বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০

বইকেন্দ্র প্রকাশ করেছে আবদুল আযীয আল আমানের ছয়টি গ্রন্থ

বাংলাদেশে এই প্রথম আকাঙ্ক্ষিত সাড়ম্বরে প্রকাশিত হলো আবদুল আযীয আল আমান রচিত ছয় ছয়টি বই একত্রে। বইগুলো প্রকাশ করেছে বাংলাবাজারস্থ বইকেন্দ্র পাবলিকেশন। বই ছয়টি হলো : ১. রৌদ্রময় নিখিল, ২. আলোর আবাবিল, ৩. আলোর রাসূল আল-আমীন, ৪. সেই ফুলেরই রৌশনিতে, ৫. মানুষের নাবী, ৬. অনন্তের দিকে।

এই আবদুল আযীয আল আমান (১৯৩২-১৯৯৪)। অধুনা লেখকশ্রেণি বা আমাদের তরুণ পাঠককুল, কেউ-ই তেমন চেনেন না আবদুল আযীয আল আমানকে। অথচ (পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার) বিভাজন উত্তর সময় পর্যন্ত আমান ছিলেন ত্রিমাত্রিক ব্যক্তিত্ব―একাধারে বিদগ্ধ শিক্ষক, লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক ও সুদক্ষ সাহিত্যপত্র সম্পাদক।

লেখকের জন্ম কলকাতার ২৪ পরগনায়। সেখানেই বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ.। ১৯৬৪ সালের দেশভাগের সময় আবদুল আযীয আল আমান ঢাকায় চলে আসেন। এখানে জগন্নাথে শিক্ষকতা করেন। এর কিছু দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবারও কলকাতায় চলে যান। সেখানে গিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রেস ও পাবলিকেশন (হরফ প্রকাশনী)। এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তিনি সফলতা অর্জন করেন। 

দেশে ফিরে আমান আরও একটি কাজ শুরু করেন তিনি। পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখালেখি। পুরোপুরি এতে মনোনিবেশ করেন আমান। তিনি ‘জাগরণ’, ‘কাফেলা’, নব কলবরে দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘কাফেলা’ (১৯৮১), সাপ্তাহিক ‘নতুন গতি’ (১৯৮৪), ‘হরফ প্রকাশনী’ করে সংবাদ সাহিত্য সংস্কৃতি, প্রকাশনী জগতের এক নতুন দিশা তৈরি করেছিলেন। শুধু কি তাই? শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি-সংবাদ- ও প্রকাশনা জগতে হিন্দু-মুসলিম- সমন্বয় ও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভুমিকা তিনি পালন করেছিলেন। আমানের জাগরণ-কাফেলা-নতুন গতি-হরফ ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি স্বর্ণযুগ। তৈরি করেছিলেন এক লেখক গোষ্ঠী–যারা মূল স্রোতের সাহিত্য পত্রিকা বা প্রকাশকদের চ্যালেঞ্জ দিতে পারতেন। কলকাতায় এম আব্দুর রহমান, কবি মাহমুদুল হক, আব্দুর রাকিব, এ মান্নাফ, সৈয়দ আব্দুল বারি, আবু আতাহার, সৈয়দ আসরার আহমেদ, মহম্মদ আইয়ুব হোসেন, মাসুদ উর রহমান, ইবনে ইমাম, রফিকুল্লাহ, আব্দুর রউফ (নদীয়া), রবিউল হোসেন খান, খাজিম আহমেদ (বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ), আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রেজ্জাক, হাফিজুর রহমান, এমদাদুল হক নুর, আব্দুর রব খান, ফিরোজা বেগম, আজরা বানু, মহম্মদ মতিউল্লাহ, আনজু বানু, সামশুল আলম, মুজতুবা আল মামুন সহ এক ঝাঁক কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক লেখক উঠে এসেছিলেন আমানের সাহিত্যপত্রিকা এবং চর্চার জায়গা তৈরি করে দেওয়ার কারণেই।

বিশেষ ধারার (ইসলামি সাহিত্য) যে লেখালেখি দিয়ে আমান নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন, তার যাত্রা বাংলাদেশে থাকতেই শুরু হয়েছিল। ঢাকা থেকে প্রকাশিত শিশু সাহিত্যমাসিক ‘সবুজপাতা’য় প্রাথমিকভাবে হাদিসের ঘটনাগুলো নিয়ে গল্প লেখা শুরু করেন। এবং এই পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলোই পরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ বই আকারে প্রকাশ করে। তখন বইটি এত জনপ্রিয় হয় যে, খুব সামান্য সময়েই তার কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়তে এই মানুষটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আল মাহমুদ, শামসুর রহমান, শহীদ কাদেরি, আল মুজাহিদী, ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, বশির আল হিলাল, বদরুদ্দিন উমর, বুলবুল সারওয়ার–সবার সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল।

আবদুল আযীয আল আমান এই ছয়টি বই লিখেছিলেন তার লেখক-জীবনের দ্বিতীয় ধাপে। এছাড়া শেষজীবনে তিনি নিজেকে বহির্জগৎ থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন। নবীজীবনের দ্যুতি, হাদিসের গল্পভাষ্য নির্মাণ করার তাড়না তাকে এতই আলোড়িত করেছিল যে, তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন একটি নতুন ভাষা নির্মাণের। যে ভাষায় নবীজীকে তুলে আনা যাবে অনায়াসে। যে ভাষা সাধারণ ভাষা থেকে হবে অনন্য উচ্চতায় আসীন। আর, সত্যি বলতে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আনন্দের ও গর্বের বিষয় হলো, আমান তা পেরেছিলেন। নবীজির হাদিসের গল্পভাষ্য নির্মাণে তিনি এমনই এক ভাষা রচনা করেছিলেন, যা সত্যিকার অর্থেই ছিল অনন্য অসাধারণ। সদ্য প্রকাশিত বইয়ের প্রতিটিই যার সাক্ষর বহন করছে।

বইগুলো বইকেন্দ্র পাবলিকেশনের বাংলাবাজারস্থ বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া অনলাইনে সবগুলো বুকশপেই পাওয়া যাচ্ছে দেশব্যাপী।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত