রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০

মানব সভ্যতার সর্বপ্রথম হাতে লিখা গ্রন্থ

পার্বণ মাজহার

গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারা পৃথিবী জুড়ে কত গুলো বই প্রকাশ হয়েছে? এই প্রশ্নে – গড়ে কাগজের বই ছাপিয়ে প্রকাশ হয়ে গেছে ছয় হাজারের অধিক । এমন পরিসংখ্যানে একজন পাঠক হিসেবে মিশ্র অনুভূতির জন্ম হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক । আদি যুগ থেকে উত্তরাধুনিক যুগে এসে দিনকে দিন ছাপানো বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে বৈকি কমে নি । তবে অন্যদিক দিয়ে কিছুটা হলেও আশঙ্কার বিষয় হলো এই শতকের শুরু থেকে কর্পোরেট দুনিয়া পেপার-লেস বা কাগজীয় বিষয়াদি থেকে বেড়িয়ে আসছে ক্রমেই । প্রায়ই তাই কাগজের ছাপানোর ইতি হবে কিনা সে প্রশ্ন উঠেই যায়।

সে দিকে আর অগ্রসর না হয়ে ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয় । প্রথম ছাপাখানার আবিষ্কার চীনে এবং আধুনিক ছাপাখানা যা আমরা আজকাল ব্যবহার করছি সেই ধারার যন্ত্রের যাত্রা শুরু হয় বর্তমান জার্মানিতে গুটেনবার্গের হাত ধরে ১৪৪০ সালে ।

তার মানে কি ছাপাখানার জন্মই কি প্রকাশনার জন্ম ? না ! হাতে লিখে রাখার প্রচলন খৃষ্টপূর্ব  দুই – আড়াই হাজার বছর আগেই হয়েছিলো । তাছাড়া পৃথিবীতে বর্তমান যে সমস্ত ধর্ম গ্রন্থ – পুরাণ আছে তার সবগুলোই শুরুতে সংরক্ষণ হয়েছে হাতে লিখার মধ্য দিয়ে ।

মানব সভ্যতার সর্বপ্রথম লিখা গ্রন্থ কি ? গিলগামেশ মহাকাব্য ( Epic of Gilgamesh )

মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরান, ইরাক, সিরিয়া এবং সৌদি আরব অঞ্চল) প্রাচীন সুমেরিয়ান সভ্যতার থেকেই লিপির আবিষ্কার হয়েছে বলে ধরা হয়। আর মানব সভ্যতার প্রথম সাহিত্য কর্ম  ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ তাঁদেরই রচনা ।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪০০ সালে মেসোপটেমিয়ার সুমেরিয়ান সভ্যতার মধ্যে লিপির আবিষ্কার ঘটে তাঁদের সেই লিখিত ভাষাকে ‘Archaic Cuneiform’ বলা হয় । সভ্যতার প্রমাণ তৈরিতে এই লেখ্য-ভাষা শক্ত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে দিনকে দিন । প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক এই দুইয়ের সম্পর্ক স্থাপনের পিছনে সাহিত্যই হল প্রধানতম প্রভাবক, সেদিক দিয়েও গিলগামেশ মহাকাব্য একটি নির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।

গিলগামেশ মহাকাব্যে সুমেরিয়ানদের শহর ‘উরুক’ (বর্তমান ইরাকের আল-ওয়ারকা) এর জীবন যাপন এবং অধিক ভাবে উঠে এসেছে তাঁদের ধর্ম বিশ্বাস, প্রকৃতির সাথে তাঁদের সম্পর্কের উত্থান পতনের কথা । গিলগামেশ মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র হচ্ছে গিলগামেশ নিজে, উরুক শহরের রাজা ছিলেন যিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে  শহরকে রক্ষা করেন । খোদাইকৃত পাথরে গিলগামেশের কাহিনীর শুরু মূলত পাঁচটি কবিতা দিয়ে যাতে রাজা গিলগামেশের রাজ্য পরিচালনা এবং তার পরিচিতির সন্ধান মিলে । মুল মহাকাব্য তার পর থেকে শুরু হয় পরের ৫ টি কবিতা দিয়ে।

গিলগামেশ মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র গিলগামেশ (প্রথম সংস্করণে বিলগামেশ) উরুকের ৪র্থ রাজা লোগালবান্দা ও ঈশ্বরী রিমাত নিনসানের পুত্র । তার ক্ষমতা বিভক্ত ছিল দুই ভাগ ঐশ্বরিক এবং এক ভাগ মনুষ্যে যা তকে এক অতিমানবীয় রাজাতে রূপান্তর করে । মহাকাব্যে মহা প্লাবনের কথা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে যার সাথে খ্রিস্টান ধর্মের অবতার নূহ এর প্লাবনের সাথে সাদৃশ্য লক্ষণীয় । গ্রিক মহাকাব্য অডিসি’র কাহিনীর আবর্তনের সাথেও গিলগামেশ মহাকাব্যের মিল পাওয়া যায়।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত