প্রতিবেশী যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি সম্পর্কে আপনার মধ্যে কোনো অনুভূতিই জাগেনি, আপনি তাকে বললেন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর সে বিশ্বাস করে বসল, শুরু হলো ভিন্ন এক অধ্যায়।

তাহলে আপনার এইসব সৃজনশীল মিথ্যেগুলোকে সাজিয়ে মিথ্যে বলার কাহিনিগুলোকে লিখে ফেলুন। এই মিথ্যেগুলো যদি সুন্দর করে সাজাতে পারেন, আগামী বইমেলাতেই আমরা পাচ্ছি আপনার প্রথম উপন্যাস ‘আমার মোহন মিথ্যেগুলো’।

‘আপনি কি ভাবতে পারেন?’

জবাব ‘হ্যাঁ’।

‘আপনি কি গল্প করতে পছন্দ করেন?

জবাব ‘হ্যা’।

যথেষ্ট। এই দুটো হ্যাঁ-ই আপনার ফিকশন লেখক হবার প্রধান পূর্বশর্ত।

দ্বিতীয় শর্তটি আরো শিথিল করা যায়। আপনি গল্প করতে হয়তো পছন্দ করেন না, কিন্তু একটার পর একটা কাহিনী মনে মনে সৃষ্টি করতে পারেন।

বেশ এবার লিখতে বসে যান।

আপনি বলবেন, আমার লিখার অভ্যাস নেই, আমার লিখার সময় নেই, আমার বাড়িতে লেখার পরিবেশ নেই, দেশের অবস্থা লেখালেখির অনুকূলে নয়।

এর জবাব কী হতে পারে?

আগে লিখতে বসুন। বসতে বসতে অভ্যাস হয়ে যাবে। লেখার সময় বলে আলাদা কোনো সময় নেই। দিনে আঠার ঘণ্টা খাটাখাটনি করার পরও লেখার সময় অনেকেই বের করে নিয়েছেন। লেখার পরিবেশ বলে প্রকৃতি নির্ধারিত কোনো পরিবেশ নেই, আপনি যে পরিবেশে বসবাস করছেন এটাই লেখালেখির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিবেশ। প্রতিকূল অবস্থাতেই শ্রেষ্ঠ ফিকশনগুলো লিখা হয়েছে। দেশের পরিস্থিতির দোহাই দেবেন না। আপনি বলবেন, ভাষার ওপর আপনার খুব একটা দখল নেই। বাক্য গঠন ভুল হয়, আপনি বানানেও কাঁচা।

তাতে কোনো সমস্যা নেই।

ভাষার ওপর আপনার যে বন্ধুটির দখল আছে, যিনি শুদ্ধ বাক্য লিখতে পারেন এবং যিনি বানানে পাকা, ঠিকঠাক করে দেবার জন্য তার হাতে আপনার লেখাটি তুলে দিন। এই বন্ধুটিই আপনার প্রথম সম্পাদক।

বানিয়ে বানিয়ে লেখার মানুষেরই অভাব, অন্য কাজ করানোর মতো কাউকে না কাউকে পাবেনই।

আপনি বলবেন, ‘আমার কলম সরছে না, আমার রাইটার্স ব্লক রোগ হয়েছে।

প্রথমত, রাইটার্স ব্লক আদৌ কোনো রোগ নয়। দ্বিতীয়ত, আপনার যদি এ রোগ হয়েও থাকে, যা বলার, মুখে বলুন এবং ভয়েস রেকর্ড করিয়ে নিন। কেউ এটা শুনে শুনে আপনার কথাহুলো লিখে দেবেন। দেখুন, রাইটার্স ব্লকের কথা শোনা গেলেও স্পিকার্স ব্লক বলে কোনো রোগ সত্যিই নেই।

সুতরাং যিনি কল্পনা করতে পারেন, একটু কেবল কষ্ট করলে তিনিই হতে পারেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক—ফিকশন রাইটার।

আর একটি কথা, যদি একটু গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারেন, তাহলেও পারবেন। আপনিই হতে পারেন আগামীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন রাইটার।

বানিয়ে বলার সমর্থনে আমি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে চাই। মার্কেজ বাইবেলের সূত্র ধরে বলেছেন, যেদিন জোনাহ বাড়ি ফিরতে কেন দেরি হলো সে কৈফিয়ত্ দিতে গিয়ে স্ত্রীকে বললেন, তিমি মাছ তাকে গিলে ফেলেছিল, সেদিনই পৃথিবীতে ফিকশন সৃষ্টি হয়েছে।

আলবেয়র কাম্যু বলেছেন, ফিকশন হচ্ছে মিথ্যে যার মাধ্যমে আমরা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করি।

চাঁছাছোলা সত্য খুব একঘেয়ে ধরনের, ফিকশনই এটাকে উপভোগ্য করে তোলে। একালের ঔপন্যাসিক খালেদ হোসেইনি বলেছেন, বৃহত্তর সত্যে উপনীত হবার জন্য সারি সারি মিথ্যে বুননের যে শিল্পকলা সেটাই ফিকশন।

এ কাজটি করার জন্য দরকার কল্পনা, কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লিখতে শুরু করুন, আজই। এর চেয়ে ভালো সময় আপনার জীবনে আর আসবে না। ‘পারফেক্ট টাইম’-এর অপেক্ষা করে লাভ নেই, কারণ লেখালেখির জন্য পারফেক্ট টাইম বলে কোনো সময় নেই।

লিখতে বসে মনে হলো, তাই তো, কী লিখব?

তাহলে কয়েকটা বই পড়ে ফেলুন।

আপনি বই পড়তে চান না? তাহলে কেন আশা করেন অন্যরা আপনার বই পড়বে?

রাইটার্স ওয়ার্কশপ নিয়ে একটি কৌতুক শুনুন।

একজন প্রবীণ লেখক ও শিক্ষক নতুন লেখকদের ওয়ার্কশপে কিছুক্ষণ পরপরই নতুন লেখকদের আরো বেশি করে বই পড়ার ওপর জোর দিলেন।

বিরক্ত হয়ে ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণকারীদের একজন বললেন, দেখুন স্যার, আমরা এখানে লেখক হতে এসেছি, পাঠক হতে নয়।

তারপরও খ্যাতিমান ফিকশন লেখকদের দেওয়া কিছু টিপস তুলে ধরছি, কাজে লাগতেও পারে।

১. বিষয় নির্বিশেষে সবকিছু পড়ুন। সর্বত্রই আপনার লেখার উপাদান ছড়িয়ে আছে।

২. যা-ই মনে আসছে, একটি নোটবইতে টুকে  রাখুন। যে প্লটটি মাথায় এসেছে তিন মিনেটের মধ্যে তা হারিয়ে যাবে যদি না এটা নিয়ে ক্রমাগত ভাবতে থাকেন।

৩. আন্তন চেখভ বলেছেন, চাঁদ কিরণ ছড়াচ্ছে—আমাকে এ কথা বলতে যাবেন না, বরং আমাকে দেখিয়ে দিন ভাঙা কাচের টুকরোর ওপর চাঁদের আলোর প্রতিফলন ঘটছে।

৪. যদি কম্পিউটারে কাজ করেন, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে নিন। ইন্টারনেট আপনার লেখার অনেকটা সময় হরণ করে নেবে।

৫. লেখকজীবন অনেকটা নিঃসঙ্গ কারাবাসের মতো। এ জীবনটাকে উপভোগ করুন।

৬. আপনার বিস্মিত হবার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

৭. লেখার মাঝখানে আতঙ্কিত হবেন না। আপনার লেখা ভালোই এগোচ্ছে।

৮. নিজেই নিজের সম্পাদক ও সমালোচক হতে অভ্যস্ত হয়ে উঠুন।

৯. ‘টেনশন’ দিয়ে আপনার ফিকশন শুরু করুন। আপনার চরিত্রগুলোকে ভালো করে চিনে নিন।

১০. দু’পাতা পড়তে না পড়তে পাঠক যেন আপনার মনের সব কথা বুঝে না ফেলে, সতর্ক থাকুন। কোনো কোনো পাঠক আপনার চেয়েও স্মার্ট।

১১. বাস্তব জীবনই আপনার প্রধান উত্স। এখান থেকে বেছে বেছে কাহিনি তুলে আনুন।

১২. চরিত্রের বর্ণনা দেবেন না। বরং কাজ ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে চরিত্রকে প্রকাশ করুন।

১৩. নায়কের সবই ভালো আর ভিলেনের সবই খারাপ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন।

১৪. প্রথম পুরুষে লিখবেন না তৃতীয় পুরুষে লিখবেন, আপনিই ঠিক করুন।

১৫. পাঠক কেন গাঁটের পয়সা খরচ করে আপনার বই কিনবেন তার কিছু কারণ বের করতে চেষ্টা করুন।

বড় লেখকরা কী করেন? কী করতেন?

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বললেন, ‘আমি যখন একটা বই কিংবা একটা গল্প লিখতে চাই, দিনের আলো ফোটার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লিখতে বসি।’

শান্ত ও শীতল ভোরে বিরক্ত করার মতো কেউ নেই। নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে হেমিংয়ে লিখে যান।

ইবি হোয়াইট বললেন, লেখালেখির জন্য আদর্শ অবস্থার জন্য যেসব লেখক অপেক্ষা করেন শেষ পর্যন্ত তাদের একটি শব্দও লিখা হয় না।

একালের অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, যখন আমি একটি উপন্যাস লিখতে যাচ্ছি, আমি ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে পাঁচ থেকে ছ’ঘণ্টা লেখালেখির কাজ করি। সন্ধ্যায় দশ কিলোমিটার দৌড়াই বা ১,৫০০ মিটার সাঁতার কাটি, কিংবা দুটোই করি। তারপর ফিরে এসে কিছুক্ষণ পড়াশোনা, গান শোনা। আমি রাত ন’টায় ঘুমোতে যাই। কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে এ আমার প্রতিদিনের রুটিন। এই পুনরাবৃত্তি আমার জন্য গরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। এটা একধরনের মন্ত্রমুগ্ধকরণ। গভীর মনোনিবেশের জন্য আমি এভাবে নিজেকে সম্মোহিত করি। ছ’মাস বা এক বছরের জন্য এ ধরনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যথেষ্ট মানসিক ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়। এক অর্থে উপন্যাস রচনা আমার জন্য টিকে থাকার প্রশিক্ষণের মতো। শৈল্পিক সংবেদনশীলতার মতো শারীরিক শক্তিও প্রয়োজন।

লেখার সময় কেউ গান শোনেন, ইবি হোয়াইট মোটেও গান শোনেন না। গান তাঁর অভিনিবেশে বিঘ্ন ঘটায়।

খালেদ হোসেইনি বললেন, লিখতে ভালো লাগুক আর না-ই লাগুক, আপনাকে লিখতে হবে, প্রতিদিনই।

হেনরি মিলার লেখালেখির কিছু টিপস দিয়েছেন—

১. শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি বিষয় নিয়েই লেগে থাকুন।

২. ‘মুড’-এর নির্ভর করে লিখবেন না, বরং লেখালেখির যে রুটিন তৈরি করেছেন তা অনুসরণ করুন।

৩. নার্ভাস হবেন না। শান্তভাবে, আনন্দের সঙ্গে হাতে যা আছে তা নিয়েই বেপরোয়া হয়ে কাজ করুন।

৪. আপনি কী কী বই লিখতে চান, ভুলে যান, যেটা লিখতে শুরু করেছেন, সেটাই শেষ করুন।

৫. সবার আগে লেখালেখি। তারপর পেইটিং, গান বন্ধু-বান্ধব, সিনেমা।

একালের লেখক নাথান ইংল্যান্ডার বললেন, লিখতে হলে সবার আগে আপনার সেলফোনের সুইচ অফ করুন।

কীভাবে লিখবেন? চেয়ার-টেবিলে বসে? মেঝেতে উবু হয়ে? দাঁড়িয়ে উঁচু ডেস্কে? না, বিছানায় শুয়ে?

চার্লস ভিকেন্স দাঁড়িয়ে লিখতেন। দাঁড়িয়ে লেখালেখিতে অভ্যস্ত ছিলেন :আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, লুই প্যারোল, ফিলিপ রথ (এখনো তা-ই করেন), ভার্জিনিয়া ওলফ, ভ্লাদিমির নবোকভ, উইনস্টল চার্চিল।

শুয়ে শুয়ে লিখতেন মার্ক টোয়েন, মার্শেল প্রুস্ত, জর্জ অরওয়েল, এডিন ওয়ার্টন, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, ভলতেয়ার, ট্রুম্যান ক্যাপোট।

ভিক্টর হুগো পুরো নগ্ন হয়ে লিখেছেন ‘দ্য হান্ডচব্যাক অব নতরদাম’। বালজাক লেখালেখির সময় খেতেন প্রচুর কফি।

বাথটাবে শুয়ে, বসে লিখতেন—আগাথা ক্রিস্টি, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, ডি এইচ লরেন্স।

লেখালেখির সময় প্রচুর সিগারেট খেতেন : রুডিয়ার্ড কিপলিং, মার্ক টোয়েন ও জর্জ স্যান্ড।

লেখালেখির আগে আগে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মাইল হাঁটতেন চার্লস ডিকেন্স

আপনি কী করতে চান? যা-ই করুন, লিখুন। ফিকশন আপনার হাতের মুঠোয়। অন্তত নিজের জীবনের গল্পগুলো লিখুন।

আপনার কাহিনি আরো দশজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। ফিকশনের জাদুকরী চুম্বকীয় প্রভাব রয়েছে। ফিকশন মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, উজ্জীবিত করতে পারে। সে জাদুর কলম তো আপনারই হাতে।

[দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত ওয়ার্কশপে ফিকশন বিষয়ক আলোচনা অনুসরণে সংক্ষেপে লিখিত]

 


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত