রবিবার, ০১ আগস্ট ২০২১

বল্লাল সেনের রাজত্বে একবেলা

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

ঐতিহাসিক নিদর্শন, প্রত্নতত্ত্ব ও জমিদার বাড়িসহ নয়নাভিরাম প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার ও দেখার জন্য মোটরবাইকে ছুটলাম মুন্সীগঞ্জ। তারিখটি ছিল ১ জানুয়ারি। সঙ্গী দে-ছুট ভ্রমণ সংঘর জসিম, আরাফাত ও নাজমুল। 

সকাল প্রায় ৬টায় বাইক স্টার্ট। যেতে যেতে নারায়ণগঞ্জর চাষাঢ়ায় ব্রেক। গরম গরম জলপাইয়ের চা পান করে আবারো ছোটা। ওদিকে মুন্সীগঞ্জের পঞ্চসরে অপেক্ষায় রয়েছে যুবরাজ। আমরা গেলে পরেই খেজুরগাছ থেকে নামাবে রসের হাঁড়ি। 

বেলা বেড়ে গেলে রসের স্বাদ নষ্ট হবার ভয়ে সে ফোনে বেশ তাগিদ দিতে থাকল। যার কারণে মুক্তারপুর ব্রিজে বাইক থামিয়ে, ফটোসেশনের চান্স মিস করেই এগিয়ে চলছি। সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যেই পঞ্চসর গ্রামে হাজির হই। সময়ক্ষেপণ না করেই গাছে লোক উঠে যায়। 

নামিয়ে আনে প্রায় ৫-৬ লিটার টাটকা খেজুর রস। চোখের সামনে রসের গ্লাস। তর আর সয় না। গো-গ্রাসে গিলে ফেলি কয়েক গ্লাস। যুবরাজদের বসত বাড়িটাই যেন এক নয়নাভিরাম প্রকৃতির ভাণ্ডার। নানান গাছগাছালিতে ভরপুর। ইতোমধ্যে সকালের নাশতা রেডি। 

গরম গরম বৌয়াভাত আর নানান পদের ভর্তা। ইচ্ছেমতো উদরপূর্তি করে ছুটছি জগদিখ্যাত অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটায়। পথেই দেখা হলো বল্লাল সেনের বিশাল দীঘি। পানি নেই। তবে চাষাবাদ চলছে নানান সবজির। যেতে যেতে সুখবাসপুর দীঘির পাড়ে ব্রেক।বেশ টলটলে পানি। 

পরিবেশটাও বেশ চমৎকার। দুই-চারটা ছবি তুলেই বাইক স্টার্ট। কিছুদূর গিয়েই থামি পণ্ডিত সাহেবের বাড়ি। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। বিশাল আঙিনা। একদা এই বাড়ির অতীশই ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত অতীশ দিপঙ্কর। ভাবতেই বেশ ভালো লাগে। 

বর্তমানে বাড়িটিতে অডিটোরিয়াম রয়েছে। অতীশ দীপঙ্কর পাল সাম্রাজ্যের আমলে একজন ধর্মপ্রচারক ও বৌদ্ধ ভিক্ষু ছিলেন। হাল আমলে বাড়িটি বেশ পরিপাটিভাবে সাজানো গুছানো হয়েছে; যা দেখে পর্যটকরা বেশ তৃপ্তি লাভ করতে পারে। 

অতীশ দীপঙ্করের জন্ম ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। আর মৃত্যু ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে। এখনো তার বাড়ি পণ্ডিত ভিটা হিসেবেই ব্যাপক পরিচিত। ছুটলাম এবার রঘুরামপুর গ্রামে। যেতে যেতে বৌদ্ধবিহার। বেশ সুনসান নিরিবিলি পরিবেশ। রয়েছে ঘাটলা বাঁধা পুকুর। তাল গাছের ছায়া। পাখির সুরেলা কিচিরমিচির। মুন্সীগঞ্জের নৈসর্গিক প্রকৃতিও ভ্রমণ পিপাসুদের নিরাশ করবে না। 

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৌদ্ধবিহারটি ড.সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ঐতিহ্য অনুসন্ধানের গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখানে তিন বছর গবেষণা করে প্রত্নতত্ত্বের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন।
 
তাদের বিশেষ সহযোগিতা করে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন নামক একটি সামাজিক সংগঠন। এরপর প্রায় আড়াই মাস খনন কাজ করার পর আবিষ্কৃত হয় হাজার বছরের লুপ্তপ্রায় প্রাচীন রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহার। 

গবেষকদের ধারণা ইতিহাসবিদরা এতকাল যে বিক্রমপুর বৌদ্ধবিহারের কথা বলে আসছেন, মূলত রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহারটিই সেই বিক্রমপুরী বৌদ্ধবিহার।

যাই এবার সোনারং। আগেই জানিয়ে রাখি,প্রত্যেকটা জায়গার দূরত্ব একটির থেকে আরেকটির খুব বেশি নয়। রঘুরামপুর হতে অল্প সময়েই চলে এলাম সোনারং জোড়া মঠ। প্রথম দেখাতেই এর সৌন্দর্যময় কারুকার্য দেখে বেশ মুগ্ধ হই। আর ভাবি সেই যুগের কারিগররাই তো এই আমলের চাইতে অনেক বেশি মেধাবী ছিল। সোনারং জোড়া মঠ অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। 

কথিত ইতিহাসে জোড়া মঠ হিসেবে পরিচিত পেলেও, মূলত ইহা জোড়া মন্দির। মন্দিরের প্রস্তর লিপি থেকে জানা যায় রূপচন্দ্র নামের এক হিন্দু ধর্মের লোক বড় কালীমন্দিরটি ১৮৪৩ সালে ও ছোট মন্দিরটি ১৮৮৬ সালে নির্মাণ করান। ছোট মন্দিরটি হলো শিবমন্দির। 

কালীমন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার। ভ্রমণ পিপাসুরা জোড়া মন্দিরের শৈল্পিক কারুকার্য দেখার পাশাপশি সোনারং গ্রামটা ঘুরেও বেশ আনন্দ পাবে। জুমা নামাজের তাড়া। তাই চলে যাই মীরকাদিম। নামাজ পড়ব বাবা আদম মসজিদে। 

ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট বাবা আদম মসজিদটি দরগাবাড়ি গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটির ভিতরে-বাহিরে রয়েছে চোখ ধাঁধানো কারুকার্য। ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সুদূর আরব হতে বাবা আদম (র.) ভারতবর্ষে পদার্পণ করেন। পরবর্তীতে সেন আমলের ১১৭৮ সালে মিরকাদিমে তার আগমন। তখন মুন্সীগঞ্জে ছিল অত্যাচারী বল্লাল সেনের রাজত্ব। 

স্থানীয় এক যুদ্ধে বাবা আদম বল্লাল সেনের হাতে শহীদ হন। শহীদ বাবা আদম (র.) শাহাদত বরণের ৩১৯ বছর পর ১৪৮৩ সালে বাবা আদম মসজিদটি কাফুরমাহ্ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। যার বয়স প্রায় ৫৩০ বছর। 

এটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে ধর্ম প্রচারক সাধক বাবা আদমের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মসজিদটিতে জুমা নামাজ আদায় করেও বেশ প্রশান্তি লাভ করি।

এবার ছুটলাম পানাম-পুলঘাটা সেতু দেখতে। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই মোগল আমলের তৈরি সেতুর প্রান্তরে। প্রথম দর্শনেই বেশ ভালো লাগে। মিরকাদিম খালের উপর পানাম-পুলঘাটা সেতুটি। সেতুটি এমন নকশায় নির্মাণ করা যে,এর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত দেখা যায় না। দুই পাশে ঢাল হয়ে মাঝে উঁচু। 

সেতুর উপর থেকে খালের সৌন্দর্য অসাধারণ। মোগল আমলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের  সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের পানাম-পুলঘাটা সেতুটির একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। সে যাই হোক। কালের গর্ভে অনেক পথঘাট ও অবহেলায় অনেক ইতিহাসই আজ হারিয়ে গেছে। তাই এখন যতটুকুন রয়েছে তাই সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি। 

যাবেন কীভাবে: মুন্সীগঞ্জ শহরে দেশের যে কোনো প্রান্ত হতেই যাওয়ার সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার গুলিস্তান হতে রয়েছে বাস সার্ভিস ও সদরঘাট নৌ টার্মিনাল থেকে কাঠপট্টি ছেড়ে যায় ছোটছোট লঞ্চ। তবে বাসের যাতায়াতই ভালো। 

মুন্সীগঞ্জ শহর হতে দর-দামসাপেক্ষে অটো/সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে দিনে দিনে ঘুরে আসা যাবে। সব চাইতে সুবিধা হবে মোটর বাইক বা নিজস্ব বাহনে।

টিপস: সকাল সকাল মুন্সীগঞ্জ পৌঁছতে পারলে, বেশ সময় নিয়ে প্রতিটি নিদর্শন দর্শন ও এর ইতিহাস জানতে সুবিধা হবে। 

বর্তমানে খেজুর রসের সময় নেই, তবে আর কিছুদিন পরেই মিলবে তালের রস। ক্যাম্পিং ও তালের রস পান করতে চাইলে ০১৯৯০০১১৮৮৮ নাম্বারে আলাপ করতে পারেন যুবরাজের সঙ্গে। উনি স্বেচ্ছাসেবক পর্যটনবান্ধব। তার মর্জির ওপর নির্ভর করবে আপনার আবদার।


© দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত