রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১

বেহাল সড়কে লক্কর-ঝক্কর বাস আর কতদিন?

 

হাসান হামিদ

আমার বাড়ি সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের বেহাল দশা সম্পর্কে আমি অনেকটাই অবগত। সিলেট এমসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় সিলেট-সুনামগঞ্জে বাসে নিয়মিত যাতায়াত করেছি। সেটা ২০০৬ সালের গল্প। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ঢাকায় চলে আসায় সেই লক্ষর-ঝক্কর বাসে অনেক দিন আর যাওয়া হয়নি। এর অনেক দিন পার হয়েছে। কিন্তু পাল্টে যায়নি এই সড়ক, এইসব গাড়ি; সবক্ষেত্রে দুর্গতি বাড়ার আয়োজন আরও বেড়েছে বলেই মনে হয়।

পৃথিবীতে সভ্যতা বিস্তার ও অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে যাতায়াত ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে এই কথা আমরা সবাই জানি। যে কোনো এলাকার প্রভূত উন্নয়নের মূলে রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া কোনো এলাকাই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নতি করতে পারে না। কোনো একটি দেশের বা এলাকার সম্ভাব্য উৎপাদন, বণ্টন, মূল্য নির্ধারণ, বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর এসব বিবেচনায় সুনামগঞ্জ আসলেই খুব অভাগা একটা অঞ্চল। যখন অন্য সব এলাকায় যাই, আন্তঃজেলা সড়কগুলো, সেইসব সড়কে চলা গাড়ির সাথে আমাদের সুনামগঞ্জের ব্যবধান আমার বেদনা বাড়িয়ে দেয়।

আমাদের দেশের পরিবহন ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। বর্তমানে যে অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা দীর্ঘ সময়ে পরিবর্তিত রূপ। এ দেশের পরিবহন ব্যবস্থা অতীতকালে খুব দুর্বল ছিল। অতীতে প্রধান পরিবহনের মাধ্যম ছিল নদীপথ ও সড়কপথ। অতীত কালের প্রধান যানবাহন ছিল গরুর বা  ঘোড়ার গাড়ি। পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকায় অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে চলাচল করতে হত। খুব বেশি দিন আগে নয়, আমার নানাবাড়ি বিন্নাকুলী আমি পায়ে হেঁটে গেছি এক দশক আগেও।

একসময় এদেশে বিশেষত সুনামগঞ্জে নদীপথে চলাচল করা ছিল সহজ ও দ্রুত। অতীতে বেশির ভাগ সময় নদীপথ ব্যবহার করা হত। বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার অনেকটাই উন্নতি লাভ করেছে । দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে যে কোনো জিনিস সহজে দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে স্থানান্তর করা যায়। দেশে এখন যন্ত্রচালিত যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সুনামগঞ্জে সেইসব উন্নয়নের বাতাসের অনেক কিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছে কিনা তা নিয়ে ভাবতে হবে। অন্য অনেক সূচকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিতেও হাওরকন্যা সুনামগঞ্জ যারপরনাই অবহেলিত।

সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের লক্কর-ঝক্কর বাস দিয়ে যাত্রী পরিবহন বন্ধে ও  এই সড়কে নতুন-উন্নতমানের বাস চালুর দাবি জানিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল সুনামগঞ্জের যুব সমাজ। সেটা ২০১৬ সালের মে মাসে। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে। সেই সময় শহরের উকিলপাড়া এলাকার রিভারভিউতে এ উপলক্ষে এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে স্থানীয় যুব সমাজের নেতৃবৃন্দরা বলেছিলেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে যেসব বাস চলছে তা অনেক পুরনো, এসব বাস সুনামগঞ্জ ছাড়া আর কোন এলাকায়ই চলে না। সারা দেশের পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হলেও সুনামগঞ্জের বিরতিহীন বাসগুলো অতীত কালের মুড়িরটিন বাসের মতোই, এসব বাসে যাত্রীসেবার মানও খুব খারাপ। এছাড়া বিরতিহীন বাসগুলো রাস্তার মোড়ে মোড়ে যেখানে খুশি থামে, এসব বাসের ড্রাইভারদেরও কোন প্রশিক্ষণ নেই, হেলপাররাও যাত্রী নিয়ে বাস চালায়, রাস্তার মাঝখানে দাড় করিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করে। অনেক অভিযোগ। আর আমার মতো অন্য সবাই স্বীকার করবেন, এই সবগুলো অভিযোগ শতভাগ সত্য।

এইসব আলোচনার পাশাপাশি সেই সময় শহরের যুবসমাজ ৭দফা  দাবি জানিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণাও করেছিল। দাবিগুলো ছিলো, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে নতুন কিছু বিআরটিসি বাস চালু করা। যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই সেগুলোকে বাতিল করা। যাত্রী ছাউনী থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত ওয়াসব্লকের (টয়লেট) সুবিধাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা। বিরতিহীন বাস নিয়ম অনুযায়ী চলছে কিনা বা  যাত্রাপথে সড়কে বার বার থামছে কিনা তার উপর নজরদারি বাড়ানো। হেলপার দিয়ে গাড়ি না চালানো। গাড়ির আসন সংখ্যা অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন করা ও নতুন বাস নামানো। এই দাবিগুলোর একটিও কি পূরণ হয়েছে? যারা জনগণের সেবক, তারা কি ভাববেন প্লিজ? প্রশাসন? বাস-মালিক সমিতি? অন্য আরও সংশ্লিষ্টরা?

গত বছর দেখেছি, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের বিভিন্ন স্থান ভেঙ্গে খানাখন্দ হয়ে গেছে। সড়কের উভয় পাশের অনেক জায়গাতেই মাটি নেই। এতে গাড়ি উল্টে খাদে পড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটার সংবাদ পত্রিকায় পড়ি। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে নির্মিত সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কটির দৈর্ঘ্য ৬৪ কিলোমিটার। মাত্র ১৮ ফুট চওড়া এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করছে বাস, মিনিবাস, ট্রাক, লরিসহ ভারি যানবাহন। চওড়া কম হওয়ায় প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। তাছাড়া কিছু কিছু এলাকার সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক স্থানে সড়কের পাশে মাটি নেই। গর্ত আর ভাঙাচোরার কারণে ওইসব জায়গাতে ধীরে গাড়ি চলে। ধীর গতির কারণে লেগে থাকে যানজট।

সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট সড়কে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। সড়কটি স্থাপনের পর থেকে এখন পর্যন্ত যাত্রীদেরকে জীবনের ঝুকিঁ নিয়েই লক্কর-ঝক্কর বাস দিয়ে দীর্ঘপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত সাধারণ যাত্রীরা নানান দুর্ভোগসহ সড়ক র্দূঘটনার আশংঙ্কা নিয়েই যাতায়াত করেন। উন্নতমানের বাস সার্ভিস চালু জেলাবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি হলেও তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি।

পরিবহন মালিক সমিতি সূত্র মতে, সুনামগঞ্জ-সিলেটসহ অভ্যন্তরীণ সবকটি সড়কে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। এ সড়কগুলোতে ৫টি বাস-মালিকদের সংগঠন রয়েছে। তাদের ৪ শতাধিক বাসসহ অসংখ্য লেগুনা, সিএনজি, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস যাত্রী পরিবহন করে থাকে। জানা গেছে, দুর্ভোগে অতিষ্ঠ যাত্রীরা অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে এ সড়কে উন্নত মানের বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিলে বাস-মালিক ও শ্রমিকদের বাঁধার কারণে উন্নতমানের বাস চালু করতে পারেননি।

বাস-মালিকদের অভিযোগও আছে। তারা জানান, সিএনজি অটোরিক্সা, লেগুনাসহ অনেক ছোট ছোট যানবাহনের অনেকগুলোর দেড় কি.মি. আবার অনেক যানবাহনের ৪কি.মি. যাত্রী পরিবহনের রোড পারমিট রয়েছে। কিন্তু ওইসব যানবাহন যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে সিলেটসহ দূর-দূরান্তে যায়। এতে করে বাস-মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। অনেক সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ওইসব সড়কে উন্নতমানের বাস সার্ভিস চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

আগেই বলেছি, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা যথেষ্ট অবদান রাখছে। উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নে ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ কার্যকর। পণ্য আমদানি-রপ্তানী, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন উপকরণের গতিশীলতা, কাঁচামাল ক্রয় ও পণ্য বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পণ্যের বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের লক্ষ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। দেশের একটি বৃহৎ জনপদকে বাদ দিয়ে তো পরিপূর্ণ উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুনামগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে কর্তৃপক্ষ নজর দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। কেননা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মূল্যবান সম্পদ আহরণের সুযোগ ঘটে উত্তম পরিবহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে। যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সাহায্য করে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্যও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ সহায়ক।

আমাদের জীবনকে আরও গতিশীল করার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ হাওর জনপদে উন্নত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এর বহুবিধ সুফল পাওয়া সম্ভব এবং এ এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিও ঘটবে দ্রুত। মোটকথা সুনামগঞ্জ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন সমৃদ্ধ হবে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর তাই পিছিয়ে পড়া সুনামগঞ্জবাসীর প্রাণের দাবি উন্নতমানের বাস সার্ভিস, স্বাভাবিক সুন্দর সড়ক। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে ভালো মানের বাস সার্ভিসের পাশাপাশি বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু হলে কমবে যাত্রীদের দুর্ভোগ। এই দাবি বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি সরকারের প্রতিনিধিরা এগিয়ে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। প্রত্যাশাটা কি খুব বেশি?


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত