বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০

বৈষম্য : আমীন শাহনাজ চন্দনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে পাশ করা রিফাত, অনেক চেষ্টা করেও চাকরি না পেয়ে এক বছর ধরে পাঠাও চালাচ্ছে। আর রাতের বেলা ওদের পাড়াতেই ক্লাস নাইনের দুটো ছেলেকে প্রাইভেট পড়ায়।

রিফাতের বউ, মেরিনা, ঢাকায় সিল্ভার হার্ভেস্টের একজন রিসেপশনিস্ট। মেরিনা লেখাপড়া করেছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ইতিহাস বিভাগে। ছয় মাস হলো অনার্স পাশ করেছে। এর পরপরই রিফাত ওর জন্য এই চাকরিটার ব্যবস্থা করে। শুধুমাত্র ঢাকায় ওরা একসাথে থাকবে বলে। ওদের চার বছরের একটা মেয়েও আছে। এটা অবশ্য এক্সিডেন্টলি হয়ে যায়।

পাঁচ বছর আগে রিফাতের সাথে মেরিনার বিয়ে হয়। এত অল্প বয়সে ছাত্র অবস্থায় রিফাত বিয়ে করতে চাইনি। কিন্তু মৃতপ্রায় দাদীর শেষ ইচ্ছে রাখতে গিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। ওদের বিয়ের তিন দিনের দিন রিফাতের দাদী মারা যায়। রিফাতের পারিবারিক অবস্থাও স্বচ্ছল নয়। বাবা কুষ্টিয়া জেলায় কুমারখালী উপজেলার প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। ওর আরো ছোট দুটো বোন আছে। ওরাও লেখাপড়ার করে। বাবার একার পক্ষে ওদের তিন জনের লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। তাই রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবার পর, প্রাইভেট পড়িয়ে অনেক কষ্ট করে নিজেই নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে।

রিফাত, মেরিনা আর তাদের ছোট্ট মেয়ে ইশানাকে ঢাকায় আনার পর থেকে বেশ সুখেই দিন পার করছিল। ওদের যা ইনকাম তা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে কোন রকম দিন চলে যাচ্ছিল। তবুও তারা খুশি ছিল। কারণ রিফাত জানে, ওর একটা চাকরি হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ততদিন পর্যন্ত একটু কষ্ট সহ্য করতে হবে। আর এই আশাটুকু নিয়েই ওরা হাসিমুখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে নোভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী রুপ নিলে ঢাকায় লকডাউন দেয়া হয়। গত একমাস ধরে রিফাত আর মেরিনার কোন কাজ নেই। রিফাত যে দুটো ছেলেকে প্রাইভেট পড়াত, তারাও রিফাতকে আপাতত আসতে বারণ করে দিয়েছে। তাই যে ক’টা টাকা জমানো ছিল, সেখান থেকে খরচ করতে করতে ওদের হাত এখন একেবারে শূন্য।

বাসায় এখন কোন বাজার নেই। মেরিনা, ইশানাকে গত তিনদিন ধরে শুধু ডাল ভাত খেতে দিয়েছে। মেরিনা আর রিফাত একবেলা কোন রকম আধপেটা খেয়ে দিন পার করছে। চাল ডাল যা আছে, কাল সব ফুরিয়ে যাবে। তারপর? তারপর মেরিনা ইশানাকে কি খেতে দেবে? জিজ্ঞেস করে রিফাতকে।

রিফাত, মেরিনাকে বলে, আপাতাত বাড়ী ভাড়ার যে টাকাটা আছে, সেখান থেকে কিছু টাকা দাও। দেখি মেয়েটার জন্য বাজার থেকে কিছু কিনে আনতে পারি কিনা।

মেরিনা মন খারাপ করে বলে, সেই টাকাটা বাড়িওয়ালা চাচা আজ সকালে এসে নিয়ে গেছেন।

রিফাত একটু অবাক হয়ে বলে, কী? নিয়ে গেছেন মানে? এখনও তো মাসের শেষ হতে তিন দিন বাকি। আগেই দিয়ে দিলে কেন?

কী করব? এমন করে এসে বললেন যে না বলতে পারলাম না। তার মেয়ে জামাই গত দু’দিন হলো সৌদি আরব থেকে এসেছে।

রিফাত না জানার ভান করে বলে, ও তাই নাকি?

কেন, দেখনি তুমি? সৌদি আরব থেকে এসেছে বলে লোকজন কেমন ভিড় জমিয়েছিল গেটের সামনে। তারপর সারাদিন ধরে আত্মীয়-স্বজনদের আনাগোনা তো ছিলোই। আর তাদের সেলফি তোলা। যাগ্গে সে সব কথা। উনি বলছিলেন, মেয়ে জামাইকে ভালোমন্দ কিছু রান্না করে খাওয়াবেন। কিন্তু বাসায় হাত খরচের যে টাকা ছিল, সেটা প্রায় শেষের পথে। এদিকে রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া কিছুই চলছে না বলে উনি ব্যাংকেও যেতে পারছেন না। তাই এসেছিলেন এ মাসের অগ্রিম ভাড়াটা চাইতে। আমিও আর না বলতে পারলাম না।

রিফাত একটু বিরক্ত হয়ে মেরিনাকে বলে, তো তুমি উনাকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারতে।

কোন লাভ হতো না রিফাত। তুমি তো জানোই, উনি কেমন নাছোড়বান্দা।

হ্যাঁ, তা জানি। তবে উনিও তো জানেন যে আমি পাঠাও চালাই। রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া না চললে আমারও তো কোন ইনকাম নেই। আর তুমি অফিসের রিসেপশনিস্ট। উনার তো কিছুই অজানা নয়। সব কিছু জানিয়েই তো আমি চিলে কোঠায় এই একটা রুমের বাসটা ভাড়া নিয়েছিলাম। সাথে একটা বাথরুম আর ছোট্ট একটা রান্নাঘর। এইটুকুর জন্য সাত হাজার টাকা ভাড়া চেয়েছিলেন। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে ছয় হাজার টাকায় রাজি করিয়েছিলাম। এটা তো উনার একদিনের বাজার খরচ। কিন্তু আমাদের সারা মাসের জমানো অনেক কষ্টের টাকা। উনার কী বিবেক বলতে কিছুই নেই?

না নেই, রিফাত। উনাদের মতো লোকদের বিবেক বলে কিছু থাকে না। ওদের কাছে বিবেক শব্দটা মৃত। তা না হলে, উনাদের মতো লোকদের আজ এমন টাকার পাহাড় থাকত না। এগুলো বিবেক বিক্রি করে জমানো টাকা। বোঝ না তুমি?

রিফাত খুব আক্ষেপের সুরে বলে, বুঝব না কেন, সবই বুঝি মেরিনা। তারপরও এদের হাপিত্যেশের কোন সীমা নেই। হাড় হাভাতে কোথাকার! উনার ঐ অত্ত বড় মেয়েটা আজ পোলাও কোরমা খাবে। আর আমার এই একরত্তি মেয়েটা না খেয়ে থাকবে? এ দুঃসময়ে উনার তো নিজের থেকেই বলা উচিত ছিল— রিফাত সাহেব, এবারের বাড়ি ভাড়াটা ধীরেসুস্থেই দিয়েন। কোন তাড়া নেই কিন্তু। ভাবতে পারো? উনি তিন-তিনটে বাড়ির মালিক। সেখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড়, দুই লাখ টাকা বাড়ি ভাড়া পায়। সাভারে বিশাল মাছের খামার। শুনেছি, সেখান থেকেও বেশ লাভ হয়। আর গাজীপুরে বিরাট চালের আড়ত। সেটার কথা নাইবা বললাম, সে কাহিনী তো সবার জানা। আর আমাদের বাড়ির নিচের তলায় কোন ভাড়াটে নেই। ওটা সব সময় তালা বন্ধ থাকে। ওখানে যে কী রহস্য লুকানো আছে তা খোদাই জানেন। আজ এভাবে এসে আমাদের এই ক’টা টাকা না নিলেই কী তার চলত না!

মেরিনা জানে যে রিফাত ক্ষেপে গেলে উল্টোপাল্টা কিছু করে বসতে পারে। তাই রিফাতকে ঠান্ডা করার জন্য বলে, আচ্ছা এখন এত মাথা গরম করে লাভ নেই। বরং ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো কী করা যায়। নইলে মেয়েকে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। আর সামনের মাসে বাড়িটাও ছেড়ে দিতে হবে। কোথায় গিয়ে উঠব তখন, ভেবে দেখেছ কিছু?

রিফাত ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, জানি না মেরিনা। এই মুহূর্তে আমার মাথা একেবারেই কাজ করছে না।

এদিকে মেয়ে ইশানা তখন বাবার সেলফোনটা নিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করছিল। সে সময় একটা দারুণ সুন্দর ফুডোগ্রাফি তার চোখে পড়ে। দেখেই জিভে জল এসে যাওয়া ছবি। ইশানা মাকে ছবিটি দেখিয়ে বলে আমাকে আজকে এমন একটা খাবার রান্না করে দাও না মা। আমার শুধু শুধু ডাল ভাত খেতে ইচ্ছে করে না। এটা খেতে খুব পচা। আর খাব না মা।

মেয়ের কথা শুনে বাবা মায়ের চোখে পানি এসে যায়। মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না লুকিয়ে বলে, আমার মা টা কী এখন কোন গল্প শুনবে? রাজকন্যার আর রাজা, রাণী গল্প?

মেয়ে বেঁকে বসে, বলে তুমি রোজ রোজ আমাকে একই গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আজ আমি আর ঐ গল্পটা শুনতে চাই না। আমি ঘুমাবো না। যতক্ষণ না তুমি আমাকে এই ছবির মতো খাবারটা রান্না করে না দেবে। ছোট্ট মেয়েটা বিরিয়ানির ছবিটা দেখিয়ে দেখিয়ে কাঁদে আর বলে, দাও না মা রান্না করে। এক্ষুণি দাও না। খুব ক্ষিদে পেয়েছে তো।

মেয়ের কথা শুনে মেরিনা বুকে পাথর বেঁধে বসে থাকে। কী করে বোঝাবে ওকে যে এই মুহূর্তে তাদের সামর্থ্য নেই। মেরিনা দিশেহারা হয়ে যায়।

মেয়ের এমন অবস্থা দেখে রিফাত ক্ষেপে গিয়ে বলে, আমি এক্ষুণি গিয়ে ঐ কষাইটার কাছ থেকে টাকাটা ফিরিয়ে আনব।

মেরিনা অনেক বাধা দেয় রিফাতকে।

কিন্তু রিফাত মেরিনার কোন কথাতেই কর্নপাত করে না। রিফাত বাড়িওয়ালার বাসায় গিয়ে চাচার কাছে টাকা চাইতে যায়।

উনি বলেন সব টাকা আজ সকালে বাজার করতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছে। তুমি বরং এখান থেকে ইশানার জন্য কিছু খাবার নিয়ে যাও।

এটা শুনে রিফাতের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। বলে, এটা তো একবেলার খাবার। তারপর?

শুনে বাড়িওয়ালা বলেন এতে আমি কী করতে পারি?

আপনার কিছুই করার নেই?

না নেই।

রিফাত এবার আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। বলেই ফেলে। দেখেন, আমি কিন্তু প্রায়ই রাতে জেগে ছাদে হাঁটাহাঁটি করি। এই বাড়িতে রাতে কে আসে আর কে যায়। সবই আমার জানা। আমি কিন্তু কখনো মুখ খুলিনি। এবার খুলতে বাধ্য হবো। বলেই রিফাত হন্ হন্ করে চিলেকোঠায় উঠে যায়।

মেরিনা, রিফাতের অমন রাগী রাগী মুখ দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। বলে কী করে এসেছ তুমি? বাড়িওয়ালা চাচার সাথে কোন ঝামেলা বাঁধিয়ে আসনি তো?

রিফাত মাথা নিচু করে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে।

মেরিনা জানে রিফাত কোন অন্যায় দেখে চুপচাপ সহ্য করার মতো ছেলে নয়। তবুও ওকে অনেক অনুরোধ করে এ সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে।

কিন্তু রিফাত যেন মেরিনার কোন কথাই শুনতে পায় না।

এর কিছুক্ষণ পর বাড়িওয়ালি চাচী আসেন তিন হাজার টাকা আর এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়ে। রিফাতের ঘরের দরজা তখনও খোলাই ছিল। ওদের চেঁচামেচি শুনে চাচী কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর বলেন, মেরিনা ভেতরে আসব?

এলোমেলো মেরিনা তাড়াতাড়ি নিজে একটু গুছিয়ে বলে, আসেন চাচী।

চাচী ঢুকেই খাবাররে প্লেটটা মেরিনার হাতে দিয়ে বলেন, এটা তোমার মেয়ের জন্য। আর টাকাটা গিয়ে রিফাতের হাতে দিতে যায়।

কিন্তু রিফাত টাকাটা নিতে অস্বীকার করে।

চাচী রিফাতের মাথায় হাত বুলিয়ে টাকাটা ওকে নিতে বাধ্য করেন।

এদিকে বিরিয়ানির গন্ধ পেয়ে ইশানা দৌড়ে আসে, ততক্ষণে চাচী চলে গেছেন। মার কাছ থেকে বিরিয়ানির প্লেটটা নিয়ে খেতে যাবে, ঠিক তখনই…

রিফাত তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে এসে, ইশানার কাছ থেকে বিরিয়ানির প্লেটটা নিয়ে বলে, আম্মু এই প্লেটটা এখন আমাকে দাও, তোমাকে এর চেয়ে ভালো খাবার এনে দেবো আমি।

ইশানা কাঁদতে থাকে। ও কিছুতেই প্লেটাট দিতে চায় না। রিফাত জোর করে প্লেটটা ইশানার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।

মেরিনা অবাক হয়ে রিফাতকে বলে, তুমি এমন অমানুষ হলে কীভাবে? কী করছ তুমি মেয়েটার সাথে, বুঝতে পারছ?

রিফাত কোন কথার উত্তর না দিয়ে, তিন হাজার টাকা আর ঐ খাবারের প্লেটটা নিয়ে হন্ হন্ করে বাইরে বেরিয়ে যায়।

এদিকে ইশানা জোরে জোরে কাঁদতে থাকে।

দেখে মেরিনা দিশেহারা হয়ে যায়। এই মুহূর্তে কি করবে কিচ্ছু মাথায় আসে না। মেয়েকে বুঝিয়ে ডাল ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ইশানা বারবার মুখ থেকে ভাত ফেলে দেয়। হঠাৎ তার মনে পড়ে তার অফিসের এক সিনিয়র আপুর কথা। রায়না আপু। খুব মিষ্টি স্বভাবের। এম ডি স্যারের পি এ। উনার সাথে এম ডি স্যারের বেশ খাতির আছে। মেরিনা এখন রিফাতের উপর আর ভরসা করতে পারছে না। গত তিন চারদিন ধরে রিফাত কিছু টাকা ধার নেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন ভাবেই ম্যানেজ করতে পারেনি। আজকের এই ঘটনার পর, ঐ টাকা যে সে নিজের পরিবারের জন্য খরচ করবে না, তা মেরিনা খুব ভালো করেই জানে। এসব ভেবে অনেক সাহস করে মেরিনা রায়নাকে ফোন করে।

অপর প্রান্ত থেকে রায়না হাসি হাসি মুখে বলে, কেমন আছ মেরিনা?

মেরিনা খুব স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়, ভালো আছি আপু। আপনি? ওদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়। এর মধ্যে মেরিনা কয়েকবার চেষ্টা করেছে রায়নাকে তার সব কথা খুলে বলতে। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারছে না।

রায়না এক সময় জিজ্ঞেস করে, রাতের খাবার খেয়েছ তোমরা?

মেরিনা এবার নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারে না। রায়নার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না। গলা ভারী হয়ে আসে। চোখ থেকে নীরবে অশ্রু ঝরতে থাকে।

ঐদিকে মেয়ে বিরিয়ানি খেতে না পেয়ে ক্রমাগত কেঁদেই যাচ্ছে। আর বলছে খিদে পেয়েছে মা। খেতে দাও না।

এতক্ষণ রায়না চুপচাপ ইশানার কান্না শুনছিল। ওর যা বুঝার বুঝে নিয়ে নিজে থেকেই মেরিনাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি আমাকে তোমার সমস্যার কথা খুলে বলতে পারো মেরিনা। আমি তো তোমার বড় বোনের মতোই, তাইনা?

শুনে মেরিনা বুকে একটু সাহস ফিরে পায়। রায়নাকে বলে— আপু, আমার এই মুহূর্তে দুই-তিন সপ্তাহ চলার মতো কিছু খাবার অথবা টাকা লাগবে। আমি আর আমার হাসবেন্ড অনেক চেষ্টা করেও ম্যানেজ করতে পারিনি। গত তিন দিন ধরে আমরা শুধু ডাল ভাত খেয়ে আছি। সেটাও কাল শেষ হয়ে যাবে। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আর ঠিক তখনই আপনার কথা মনে হলো। আপু, আপনি যদি এম ডি স্যারকে একটু বলে দেখতেন। উনি আমাকে দু’মাসের টাকা এডভান্স দিতেন, তাহলে খুব ভালো হতো। আমি উনাকে গত তিন-চার দিন ধরে ফোন দিচ্ছি, কিন্তু উনি আমার ফোন রিসিভ করছেন না। হয়ত আননোন নম্বর ভেবে। অথবা যে কোন কারণেই হোক।

মেরিনার কথা শুনে রায়নার খুব খারাপ লাগে। বলে, আমি তোমার কথা এম ডি স্যারকে বলে দেখতে পারি। তবে উনি আমার কথা রাখবেন কিনা, আমি কিন্তু শিওর না। কারণ আমি নিজের জন্য উনার কাছে কখনো কোন সাহায্য চাইনি। তোমার কথা বললে উনি কীভাবে রিএক্ট করবেন, তা আমার জানা নেই। তবে আমি তোমার কথা অবশ্যই বলব। আর একটা কথা, তুমি যদি কিছু মনে না করো, তাহলে আমি কি তোমাকে এক্ষুণি কিছু টাকা বিকাশ করতে পারি?

মেরিনা কিছুটা ইতস্তত করে বলে, আপু আমি টাকাটা এখন নিলে কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফেরত দিতে পারব না।

তোমাকে ফেরত দিতে হবে না মেরিনা। তবে তোমার যখন সামর্থ্য হবে তখন কারোর এমন বিপদের দিনে তাকে তোমার সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে দিও। তাহলেই আমার পাওয়া হয়ে যাবে।

মেরিনা কান্না জড়িত কন্ঠে রায়নাকে কৃতজ্ঞতা জানায়।

প্রায় একঘন্টা পরে রায়না বিকাশ করে মেরিনাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠায়। এই পাঁচ হাজার টাকা হয়ত কিছুই না। তবে রায়না তার সাধ্যের মধ্যে থেকে মেরিনার জন্য কিছু করেছে, সেটা অনেক বড় কথা।

দু’ঘন্টা পর রিফাত প্রফুল্ল মনে বাসায় ফেরে।

মেরিনা তখন ইশানাকে শান্ত করে ঘুম পড়াচ্ছিল। রিফাতের আসার শব্দ পেয়ে মেয়ের কাছে খুব সাবধানে উঠে এসে দেখে রিফাত একদম শূন্য হাতে ফিরেছে। মেরিনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, খালি হাতে কেন? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি বোধ হয় মেয়ের জন্য কিছু কিনে আনতে গেছ। মেরিনা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে রিফাতকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে। মেয়েকে ওভাবে কাঁদিয়ে রেখে কোথায় ছিলে এতক্ষণ? বিরিয়ানিটা কি করেছ? তখন মেয়ের কাছ থেকে ওভাবে খাবারের প্লেটটা কেড়ে নিয়েছিলে কেন? মেরিনা এর আগে কখনো এভাবে উত্তেজিত হয়নি। কিন্তু আজ মেয়ের মুখের খাবার কেড়ে নেয়াটা ও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

রিফাত এবার মেরিনাকে শান্ত হয়ে বসতে বলে। আগে তুমি এখানে বসো, প্লিজ! আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলছি। শোন মেরিনা, তখন আমার বিবেকে বাধছিল মেয়ের মুখে ঐ খাবারটা তুলে দিতে। ইশানা ডাল ভাত খেয়ে দিব্বি বেঁচে থাকতে পারবে। ওর কিচ্ছু হবে না। কিন্তু আমি যাদের আজ বিকেলে রাস্তায় আধ মরা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে এসেছিলাম, ঐ খাবার আর টাকাটা আমার থেকে তাদের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। তাই ওদের দিয়ে এসেছি। সাথে আরো কিছু খাবারও কিনে দিয়েছি। জানো, ওরা যখন আমার সামনে বসে খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছিল, আমার দু’চোখ বেয়ে তখন আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। এখন আমার অনেক শান্তি লাগছে। বাড়িওয়ালা চাচার উপর রাগটাও এখন আর নেই।

মেরিনা এবার ক্ষেপে গিয়ে বলে, আর আমাদের কী হবে সেটা একবারও ভাবলে না? কালই তো চাল ডাল সব ফুরিয়ে যাবে। তারপর?

রিফাত বলে, একটু আগে মোহর মামার সাথে কথা হয়েছে। মামা কুমারখালীতে থাকেন। উনার অনেক ধানের জমি আছে। মোটামুটি স্বচ্ছল অবস্থা। উনি বলেছেন, কাল কিছু টাকা বিকাশ করে পাঠাবেন।

তখন মেরিনা একটু রাগ দেখিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, থাক তার আর দরকার নেই।

রিফাত অবাক হয়ে বলে, কেন? দরকার নেই কেন?

মেরিনা বলে আমি জানতাম, তুমি যখন অমন রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলে তখন কিছু একটা তো তোমার মাথায় ঘুরঘুর করছে। খালি হাতে যে বাসায় ফিরবে, সেটা আচঁ করতে পেরেছিলাম। তোমাকে তো চিনি। এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন করেছ তুমি। তাই তুমি চলে যাবার পর পরই আমার অফিসের রায়না আপুকে ফোন করেছিলাম। আপু অলরেডি আমাকে পাঁচ হাজার টাকা বিকাশ করেছেন। এই তো একটু আগে।

রিফাত তখন বলে, দেখো, আমি তো ঐ তিন হাজার টাকা দিয়ে এসেছিলাম  তাদেরকে, যাদের আমার থেকে খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। তেমনি আজ তোমাকেও কেউ একজন সাহায্য করেছেন, তার থেকে আমাদের বেশি প্রয়োজন বলে। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই আসলে সহানুভূতিশীল। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ স্বার্থপর বা লোভী। আজ শুধুমাত্র তাদের কারণেই আমাদের সমাজে এমন বৈষম্য তৈরী হয়েছে। কিন্তু সমাজের এইসব বিত্তবানরা যদি এই দুঃসময়ে আমাদের মতো অসহায় মানুষগুলোর পাশে এসে একটু দাঁড়াতেন, তাহলে হয়ত আমাদের সমাজ আজ এতটা ভারসাম্যহীন হতো না।

রিফাত ঠিকিই বলেছে, আমাদের যাদের একটু সামর্থ্য আছে, তারা কিন্তু অনায়াসে এমন দুঃসময়ে দুঃস্থ মানুষদের পাশে এসে সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে দিতে পারি। এখানে রিফাতই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হয়ত এই তিন হাজার টাকা আর এক বেলার খাবার তাদের বেঁচে থাকবার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু রিফাত তো তার সাধ্যের মধ্যে থেকে চেষ্টা করেছে। সেটা কিন্তু যথেষ্ট বড় মনের পরিচয় দেয়, যা অনেকেই পারে না।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত