বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১

ভূতপূর্ব প্রেমের গল্প

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। বেশ শীত রাত্রে। ন্যাশনাল লাইব্রেরির এক দারোয়ান বেশ করে কম্বল জড়িয়ে তামাক টিপছিলেন। হঠাৎ কিছু লোকের পায়ের শব্দে উঠে দাঁড়ালেন। খুব আবছা কয়েকটি ছায়ামূর্তি একটি পালকি ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এযুগে এমন পালকি! দারোয়ান একটু চমকালেন। ‘কৌন হ্যায়’ বলে চেঁচিয়ে লন্ঠন তুলে ধরতেই লোক পালকি সব ভ্যানিশ! ভাবলেন চোখের ভুল।

এর কিছুদিন পর। এক পূর্ণিমার রাত। সেদিনও ওই দারোয়ান পাহারায়। আবার শুনলেন ওরকম পায়ের শব্দ। কয়েকজন পালকি বাহক ধরাধরি করে একটা পালকি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবার দারোয়ান দৌড় লাগালেন পালকির পিছনে। কে আছেন ওই পালকির ভিতর? একটুকরো চাঁদের আলো চলকে পড়েছে পালকির ভিতর। তাতেই দারোয়ান যা দেখলেন তাতে দাঁত কপাটি লেগে গেল। একজন সাহেব মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পালকির ভিতর। যেন মৃত। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার পোশাক। দারোয়ানের চেঁচামেচিতে বাকি দারোয়ানরা হল্লা করতে করতে হাজির। ততক্ষণে বাহক সহ পাল্কি বেমালুম উবে গেছে।

কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিকে ঘিরে এই ভৌতিক ঘটনা একটা লোকশ্রুতি। কিন্তু যেকোনো ভৌতিক ঘটনার আড়ালেই তো চাপা থাকে ক্লেদাক্ত ইতিহাস, খুনোখুনি, আত্মহনন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই ইতিহাসকে আশ্রয় করেই এসব ভূতের গল্পের জন্ম। কে ওই সাহেব? কি হয়েছিল তাঁর? ন্যাশনাল লাইব্রেরির এই ভৌতিক ঘটনার ইতিহাস ঘাঁটলে মেলে এক দুর্বার পরকীয়া। সেসব প্রায় দু’শো বছরের পুরোনো।

সেবার ক্যাথরিন এলেন এ শহরে। বাপ ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে লাগলেন চন্দননগরে। বাবা ফরাসী ধনকুবের। ক্যাথরিন তখন সুইট সিক্সটিন। কথাটা একটুও বাড়িয়ে বলা নয়। ক্যাথরিনের যে দ্বিতীয় ছবিটি দেখছেন, দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটি, ওটি যখন আঁকা তখন নাকি ক্যাথরিন বিগত যৌবনা। সুতরাং ষোড়শী ক্যাথরিন কেমন রূপসী ছিলেন সেটি সহজেই অনুমেয়। তন্বী, নীল চোখের সোনালী চুলের ক্যাথরিন চন্দননগর থেকে যখন আসলেন এ শহরে, সকল ইংরেজ পুরুষের হার্টথ্রব সে। রুলিং পার্টির ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে, অপজিশন পার্টির স্যার ফিলিপ ফ্রন্সিস ক্যাথরিনে মজলো সবাই। হেস্টিংস অবশ্য পড়েছেন বেকায়দায়। ক্যাথরিনকে মনে ধরলেও মুখে কিছু বলার জো নেই। হেস্টিং তখন এ শহরের সবচেয়ে সম্মানীয় পুরুষ। তাঁর মতো একজন একটা ছুড়ির পেছনে ফ্যা ফ্যা করছেন এ কেমন দেখায়? তাই তিনি রইলেন চুপ করে। চান্স পে ডান্স করলেন ফিলিপ ফ্রান্সিস। তিনিও তখন শহরের দ্বিতীয় ক্ষমতাবান পুরুষ।

হেস্টিংসের ঠিক পরেই। তা ওনার ওত চক্ষু লজ্জা নেই। ক্যাথরিনের মন পেতে ফ্রান্সিসের কত না চেষ্টা! নিচে যে পুরুষটির ছবি দেখছেন উনিই ফিলিপ ফ্রান্সিস। এই ছবিটি যখন আঁকা তখন তিনি কাকু হয়ে গেছেন। কিন্তু কাঁচা বয়সে ফ্রান্সিস বেশ সুপুরুষ ছিলেন। মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করতেও তাঁর জুড়ি নেই, একথা বলছেন ফ্রান্সিসের এক বন্ধু। ক্যাথরিন বহু পুরুষ সঙ্গে গোল্লায় যাচ্ছিল। ক্যাথরিনের বাপ ভাবল, যদি বিয়ে টিয়ে দিয়ে সংসারী করে মেয়েকে শুধরানো যায়।

ক্যাথরিন অবশ্য শুধরোবার মেয়েই নন। প্রথম দিকে ক্যাথরিন ফ্রান্সিসকে পাত্তা দিতেন না। এক পার্টিতে ক্যাথরিনের সঙ্গে আলাপ হল মিঃ গ্র্যান্ডের। বড়ো নরম মনের মানুষ তিনি। সব পুরুষের মতো তিনিও মজলেন ক্যাথরিনে। দুম করে ক্যাথরিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। ক্যাথরিনও বিশেষ আপত্তি করলেন না। সবাই অবাক। ক্যাথরিনের মনে তখন কী চলছিল কে জানে! ক্যাথরিনের বাবা দেখলেন এই তো মওকা। ছেলে বেশ ভদ্র। চাকরিও করে মোটামুটি একটা। ব্যাস, মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বিয়ে হল চন্দননগরের চার্চে। তবে বিয়ের খাতায় কলমে রেকর্ড খুঁজতে আপনাকে যেতে হবে কলকাতার সেন্ট জন চার্চ।

    ক্যাথরিন ও মিঃ গ্র্যান্ডের বিয়ের রেজিস্টার। এটি সংরক্ষিত আছে কলকাতার সেন্ট জন’স চার্চে।

১৭৭৭ সালের ১০ই জুলাইয়ের রেকর্ড খুলে দেখুন, মিঃ গ্র্যান্ড আর ক্যাথরিনের বিয়ের খবর পাবেন। ক্যাথরিন হলেন ম্যাডাম গ্র্যান্ড। মিঃ গ্র্যান্ড পত্নীকে চোখে হারান। তাঁর মতো এক ছাপোষা সাদাসিধে পুরুষের কপালে এমন ডাকসাইটে সুন্দরী পত্নী জুটবে এ তার কল্পনার অতীত। ক্যাথরিনের এই বিয়েতে ফ্রান্সিসের কিছু এসে যায় না। তিনি ক্যাথরিনের পেছনে পড়েই রইলেন। এক সন্ধেয় বল পার্টির আয়োজন করলেন ফ্রান্সিস। বল পার্টি মানে, খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে মেম সাহেবদের জাপ্টে ধরে নাচা গানা সব চলবে। কেউ আপত্তি করবে না। শহরের গন্যমান্য সাহেবরা আমন্ত্রিত। গ্র্যান্ড দম্পতিরও নেমন্তন্ন রইল। সেই পার্টিতেই বাজিমাত করলেন ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিসের উপর মন পড়ল ক্যাথরিনের থুড়ি মিসেস গ্র্যান্ডের। ফ্রান্সিস তার প্রেমে হাবুডুবু। দুজনে ডুবে ডুবে জল খেতে থাকলেন মিঃ গ্র্যান্ডের অজান্তেই।

মিঃ গ্র্যান্ড শহরে না থাকলে ফ্রান্সিস টুক করে চলে যান ক্যাথরিনের সঙ্গে দেখা করতে। সুযোগ পেলে ক্যাথরিনকে নিয়ে যান বাগান বাড়ি। তারপর, বাকিটা ব্যক্তিগত। শহরে তাঁদের এই সম্পর্ক নিয়ে তখন কানাঘুষো। মিঃ গ্র্যান্ডের কানেও গেল সেসব কথা। কিন্তু তিনি অন্ধ পত্নী প্রেমিক। তিনি এসব গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন। কি নিদারুণ বিশ্বাসে লিখেছেন সেসব দিনের কথা- “এমন পত্নী পেয়ে আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখী পুরুষ”। তাঁর এই বিশ্বাস ভাঙল এক রাতে। এক ডিসেম্বরের রাত।

প্রায় ন’টা নাগাদ মিঃ গ্র্যান্ড বেরোলেন বাড়ি থেকে। মিঃ বারওয়েলের বাড়িতে নেমন্তন্ন। এই সুযোগকে কাজে লাগলেন ফ্রান্সিস। পাঁচিল টপকে রাতের অন্ধকারে ঢুকলেন গ্র্যান্ডের বাড়ি। সঙ্গে কয়েকজন সাথীও আছে। তাঁদের রেখে এসেছেন বাইরে পাহারা দেওয়ার জন্যে। মিসেস গ্র্যান্ড থাকেন দোতলায়। ফ্রান্সিস সাহেব একটা মই জোগাড় করে দোতলায় ওঠার চেষ্টা করলেন। তখনই হল বিপত্তি। দারোয়ান সাহেবকে পাকড়াও করল। ফ্রান্সিসের সঙ্গে ম্যাডাম গ্র্যান্ডের সম্পর্কের কথা হাওয়ায় ভাসছে। দারোয়ানেরও তা অজানা নয়। সুতরাং ইনিই যে ফ্রান্সিস সাহেব, বুঝতে আর বাকি রইল না। তাছাড়া দারোয়ান ফ্রান্সিসকে আগেও দেখেছেন। সাহেবকে আটক করে নিচের ঘরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে ছুটলেন বাবুকে খবর দিতে।

       চার্চের চ্যাপলেনদের তালিকা। এই তালিকায় উনত্রিশ নম্বর যিনি, তিনিই ওঁদের বিয়ে দিয়েছিলেন।

তখন বারওয়েল সাহেবের বাড়িতে পার্টি চলছে। অসময়ে দারোয়ানকে ছুটে আসতে দেখে অবাক হলেন গ্র্যান্ড সাহেব। তিনি বললেন- “কী ব্যাপার, তুমি এসময়?” দারোয়ান গ্র্যান্ডের কানে ফিসফিস করে বলল- “স্যার, ফ্রান্সিস সাহেব মেমসাহেবের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে এসেছিল। আমি বেটাকে বেঁধে রেখেছি। আপনি শিগগিরি আসুন”। এই বলে দারোয়ান ছুট লাগালো। গ্র্যান্ড সাহেব পার্টি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলেন। হাউ হাউ করে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলেন তিনি। ছুটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। রাস্তায় পেয়ে গেলেন ইমপ্রে সাহেবকে। আজকে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। বাড়ি ঢুকে গ্র্যান্ড সাহেব ব্যোমকে গেলেন। কোথায় ফ্রান্সিস! এ তো জর্জ সাহেবকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ধমক দিলেন দারোয়ানকে। দারোয়ান কাঁচুমাচু হয়ে বলল- “আজ্ঞে, ফ্রন্সিস সাহেবকেই তো পাকড়াও করেছিলাম। আপনাকে যখন খবর দিতে গেলাম, এই সাহেব ফ্রান্সিস সাহেবের বাঁধন খুলে দিয়েছে। ফ্রান্সিস সাহেব পালিয়ে গেছে। আমার খুব রাগ হয়েছিল বাবু, তাই এই সাহেবকেই বেঁধে রেখেছি।”

গ্র্যান্ড বুঝলেন গন্ডগোল কিছু একটা আছে। জর্জ যখন এখানে উপস্থিত, ফ্রান্সিস এসেছিল নিশ্চয়। জর্জ ফ্রান্সিসের ছায়াসঙ্গী। বড়ো ভেঙে পড়লেন গ্র্যান্ড সাহেব। এই ঘটনা নিয়ে কম জলঘোলা হল না। সবচেয়ে বড় আঘাতটা পেলেন যেদিন ক্যাথরিন নিজের মুখে স্বীকার করল, ফ্রান্সিসের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। গ্র্যান্ড সাহেব ফ্রান্সিসের নামে কোর্টে কেস ঠুকলেন। কিন্তু ক্যাথরিনকে কিছু বললেন না। সাহেব বড়ো ভালোবাসতেন ক্যাথরিনকে। সাহেব লিখছেন ডায়েরিতে- “ওকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।” কিন্তু ক্যাথরিনের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কও তিনি রাখলেন না। ক্যাথরিনকে তিনি বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিলেন।

এবার এই গল্পে এন্ট্রি নিলেন শূন্য থেকে সোনা তৈরি করার মালিক। তিনি আর কেউ না, হেস্টিংস সাহেব।
ফ্রান্সিসের এমন কর্মকাণ্ডে হেস্টিংস তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। দুজনের রাজনৈতিক চাপানউতোর দীর্ঘ দিনের। রাজনৈতিক দিক থেকে ফ্রান্সিস তাঁর জাঁদরেল প্রতিপক্ষ। তাকে ইন্ধন দিল প্রেম ঘটিত ঈর্ষা। ততদিনে হেস্টিংস বিবাহিত, তবুও এই ক্যাথরিনকে একদিন মনে মনে তিনিও তো কামনা করেছিলেন। হেস্টিংস দেখলেন ফ্রান্সিসকে টাইট দেওয়ার এই তো সুযোগ। এমনিতেই বেচারা মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত। ফ্রান্সিসকে পাঠালেন চিঠি- “আও, লড়ো আমার সাথে।” লড়া মানে, মল্লযুদ্ধ, লাঠিখেলা নয়। পিস্তলের ডুয়েল। এমন প্রস্তাবে ঘাবড়ে গেলেন ফ্রান্সিস। তিনি দুরন্ত প্রেমিক হতে পারেন, কিন্তু বন্দুক ধরেননি কোনোদিন। হেস্টিংস ওসব শুনতে নারাজ। নানা ভাবে তিনি চাপ দিতে থাকলেন ফ্রান্সিসকে। ফ্রান্সিস পড়লেন মুশকিলে। ডুয়েলের প্রস্তাবে রাজি না হলে তার প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন। লোকে কাপুরুষ বলে দুয়ো দেবে। তিনি রাজি হলেন। হেস্টিংসকে পাঠালেন চিঠি- “আপনি মশাই ছোটলোক। আমায় ডুয়েল লড়ার জন্যে জোরাজুরি করছেন।” কোথায় লড়া হবে ডুয়েল?

অনেক টালবাহানার পর ঠিক হল বেলভেদের রোডের বাগান। এখনকার ন্যাশনাল লাইব্রেরি চত্বর। ১৭৮০ সালের ১৭ই আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটায় দু-পক্ষ হাজির সেখানে। হেস্টিংসের সঙ্গ নিয়েছেন কর্নেল পিয়ার্স। ফ্রান্সিসের সঙ্গে আছেন কর্ণেল ওয়াটসন। প্রতিপক্ষ ডুয়েল লড়ার সময় কোনো কারচুপি করছে কিনা তারা খতিয়ে দেখবেন। হেস্টিংস-ফ্রান্সিস দুজনে গুনে গুনে চোদ্দ পা তফাতে মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দুজনের হাতেই একই ধরনের বন্দুক ধরিয়ে দেওয়া হল। আগে বন্দুক পরীক্ষার পালা। হেস্টিংসের বন্দুক থেকে গুলি বেরলো। ফ্রান্সিসের বন্দুক চলল না। ক্যাপ ফাটানোর বন্দুক এনেছিলেন কিনা জানা নেই। হেস্টিংস বললেন- “কৌই বাত নেহি। আমি বদলে দিচ্ছি বন্দুক।” ফ্রান্সিসের হাতে নতুন বন্দুক এল। এবার শুরু হবে ডুয়েল। কর্নেল পিয়ার্স, কর্নেল ওয়াটসন দুজনে ঘড়ি দেখতে থাকলেন। কর্নেল পিয়ার্স বললেন- “ফায়ার”। দুটো পিস্তল এক সঙ্গে গর্জে উঠল। ফ্রান্সিসের গুলি হেস্টিংসের গায়েও লাগল না। কিন্তু হেস্টিংসের ছোড়া গুলি বিধল ফ্রান্সিসের শরীরে। সাহেব আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তবে কি ফ্রান্সিস সাহেব মারা গেলেন? এখনকার ন্যাশনাল লাইব্রেরির ভূত কি ফ্রান্সিস সাহেবের অতৃপ্ত আত্মা? জনশ্রুতি তেমনই বলে। এখানেই জনশ্রুতির সঙ্গে প্রভেদ গড়ে ইতিহাস। সত্যি কি ঘটেছিল সেদিন? ফ্রান্সিস সাহেব কি মারা গেলেন? বাকি গল্পটা তাহলে বলি।

গুলি লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। হেস্টিংস- “ও মাই গড” বলে ছুটে গেলেন। তিনি ফ্রান্সিসকে মারতে চাননি। একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলেন। ব্যাটা টেঁসে গেল নাকি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ফ্রান্সিসের শরীর। গুলি লেগেছে ঘাড়ে। ফ্রান্সিস নড়ছেন না। কর্নেল পিয়ার্স পরীক্ষা করে বুঝলেন ক্ষীণ শ্বাস পড়ছে ফ্রান্সিসের। তিনি ছুটলেন কাপড় আনতে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে হবে এক্ষুণি। কর্নেল ওয়াটসন ছুটলেন খাট পালকির ব্যবস্থা করতে। এক্ষুনি ফ্রান্সিসকে শহরে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ব্যবস্থা হল। কিন্তু তখন ঘোর বর্ষা। গঙ্গায় বান ডেকেছে। কী করে গঙ্গা পেরিয়ে শহরে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে? যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ফ্রান্সিস। এপারেই টালি সাহেবের বাগান বাড়িতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। বিখ্যাত ডাক্তার ক্যাম্পবেল আসলেন। বললেন- “আঘাত খুব গুরুতর কিছু নয়। অকস্মাৎ গুলির আঘাতে জ্ঞান হারিয়েছিলেন।” কিছুদিনের মধ্যেই ফ্রান্সিস সুস্থ হয়ে উঠলেন। মাস খানেক পর তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার খবর নিজে লিখেছেন ডায়েরিতে। ফ্রান্সিস মারা যান বহু পরে, নিজের দেশেতে। তাহলে, ন্যাশনাল লাইব্রেরির দারোয়ানের ভূত দেখা কি চোখের ভুল? নাকি, কোনো নিশীথে এ তিলোত্তমা রোমন্থন করে তার রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি! কে জানে।

পুনশ্চঃ ম্যাডাম গ্র্যান্ডের কী হল? ফ্রান্সিসের সঙ্গে ম্যাডাম গ্র্যান্ডের সম্পর্কও বেশিদিন টেকেনি। মিঃ গ্র্যান্ড ফ্রন্সিসের নামে যে কেস ঠুকেছিল, তাতে ফ্রান্সিস হেরে যান। তাতে অবশ্য বিশেষ ক্ষতি তাঁর হয়নি। ম্যাডাম গ্র্যান্ড কয়েক বছরের মধ্যেই ফ্রান্সে ফিরে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সংসার পাতলেন। মিঃ গ্র্যান্ড কয়েক বছর পর এক ইংরেজ মহিলাকে বিয়ে করে জীবনে সুখী হয়েছিলেন। হ্যাপি এন্ডিং।

 

• ঋণস্বীকার- ভূতের ঘটনাটি পেয়েছি বারিদবরণ ঘোষের “আদিম কলকাতার ভূতের বাড়ি ও অন্যান্য” বই থেকে
• ইতিহাস খুঁজতে ঘাঁটাঘাঁটি করছি, Echoes from Old Calcutta- H.E. Bustedd, Calcutta old and new- H.B. Cotton।
• এছাড়া হেস্টিংস সাহেবের চিঠিপত্র, ফ্রান্সিস সাহেব, গ্র্যান্ড সাহেবের ডায়েরি এসব তো আছেই।

ছবি ও লেখা : গৌরব বিশ্বাস


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত