বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯

মাধ্যমিকের ৬ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে ৩ বছরে

দেশবার্তা ডেস্ক

শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা চালু করলেও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমছে না। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় পাসের পর অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়া পর্যন্ত গত তিন বছরে ছয় লাখ ৩৭ হাজার ১৬৯ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এর জন্য শিক্ষা খরচ বৃদ্ধি, সামাজিক পরিস্থিতি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কারিকুলামের সমন্বয়হীনতা, গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য, বাল্যবিবাহসহ নানা প্রতিকূলতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৬ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পাস করেছিল ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৪৩২ জন। আর ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাস করে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৮১৮ জন। উভয় পরীক্ষায় মোট পাস করেছিল ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ২৫০ জন শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে যেসব শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় পাস করেছিল তারাই আগামী ২ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখ ২৭ হাজার ৪০৬ জন। জেডিসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী তিন লাখ ৭০ হাজার ৬৭৫ জন। দুই পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮১ জন। অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন বছরের ‘শিক্ষা জার্নি’ থেকে ছিটকে পড়েছে ছয় লাখ ৩৭ হাজার ১৬৯ জন। শতকরা হিসেবে ঝরে পড়ার হার ২০ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ স্তরে চার লাখ ৮০ হাজার ৯৩৫ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছিল।

বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ২০০৮ সাল থেকে ঝরে পড়ার হার কমে আসছে। এসব শিক্ষার্থীদের অনেকে কারিগরিতে ভর্তি হয়েছে। সে হিসাব এখানে আসেনি।

তিনি আরও বলেন, এখনও মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার অনেক বেশি। প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে এ হার কমিয়ে আনা হচ্ছে। এ জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে মিড ডে মিল চালু এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক আনন্দপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি মেধাবৃত্তি ও উপবৃত্তির হার এবং অর্থের পরিমাণও বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে শিক্ষামন্ত্রী কারিগরিতে ভর্তির বিষয়টি জানালেও দেশে বর্তমানে নবম শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালু রয়েছে।

সূত্র মতে, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার মূল কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিত। মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ছাত্রী। যারা বাল্যবিবাহ এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে শিক্ষা চালিয়ে নিতে পারছে না। আর ছাত্ররা যোগ দিচ্ছে কাজে। কারণ পড়ালেখার চেয়ে কাজের মাধ্যমে আয় করাই দরিদ্র পরিবারের কাছে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর ও পাহাড়ের চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। দুর্গম এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিচ্ছেন। এজন্য সরকার তিন পার্বত্য জেলা ও চরাঞ্চলে আবাসিক স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশের দুর্গম এলাকার (হাওর, চর, পাহাড়, উপকূল) ২৫০টি উপজেলার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অধিক হারে বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ ও এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত স্কুলে ধরে রাখতে এবং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সেকায়েপ (সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট) প্রকল্পটি চালু করা হয়েছিল। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৮ লাখ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেয়া হতো। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও বিজ্ঞান ভিতি দূর করতে মেধাবীদের উচ্চ বেতনে এসসিটি (অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষক) শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি সফলতা অর্জন করে। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার হওয়ার পর সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার বেশি হবে। প্রাথমিক স্তরে উপবৃত্তি ও দুপুরে খাবার দেয়ার কারণে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে এর ধারাবাহিকতা বজায় না থাকার কারণে অনেকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। যাতে তিন বছরে আস্তে আস্তে শিক্ষার্থী ঝরে গেছে।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত