সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

বাকরখনির অজানা ইতিহাস

নবাব মুর্শিদ কুলি খান। তার তিন মেয়ে। ছেলে নেই। তাই এক ছেলেকে পালক আনেন তিনি। তার পালিত ছেলের নাম দেন আগা বাকের খান। নিজের ছেলে না হলেও বাকের খানকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন নবাব মুর্শিদ কুলি খান। তার বিশ্বস্ত উজির জাঁহানদার খান। উজিরের ছেলের নাম জয়নুল। নবাবজাদা আগা বাকের খান আর উজিরপুত্র জয়নুল সমবয়সী, কিন্তু চরিত্র একদম বিপরীত।

যুবক আগা বাকের খান চরিত্রবান ও খাঁটি সজ্জন ব্যক্তি। মুর্শিদাবাদের মানুষও তাকে ভীষণ ভালোবাসে। ওদিকে নায়েব দয়াল দাসের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে নারীদের সতীত্ব নাশ করা ছিল জয়নুলের নেশা। তার বন্ধু ছিল বর্গি দস্যু সর্দার চায়েসতু আর আরাকান-মগ দস্যু সর্দার ওলাংপু।

নবাবের রংমহলের নাম আরামবাগ। এই আরামবাগের সেরা নর্তকী ছিল খনি বেগম। রূপে-গুণে অতুলনীয়। এই খনি বেগমের সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় আগা বাকের খানের।

একদিন রংমহলে গেছেন নবাব। নর্তকীরা এসে নাচ-গান শুরু করল। কিন্তু নবাব খেয়াল করলেন, নেই সেরা নর্তকী খনি বেগম। তার হাঁকডাক শুনে জাঁহানদার খান এসে জানালেন, বাকের খান আর খনি বেগমের প্রেমের কথা।
উজির অভিযোগ করে বললেন সে রাতেই বাকের খান আর খনি দুজনে পালিয়ে যাচ্ছিলেন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে। আর তাদের পথরোধ করে উজিরপুত্র জয়নুল। তখন বাকের খান এক কোপে জয়নুলের মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেন।

একথা শুনে রাগে ফেটে পড়েন নবাব। নির্দেশ দেন বাকের খান ও খনি বেগমকে ধরে আনার। ধরা পড়েন বাকের-খনি। তাদের আটকে রাখা হয় কারাগারে।

খনি বেগমের সঙ্গে বাকেরের প্রেমের বিষয়ে নবাব তেমন রাগ আসলে করেননি। প্রেম যে হৃদয়ের ব্যাপার, তা যে নিয়মকানুন মানে না, সেটা জানেন তিনি। কিন্তু বাকের খান তো রীতিমতো খুনি। সেজন্য তাকে শাস্তি পেতেই হবে! তার ছেলে বলে পার পাওয়া যাবে না।

অবশ্য বাকের খান দাবি করলেন, জয়নুল নাকি খনি বেগমের সতীত্ব নাশ করতে এসেছিল। পরে বাকের খানের সঙ্গে যুদ্ধে না পেরে পালিয়ে গেছে।
কিন্তু নবাব ভাবলেন, প্রেমের জন্য বাকের খান মিথ্যে বলছে। তাই তিনি বিশ্বস্ত জাঁহানদার খানের কথাই বিশ্বাস করলেন। বিচারে রায় হলো, বাকের খানকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করা হবে।

পরদিন সকালে বাকের খানকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু বাকের খান এতো শক্তিশালী ছিলেন যে, খালি হাতেই হারিয়ে দিলেন বাঘকে। শাস্তি সেদিনের মতো মুলতুবি করে নবাব মহলে ফিরে গেলেন। তারপর রংমহলে গিয়ে দেখা গেল, খনি বেগম কোথাও নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, খনি বেগমকে নিয়ে এর মধ্যে পালিয়ে গেছে জয়নুল। এবার সব কথা পরিষ্কার বোঝা গেল। পুত্রের কুকীর্তির কথা জানতে পারলেন জাঁহানদার খান। আগা বাকের খানকে কারাগার থেকে বের করে আনা হলো। সঙ্গে সঙ্গে জাঁহানদার খান আর আগা বাকের খান ছুটলেন জয়নুলের বন্ধু দস্যুদের আস্তানায়। দক্ষিণের জঙ্গলের দিকে।

ভীষণ যুদ্ধে দস্যুদের পরাজিত করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর খুঁজে বের করা হলো সেই ঘর, যেখানে খনি বেগমকে নিয়ে লুকিয়ে আছে জয়নুল। জাঁহানদার খান যখন ওখানে পৌঁছলেন, সেখানে তখন এক ভয়ংকর পরিস্থিতি।

জ্যান্ত সাপ নিয়ে খনি বেগমকে ভয় দেখাচ্ছে জয়নুল। যেই সেখানে উপস্থিত হলেন জাঁহানদার খান, হকচকিয়ে জয়নুল তাড়াহুড়া করে ঘুরতে গেল আর সাপটা তাকেই কামড়ে দিল। কিন্তু মরার আগে ছোরা বের করে খনি বেগমের গায়ে বসিয়ে দিল সে। যাকে সে পেল না, তাকে কাউকে পেতে দেবে না। ততক্ষণে চলে এসেছেন আগা বাকের খানও। কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। মারা গেল খনি বেগম।

পুত্রের এমন মৃত্যুর পর আত্মহত্যা করলেন জাঁহানদার খান। আর প্রিয়তমার শোকে পাগলের মতো হয়ে গেলেন বাকের খান। আর ফিরে গেলেন না মুর্শিদাবাদে। শেষে তার আশা ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণের অঞ্চলটাই বাকের খানকে ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন মুর্শিদ কুলি খান। বাকের-খনির স্মৃতিবিজড়িত ওই অঞ্চলটাই পরে পরিচিত হয় বাকেরগঞ্জ নামে। এই বাকেরগঞ্জই এখন পরিচিত বরিশাল নামে।

নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তীর ঢাকা’ গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাপারে লেখক বলেছেন, খনি বেগমকে না পেলেও প্রেমের স্মৃতিটা জাগরুক রাখতে আগা বাকের নতুন ধরণের একটি শুকনো রুটি তৈরি করিয়ে নাম দিয়েছিলেন বাকের-খনি। পরে মানুষের মুখে ঘুরতে ঘুরতে এই খাবারের নাম হয়ে যায় বাকরখনি।

উনিশ শতকের চল্লিশের দশকে প্রকাশিত হাকিম হাবিবুর রহমান তার “Dhaka Pachash Barash Pahley” গ্রন্থে ঢাকার বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের তৈরি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি প্রধানত গও জোবান, শুকি এবং নিমশুকি তিন ধরনের বাখরখানির কথা বলেন। পুরাণ ঢাকায় এই খাবারটি তুমুল জনপ্রিয় ছিলো একসময়। এখনো টিকে থাকলেও আগের মতো রমরমা অবস্থা নেই। পুরাণ ঢাকাবাসী ঐতিহ্যের টানে এখনো সকালে চায়ের সাথে বাকরখনি খান। কোনো কোনো দিন ধুমায়িত চায়ের কাপ হাতে তারা ফিরে যান মুঘল আমলে, বাকের-খনির প্রেমের স্মৃতি মাখা বাকরখনি থাকে তাদের হাতে।

হাসান হামিদের ফেসবুক পোস্ট থেকে


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!