রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

ভয়ানক বিষাদগ্রস্ত হয়ে হাসান হামিদের ‘নাঙ্গেলি’ শেষ করলাম

সাবরিনা প্রিয়ম

ভয়ানকভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে বইটা শেষ করলাম। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে। মরিয়ম, ফাতেমা, উর্মি, নাঙ্গেলি এদের জীবনকে কিছুক্ষণের জন্য ছুঁয়ে গিয়েছি লেখকের কল্যাণে। মানতে পারিনি রতন, চিরুর সাথে করা অন্যায়- উর্মি এবং নাঙ্গেলির বিদায়। গল্পটা পড়ছিলাম আর আমার মনে হচ্ছিলো লেখক আমাকে নিয়ে গিয়েছেন চেরথালায়। সেখানকার মানুষের জীবন এবং জীবিকার ছবি ছেপে যাচ্ছেন বইয়ের পাতার পর পাতায়। অসাধারণ লেখকের লেখনী। শুরুর দিকে মাঝামাঝি গল্পে একটা ধীরভাব চলে এলেও লেখক আবার টেনে ধরেছেন শেষের দিকে। বোর হবার অবকাশ নেই গল্পের আকর্ষণ ক্ষমতার কারণে।

সমাজের চিত্র কি তাহলে দুইশ বছর ধরে একটাই ভিত্তিতে আঁকা? গরীবের উপর ধনীর, দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার?
নাঙ্গেলির ত্যাগ নারীর লজ্জা বাঁচিয়েছে ঠিক। তবুও, মানতে পারিনি কারণ এই ত্যাগ গরীবের উপর করা ধনী সমাজের অন্যায়।
বইটা পড়া শেষ করে কেঁদেছি, কষ্ট পেয়েছি।
বেশি বলতে গেলে গল্পের স্পয়লার হয়ে যাবে, যদিও আমার ধারণা কিছু স্পয়লার দিয়েছি।
লেখকের গল্প লেখার ধরণ অসাধারণ। গল্পটা এতটা সুন্দর করে, গুছিয়ে লেখার জন্য লেখককে বাহবা দিতেই হবে। ভালো লেগেছে প্রচ্ছদ।

বিষন্নতার চাদরে মোড়ানো এক টুকরো সুন্দর করে গুছানো গল্প পাঠকের জন্য লেখার কারণে, ধন্যবাদটা লেখকের প্রাপ্য।

অল্প কিছুটা আকর্ষণ গল্প থেকে হারানোর কারণে বইটা শেষ করতে দেরি হলো। তবে, ভীষণভাবে বিষন্ন যখন হয়েছি, তখন বলতেই হবে – একটি ভালো বই পড়েছি, সময় নষ্ট হয়নি বইটি পড়ে।

আজ থেকে প্রায় দুই শ বছর আগের কথা। ভারতের ত্রিভাঙ্কুরে নিম্নবর্ণের হিন্দু নারীদের বুক ঢেকে রাখতে হলে ‘কর’ দিতে হত। আর আদায়কারী সেটি নির্ধারণ করত স্তনের আকারের ভিত্তিতে। একে বলা হত ‘ব্রেস্ট ট্যাক্স’। প্রাপ্ত এ করের বড় অংশই চলে যেত ত্রিভাঙ্কুরের রাজার পদ্মনাভ মন্দিরে। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’র হিসেবে এটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মন্দিরের একটি। অথচ এখানে মিশে আছে সেই সময়কার দলিত সম্প্রদায়, নিম্নবর্ণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষের মেহনতের টাকা। একদিন এই স্তনকরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এক নারী। নাঙ্গেলি তার নাম। করের বদলে শুল্ক আদায়কারী আধিকারিককে নাঙ্গেলি দুই স্তন কেটে দিয়ে দেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেদিন তার মৃত্যু হয়। এই বইয়ের গল্পটি সেই নিম্নবর্গের ওপর আরোপিত বর্বরোচিত কর-এর, ওই জনপদের মানুষের ক্ষুধা ও কামের; তাদের দীর্ঘশ্বাসের।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.