সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১

বইমেলা নিয়ে সাম্প্রতিক ভাবনা : মেহেদী হাসান শোয়েব

বইমেলা হওয়া উচিত বা অনুচিত নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। করোনার বাস্তবতায় বইমেলা না হোক যুক্তিটা বেশ শক্ত। বা হলেও পিছিয়ে দেয়া হোক। পিছিয়ে দেয়ার বিষয়টা অবশ্য শক্ত যুক্তি লাগে না আমার কাছে। করোনার যে অবস্থা, তাতে কয়টা দিন পিছায়ে বিশাল কিছু ইতিবাচক ঘটে যাবে এই আশা করাটা বড়ই হালকা ভাবনা লাগছে।

এরকম পরিস্থিতিতে বইমেলা হলে কী হবে আর না হলে কী হবে নিয়ে অনেক আলোচনা এবং বিশ্লেষণ করার দিক আছে। হলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়বে তা নিয়ে কোনো আপত্তির সুযোগ নাই।

কিন্তু সরাসরি প্রশ্ন করি, এখন যে সকল সেক্টর খোলা– অফিস, আদালত, গার্মেন্টস, নির্বাচন, রাজনীতির সভা-সমাবেশ, ওয়াজ-মাহফিল, চায়ের দোকান, হাট-বাজার, গণ-পরিবহন– স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই কোথায়? তবু কেনো এসব খোলা? কারণ এসবের সাথে মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। বন্ধ রাখলে মানুষের পেটের ভাত জোগাড় হবে না, তাই তো? তাহলে একটা সহজ বিষয়ও সবার মাথায় রাখা উচিত, বই প্রকাশ এবং তা মেলা কেন্দ্রিক বিক্রির সাথেও হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা-পেটের ভাতের সম্পর্ক আছে। এবং তা ফিজিক্যাল বইমেলা হলেই কিছুটা পূরণের সম্ভাবনা আছে। না হলে নাই।

বড় প্রকাশক, যাদের পুঁজি আছে যথেষ্ট, যারা অনেক বছর ধরে করছেন এবং মোটামুটি সঞ্চয় করেছেন, পাশাপাশি অন্য আয়ের ব্যবস্থা আছে তারা খুব সহজেই বলতে পারেন যে, না হোক মেলা। কিন্তু তারা অসংখ্য তুলনামূলক কম পুঁজির প্রকাশকদের বাস্তবতা বুঝতেই পারছেন না।

প্রায় একটা বছর করোনার প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সবচেয়ে অবহেলিত এই সেক্টরের তুলনামূলক নতুন প্রকাশক, কম পুঁজির প্রকাশকরা কেমন আছেন, তা কেউ জানেনই না। কেবল প্রকাশক না, বইমেলার সাথে মুদ্র্রণ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সেক্টরের হাজার হাজার মানুষ যুক্ত। তাদের বিষয়টাও তারা মাথায় নিচ্ছেন না।

যদি করোনার স্বাস্থ্য ঝুঁকিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার বিষয় হয়, তাহলে সারাদেশের সবকিছু বন্ধ করে দেন। না হলে স্বাস্থ্য বিধি মেনে কতটা নিরাপদ করে বইমেলা করা যায় সেই চেষ্টা করুন এবং বইমেলার স্টলের ভাড়া কমান। একটা বছর আয়োজক সংস্থা একটু কম আয় করেন। সবচেয়ে অবহেলিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টর প্রকাশনাকে টিকে থাকতে দিন। না হলে নতুন বাস্তবতায় বেঁচে থেকে টিকে থাকাদের শিক্ষাদীক্ষা জ্ঞান সৃজনশীল আর সংবেদনশীল বোধের বিকাশ ক্ষতির শিকার হবে নিশ্চিতভাবেই।

আপনাদের অনেকের কাছে মনে হচ্ছে বইমেলা তো এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। মানুষের জীবন বাঁচে না, তখন বই না পড়লে কী এমন হবে। ভাইরে, বই পড়ার সাথে কেবল পাঠকের বই পড়ার তৃপ্তি বা জ্ঞানের সম্পর্ক না। এর সাথে আরো অনেকের পেটের ভাতের সম্পর্ক। বিকল্প কোনো উপায়ে সেই ভাতের ব্যবস্থা করবেন আপনারা? করতে পারবেন?

অন্য নানান সেক্টরকে তো খুলে রেখেও প্রনোদনা দিয়েছেন, নানারকম সহযোগিতা করেছেন। সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের জন্য কী করেছেন? করোনা পরিস্থিতিতে তারা কেমন আছে তাও তো একবার জানতে চান নাই। এমনিতেই মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাদের তালিকা থেকে বই কেনাটাই বাদ পড়েছে সবার আগে। তারপর যদি মেলাটাও না হইতে দেন, তাইলে মেলার সার্কুলার দিয়ে যে আশ্বাস দিলেন বলে প্রকাশকরা প্রস্তুতি নিয়ে আরো বিনিয়োগ করে বসে আছে, সেসবের ক্ষতিপূরণ দিবেন? প্রকাশকদের ঘরে বাজার পাঠিয়ে দিবেন?

আমি জানি, এই সময়ের বাস্তবতায় আমার কথাগুলি অনেকেরই ভালো লাগবে না। এমনকি অনেক প্রকাশক বন্ধুরও ভালো লাগবে না, বিশেষ করে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। কিন্তু আমার প্রশ্নগুলাই বাস্তবতা। কঠিন বাস্তবতা।

(প্রধান নির্বাহী, পাললিক পাঠশালা এবং প্রকাশক, পাললিক সৌরভ)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত