বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২

বীরাঙ্গনাকে লেখা চিঠি : নাজনীন নাহার

প্রিয় তারা,
প্রিয় বীরাঙ্গনা মাগো আমার।
আপনাকে লেখার দুঃসাহস আমার নেই। কারণ;
যে মাটির জন্য আর যে মাটির স্বাধীনতার জন্য আপনি আপনার নারীত্বের সবচেয়ে মূল্যবান আপনার সম্ভ্রমখানি হারিয়েছেন।সেই মাটি আপনার মূল্যায়ন করতে পারেনি মা। সেই দেশ আপনাকে সম্মানের মৌখিক স্বীকৃতি দিয়েও আপনার জন্য কথা রাখতে পারেনি। আপনাকে আগলে রাখতে পারেনি মা আপনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার বাংলাদেশ। আমি আজ সেই স্বাধীন দেশের সন্তান।আমি আপনার স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিচ্ছি। আপনাকে বিনম্র চলে চিত্তে চিঠি লিখছি হে প্রিয়জন আমার।

প্রিয় জননী আমার,
আমি ও আমরা আজ আপনাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা উপভোগ করি। উদযাপন করি মহান স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস। আর এই বাংলাদেশের যোগ্য উত্তরসূরী আপনি ও আপনারা আমার বীরাঙ্গনা মায়েরা, বোনেরা। কি ভীষণ দহনের নীল নিঃশ্বাস বুকে চেপে দেশান্তরে পড়ে থাকেন। আমি জানি মা আপনার বুকের গহিনে কি ভয়ঙ্কর বীভৎস কষ্ট।আপনার অস্তিত্ব বলয়ে কত কত ভয়ানক অপমানের রক্তক্ষরণ। তাইতো আপনার হৃদপিণ্ডে বিদগ্ধ দহন পুষে আপনি ঘোষণা দিয়েছেন,
আপনার মৃত্যুর পরও যেন আপনার মৃতদেহটা কেউ বাংলার মাটিতে নিয়ে না আসে।
আপনি চিৎকার করে বলেছেন,
“জন্ম দিলে জননী হওয়া যায়।লালন পালন না করলে মা হওয়া যায় না।”
আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ স্বাধীন জননী হওয়ার পরেও আপনার মা হতে পারেনি। আপনাদের মতো সন্তানদের সম্মানে আগলে রাখতে পারেনি। কেবল জননী হয়েই রয়ে গেছে।
আমি জানি আপনি ভয়ানক ভাবে নির্যাতিত হয়েও বারংবার জয় বাংলা উচ্চারণে মনে সাহস যুগিয়েছিলেন। আপনি জয় বাংলা উচ্চারণে আপনার রাগ, দুঃখ , অপমান ভুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা ভুলতে পারেননি মাগো । তাইতো আপনি আপনার জীবনের প্রতিটিক্ষণ কেবল দহনে পুড়ে গেছেন। আপনি আপনার সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়ে, সাহসী উচ্চারণে জয় বাংলার স্লোগানে স্লোগানে বিজয় এনে দিতে পেরেছেন দেশের জন্য কিন্তু নিজের জন্য একমুঠো সম্মানের মাটির সখ্যতা পাননি।
আমি জানি মাগো,
আমি জানি। আপনার ক্ষত কতটা গভীর। আপনার দহন কতটা তীব্র। তাইতো এখনও আপনার বীরাঙ্গনা জীবনের এক একটি পাতা পড়তে গিয়ে আমার গা শিউরে উঠে। আপনাদের উপর পাশবিক নির্যাতনের ইতিহাস আমাকে ঠিকঠাক ঘুমাতে দেয় না। আমি জানি মা আপনি আঠারো বছরের স্বপ্নবাজ এক সদ্য তরুণী ছিলেন সেদিন। দিনটা ছিল একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চের খুব ভোর বেলা। পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় আপনার ডাক্তার বাবা আপনার মা, ভাই ও আপনাকে সাথে নিয়ে রাজশাহী শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ আপনাদের পথরোধ করে দাঁড়ায় স্থানীয় চেয়ারম্যান কাকু। যেই চেয়ারম্যান কাকুর মেয়ে সুলতানার বান্ধবী ছিলেন আপনি। সেই চেয়ারম্যান কাকু তার জিপগাড়িতে করে আপনার বাবা-মা ও ভাইয়ের সামনে থেকে আপনাকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে গেল। নিয়ে গেল তাদের অধিনস্ত থানায়। কত আকুতি মিনতি আপনি করেছিলেন সেদিন! কিন্তু কিছুতেই মন গললো না সেই চেয়ারম্যান সহ সকল হায়েনা-দুর্বৃত্তদের।

মাগো!
এরপর থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। বীভৎস সেই শকুনীরা আপনাকে নিয়মিত খুবলে খেলো। আপনি মানুষের মুখ হারিয়ে কেবল তথাকথিত মানুষের মুখে হায়েনার মুখ দেখতে লাগলেন।আপনার উপর সেই রাতেই পাশবিক নির্যাতন চালায় এক বাঙালি। তারপর অগুনতি নর কুকুর। আপনি এক জড়পদার্থ হয়ে গেলেন।যে যখন খুশি আপনার উপর নির্যতন করতে থাকল। দাঁতে দাঁত চেপে তবুও আপনি জয় বাংলা উচ্চারণ করে গেছেন আর দেশ স্বাধীনের অপেক্ষায় থেকেছেন। গলয় ফাঁস লাগিয়ে যদি আপনারা কেউ আত্মহত্যা করে ফেলেন। তাইতো আপনাদেরকে শাড়ি নয় শুধুমাত্র পেটিকোট আর ব্লাউজ পরিয়ে রাখা হতো। আহ্ কী ভীষণ দহন! কী নগ্ন অত্যাচার!
অর্ধাহারে অনাহারে শারীরিক মানসিক নির্যতনে আপনারা জর্জরিত হলেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রচুর রক্তক্ষরণে আপনার পাশেই মারা গেলেন অন্তঃসত্ত্বা এক মা। উফফ্ কী ভয়ানক সে দৃশ্য! আমি এখনও কেঁপে কেঁপে উঠি সেই বীভৎসতা পড়ে।
আপনাদের এই বীভৎস নির্মমতার কান্না শেষ হলো ষোলোই ডিসেম্বর। অমানুষের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেলেন আপনারা। দেশ স্বাধীন হলো। আপনি অনুভব করলেন বিজয়ের খুশি। ভাবলেন বেঁচে গেছেন এবার। কিন্তু না! আপনার মতো ত্যাগী বীরাঙ্গনাদের জন্য এই পৃথিবীর বুকে অপেক্ষা করছিল আরও কত কত যন্ত্রণার মরন!
একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কেউই আপনাদেরকে সম্মান দিতে চাইলো না স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে।নিজের বাড়িতে আর ফিরিয়ে নিলো না আপনার বাবা। দেখা হলো না আর কোনোদিন নিজের গর্ভধারিনী মায়ের মুখখানি।
নিজের বাবা ভাই মুখ ফিরিয়ে নিলো। আপনি আরও একবার আপনার নারীত্ব হারালেন নিজের আপন জনদের অপমানের দহনে। ক্যাম্প থেকে অজ্ঞান অবস্থায় প্রথমে হাসপাতাল এবং জ্ঞান ফিরলে ঢাকা মেডিকেলে। কিছুদিন পরেই ডাক্তার জানালো আপনি অন্তঃস্বত্ত্বা। কোথায় যেতে চান আপনি এখন! এমন প্রশ্নের জবাবে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন কারও কাছে নয়। আপনার মতো মেয়েদের যেখানে যায়গা হবে সেখানেই যাবেন। একসময় আপনাকে ধানমণ্ডির পূনঃর্বাসন কেন্দ্রে আনা হলো। দায়িত্বরতদের আপনার বাবার ঠিকানা দিলেন আপনি।অপেক্ষা করলেন বাবার জন্য। যদি এবার বাবা এসে ফিরিয়ে নেয় তার আদরের কন্যাকে! এদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো আপনার।খুব কাঁদলেন। বঙ্গবন্ধু আপনাদেরকে মা বলে সম্বোধন করলেন।বীরাঙ্গনা উপাধি দিলেন। বললেন, “আমি তো আছি”।
বাঁচার সাহস পেলেন আপনারা। এদিকে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের আহ্বানে আপনার প্রিয় বাবা, ভাই এসেও মুখ ফিরিয়ে নিলেন আপনার থেকে। এবং যাবার সময় তারা আপনাকে কোনোরকম যোগাযোগ করতে নিষেধ করে গেলেন। আহ্ হা! কী ভয়ঙ্কর আঘাত! নিজের দেশে নিজের বলে আর কিছুই রইলো না একজন আত্মত্যাগী সাহসী যোদ্ধা বীরাঙ্গনা মায়ের।
এদিকে আপনার নামে সরকারের অনুদান নিয়ে আপনার বাবা ভাই বাড়ি মেরামত করলেন।দু’টো নতুন ঘর উঠালেন। অথচ সেই ঘরে আপনার যায়গা হলো না। রাগে, দুঃখে অপমানে আর ঘৃণায় আপনার আত্মাটাই যেন কুঁকড়ে গেল। আপনি দেখলেন আপনার বাবা ভাইও আপনার সতিত্ব ও মাতৃত্বের দাম নিয়ে নিলো সরকারের কাছ থেকে। আপনজনের কী ভীষণ স্বার্থপরতা! জীবন যেন আরও একবার আপনার নামে বীভৎস মৃত্যু লিখে দিলেন!
তবুও আপনি ভেঙে পড়লেন না। আপনি আরও দৃঢ় হলেন।আপনি যে বীরাঙ্গনা মা আমার। এজন্যই তো আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। আপনি বুঝে নিলেন এ সমাজ আপনাকে গ্রহণ করবে না। আপনাকে এই সমাজ এই দেশ ছাড়তে হবে। এই দেশ আপনাকে সম্মান দিতে পারল না মা।
আপনিও কষ্ট দহন আর অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন প্রিয় বাংলাদেশের উপর থেকে। আপনি দেশান্তরি হলেন। আপনি চিরতরে চলে গেলেন আপনার প্রিয় বাংলাদেশ ছেড়ে।
মাগো,
ওগো মা আপনি শুধু দিয়েই গেলেন। কিছুই নিলেন না আপনার প্রিয় বাংলাদেশ থেকে। আপনার অন্তরধামে দগদগে দহন ক্ষত নিয়ে আপনি বাঙালি জাতিকে অভিসম্পাত দিয়ে গেলেন। অভিসম্পাত দিয়ে গেলেন জতির হীনমন্যতার জন্য। মা’কে অপমান ও অসম্মান করার জন্য।
তারা মা,
আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আসলেই আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ও আমাদের মহীয়সী বীরাঙ্গনা মায়েদেরকে যথার্থ সম্মান দিতে পারিনি। জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত। আমাদেরকে ক্ষমা করুন মা। আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমরা এখনও জাতির একটা বড়ো অংশভাগ আপনাদের দুঃখ দহনে কাঁদি মাগো।আপনাদের অপমান আর গ্লানির দহনে বিদগ্ধ হই। আপনারা আমাদের ক্ষমা করুন মা ক্ষমা করুন। আমরা আপনাদেরকে ভুলিনি। আমরা আপনাদেরকে ভুলব না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনাদেরকে মনে রাখবে সম্মানে আর ভালোবাসায়। আমাদের স্বাধীনতা আর বিজয়ের কসম। আপনাদেরকে ও আপনাদের মহান আত্মত্যাগ আমরা কোনোদিন ভুলব না হে বীরাঙ্গনা জননী আমার।
এই দেখুন আমরা আপনার সন্তানেরা আপনাদেরকে নিয়ে পড়াশোনা করছি। আপনাদেরকে জানছি, চিনছি আর ধারণ করছি আমাদের চেতনায়। আমাদের জাতীয় পতাকায় যে আপনাদেরই রক্তে লাল। আমাদের পরিচয়ে যে আপনাদের ত্যাগের মাহাত্ম্য। আপনারাই যে আমাদের গৌরব আমাদের স্বাধীনতার লাল সূর্য। এভাবেই আমরা আপনাদেরকে বহন করব আমাদের অস্তিত্বে। ধারণ করব আমাদের বিশুদ্ধ বোধের সন্তরণে। স্যালুট হে বীরাঙ্গনা জননী আমার স্যালুট। আমাদের পুরো বাঙালি জাতির বিনম্র শ্রদ্ধা আজীবন আপনাদের তরে।

ইতি
আপনাদের আত্মার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যথিত সন্তান।

গ্রন্থঃ বীরাঙ্গনাকে লেখা চিঠি, নাজনীন নাহার


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.