সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯

বামন হাতির গল্প

মিনহাজুল আবেদিন

হাতি, এই নামটি বলার সাথে সাথেই বিশালদেহী এক প্রাণীর ছবি আমাদের মনে ভেসে উঠে। বিশাল দেহ, শুঁড় আর পা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো এলাকা। তবে আমাদের পরিচিত হাতির বাইরেও ভিন্নরকম হাতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। প্রাগৈতিহাসিক কালে এমন এক প্রজাতির হাতির অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল যাদের বলা হয় ‘বামন হাতি’।

বামন হাতিরা তাদের পূর্বপুরুষ কিংবা সমসাময়িক কালে বেঁচে থাকা অন্য হাতির তুলনায় আকারে বেশ ছোট ছিল। কিন্তু বামন হাতিদের নিয়ে একটা রহস্য আছে, তাদের সবাই কোনো না কোনো দ্বীপের বাসিন্দা ছিল!

শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী হাতির বর্গ প্রোবোসিডিয়া। এই বর্গের অন্তর্ভুক্ত অনেক প্রজাতিই ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে আটকা পড়ে। এরাই পরিবেশগত কারণে পরিবর্তিত হয়ে বামন হাতিতে পরিণত হয়। সময়ের স্রোতে এরা কেউই আর টিকে নেই, শুধু রয়ে গেছে এদের দেহাবশেষ। আর এই দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করেই জানা গেছে বামন হাতির রহস্য।

দ্বীপে কেন আটকে পড়ে?

এই রহস্যের বেড়াজাল খুলতে হলে ফিরে যেতে হবে দুই মিলিয়ন বছর আগে। পৃথিবীতে তখন চলছে প্লিস্টোসিন উপযুগ। যেটি আমরা সাধারণভাবে জানি ‘বরফ যুগ’ বা ‘আইস এজ’ নামে। সেই যুগেও হাতিদের বিবর্তন চলছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় হাতি তথা প্রোবোসিডিয়ার সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। বরফ যুগের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, চরম ঠাণ্ডা চলাকালীন সময়েও হুট করে অল্প সময়ে পৃথিবী গরম হতে শুরু করে। এরকম হওয়াকে বলে ইন্টারগ্ল্যাসিয়াল।

ইন্টারগ্ল্যাসিয়াল চলাকালীন সময়ের আবহাওয়া অনেকটা বর্তমান পৃথিবীর আবহাওয়ার মতোই। এই ঘটনা শেষে আবারো পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে শুরু করে এবং আবারো বরফ শীতল আবহাওয়ায় ফিরে যায়। ইন্টারগ্ল্যাসিয়ালকে অনেকটা বাক্যের কমা চিহ্নের সাথে তুলনা করা যায়। এর মাধ্যমে বাক্য শেষ হচ্ছে না, তবে শব্দগুলো জিরিয়ে নিয়ে যেন আবার শুরু হচ্ছে।

বরফ যুগের পুরো সময়ের তুলনায় ইন্টারগ্ল্যাসিয়ালগুলো ছিল খুবই ক্ষুদ্র সময়। সময়ের হিসেবে একেকটা কয়েক হাজার বছর। বরফ যুগ যে পরিমাণ সময় নিয়ে বিরাজমান থাকে তার তুলনায় কয়েক হাজার বছর ক্ষুদ্র সময়ই। পৃথিবীর জলবায়ুতে দ্রুত পরিবর্তনের সাথে সাথে মেরু এলাকার বরফ আর সমুদ্রের উচ্চতারও বাড়তে হতে থাকে। মেরু অঞ্চল ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় দ্বীপ তৈরি হতে থাকে।

ইন্টারগ্ল্যাসিয়াল শুরু হওয়ার আগে এই দ্বীপগুলো বিচ্ছিন্ন এলাকা ছিল না, মূল স্থলভাগের মতো জীববৈচিত্র্যই এই এলাকাগুলোতে দেখা যেত। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের দ্রুত উচ্চতা পরিবর্তনের সাথে সাথে মূল ভূমি থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় এই এলাকার জীববৈচিত্র্যে আসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এই প্রক্রিয়া সৃষ্ট অনেক দ্বীপেই আটকে পড়ে হাতির বর্গ প্রোবোসিডিয়ার সদস্যরা।

বামন হাতিদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে ভূমধ্যসাগরের আর এশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপে।ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সাইপ্রাস, মাল্টা, ক্রেটে, সিসিলি, সারডিনিয়া, সাইক্লেডেস ছাড়াও এশিয়ার জাভা, সুমাত্রা,বরনিও, ফিলিপাইন, তিমুর প্রভৃতি দ্বীপে বামন হাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এছাড়াও ক্যালিফর্নিয়ার চ্যানেল আইল্যান্ড, সাইবেরিয়ার রাংগেল দ্বীপেও খণ্ডাকারে বামন হাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত