বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০

ফুঁ চিকিৎসার সাতকাহন

ডা: নুসরাত জাহান
এসোসিয়েট কনসালটেন্ট (গাইনী-অবস), ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।

সম্প্রতি ফেসবুকে দেখা গেল জনৈক কবিরাজ মাইকে ফুঁ দিয়ে হাজার হাজার মানুষের রোগ ভালো করে দিচ্ছে, আবার আরেকজন সাপের মত নেচে নেচে অন্ধ রোগী ভালো করার চেষ্টা করছেন। এসব দেখে হয়তো আমরা হাসাহাসি করছি, কিংবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষগুলোকে নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছি। কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখুন তো হাজার হাজার মানুষ ওখানে ভিড় জমাবেন কেন? তাহলে কি কিছু কিছু রোগ সত্যিই ভাল হচ্ছে?

সত্যিই তাই। কারণ আমরা বেশিরভাগই মনস্তাত্ত্বিক রোগে আক্রান্ত। আর এই রোগের একমাত্র চিকিৎসা বিশ্বাস কিংবা ভক্তি থেকে মুক্তি। স্বল্পশিক্ষিত লোকেরা তখন কবিরাজের ফু নিয়ে ভালো হয় এবং সমাজের উচ্চবিত্তরা ইন্ডিয়া, ব্যাংকক কিংবা সিঙ্গাপুর গিয়ে ভালো হয়। এখনো সন্দেহ থাকলে হয়তো এই লেখাটি পড়তে পড়তে বিশ্বাস হয়ে যেতে পারে।

আমি বছর কয়েক আগে সাভারের নবীনগরে একটি চেম্বার এ যেতাম, যেখানে প্রায় ৩০-৪০ জন মহিলা রোগী আসত। এদের অর্ধেকের বেশি রোগীর কোন প্রকৃত রোগ ছিল না। এদের সমস্যার উৎপত্তিস্থল ছিল অ-সুখ অর্থাৎ সাংসারিক নয়-সুখ থেকে। প্রথাগত ওষুধ এখানে ভালো কাজ করে না।

অন্যদিকে ডাক্তার তার রোগ ধরতে পারছে না- একথা বলে দালালরা তাকে এক ক্লিনিক থেকে অন্য ক্লিনিকে ঘুরাতো। এতে করে তাদের মুনাফা বাড়ত ঠিকই কিন্তু রোগীরা মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে যেত। এমন অবস্থায় তারা যদি ভক্তিভরে কিংবা বিশ্বাস করে পানি পড়া খায় তবেই রোগ ভাল হওয়া সম্ভাবনা থাকে। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এ ধরনের রোগীকে যদি বেশি বেশি টেস্ট না দেয়া হতো এবং শুধুমাত্র বলা হত যে আপনার তেমন কোন সমস্যা নাই- তাহলে তারা দ্বিতীয়বার আর আসতো না, ভাবত তাদের সমস্যা গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ কারণে দেখা যায় গ্রামে গঞ্জের পল্লী চিকিৎসকদের কাছে যে কোন সমস্যা নিয়ে গেলেই প্রেসক্রিপশনের এ মাথা থেকে ও মাথা ওষুধ ধরিয়ে দেবে। এর একটি কারণ হলো কোন রোগ সম্পর্কেই এদের প্রকৃত ধারণা নেই এবং দ্বিতীয়তঃ রোগীকে বুঝানো যে তার জটিল রোগ হয়েছে, এবং তার ওষুধেই সে ভালো হয়ে যাচ্ছে।

এর দুঃখজনক ফলাফল এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, যা এখন আমাদের কাছে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। যেমন খুশি তেমন করে চিকিৎসা শুধুমাত্র আমাদের এই সাবকন্টিনেন্টের কান্ট্রি গুলোতে বেশি দেখা যায়, যেখানে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন, আর রোগীকে স্যাটিসফাই করার একটি প্রতিযোগিতা চলছে।

আমার চেম্বার জীবনের শুরুতে এক প্রেগনেন্ট পেশেন্ট এসে জানালো তার আগের বাচ্চার মিসড অ্যবর্শন ছিল তখন তাকে প্রজেস্টেরন দেওয়া হয়েছিল, এখন আমি এটা দিব কিনা! আমি তাকে কাউন্সেলিং করে জানালাম কেন এই ওষুধের প্রয়োজন নেই। পরবর্তীতে তার ওই বাচ্চাও যখন এবরশন হলো তখন সে আর এমুখো হলো না, তার ধারণা প্রোজেস্টেরন দিলে এই বাচ্চাটি নষ্ট হতো না। বুঝতে পারলাম বাঙ্গালীদের জন্য ঝাড়ফুঁক চিকিৎসা কতটা মূল্যবান।

যে যত এজাতীয় চিকিৎসায় পারদর্শী সে ততই জনপ্রিয় ডাক্তার। ভালো হলে ডাক্তারের কেরামতি, ভালো না হলেও বুঝে নেয় ডাক্তার অনেক অভিজ্ঞ তাই অনেক ধরনের চিকিৎসা জানে। এই সুযোগে আমাদের দেশের ওষুধ শিল্প তারা ব্যাঙের ছাতার মত একের পর এক নতুন নতুন ওষুধ উপহার দিয়ে যাচ্ছে- যা অন্য কোন দেশে দেখা যাবে না।

পৃথিবীর সব উন্নত দেশগুলোতে এখনো ডাইক্লোফেন, এমোক্সিসিলিন জাতীয় প্রথম দিকের ওষুধগুলো চলছে আর আমাদের দেশে আমরা এই ওষুধ গুলোর নাম প্রায় ভুলতে বসেছি। এই ওষুধ কালচারের একটি ভয়াবহ ফলাফল হচ্ছে প্রোজেস্টেরন ওষুধের যথেচ্ছা ব্যবহার, যা প্রেগনেন্সিতে এখন জাতীয় ঔষধে পরিণত হয়েছে।

কিছুদিন আগে চেম্বারে এক রোগী এসে বলল তার আগের প্রেগনেন্সিতে সে প্রোজেস্টেরন খেয়েছিল। আমি এই প্রেগনেন্সিতে দেইনি, এজন্য তার নাকি একটু ভয় ভয় লাগছে। বুঝাতে চাইলাম অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া আর হুজুরের পানি পরার মধ্যে বেসিক্যালি কোন পার্থক্য নেই। বরঞ্চ যেকোনো ওষুধের কিছু সাইড ইফেক্ট থাকে, যা অপকার ছাড়া কোন উপকার করবে না।

আমার এক আত্মীয়ার কথা দিয়ে শেষ করছি, যিনি ইনফার্টিলিটি/বন্ধ্যাত্ব সমস্যার জন্য ইন্ডিয়ায় ট্রিটমেন্ট করাচ্ছিলেন। আমাকে তার প্রেসক্রিপশনের ওষুধ গুলো দেখিয়ে জানতে চাইল এগুলো কি জন্য খাচ্ছে। ইন্ডিয়ান ওষুধের নাম গুলো আমার কাছে অপরিচিত, তাই ইন্টারনেট দেখে এক এক করে যখন জানালাম এগুলো আর কিছুই না, আমাদের দেশের অতি পরিচিত কিছু ভিটামিন ওষুধ- তখন দেখলাম তার মুখটি অন্ধকার হয়ে গেল। হয়তো সে ভেবেছিল এগুলো এলিয়েন টাইপের কোন ওষুধ, যা বাংলাদেশ পাওয়া যায় না।

এটাই হয়তো সাইন্স। অনেক টাকা খরচ করে যখন একই ওষুধ আরেক দেশ থেকে কেনা হয়, তখন হয়তো এই ভিন্ন নামের ওষুধগুলো কবিরাজের ফুঁ-য়ের মতোই কাজ করে। এভাবে আমরা সবাই মোটামুটি বুঝে কিংবা না বুঝে ফুঁ এর উপরেই আছি।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত