মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

Advertisement

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ও আমাদের করণীয়

Advertisement

নাসরীন আক্তার খানম

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছিলেন মুক্তির বারতা, অকুতোভয়ে বজ্রকণ্ঠে ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার। এরই ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ।জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের এই লগ্নে জানাই জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
একটি দেশকে গড়তে হলে সবার আগে দেশবাসীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে এই চিন্তা বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ও মননে সর্বাদাই ছিল।
শিক্ষা মানুষের আচরণগত দিকে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়।
শিক্ষার পদ্ধতি তিন ধরনের অনানুষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক এবং উপানুষ্ঠানিক। সক্রেটিস, এরিস্টেটল, প্লেটো, কনফুসিয়াস, জন ডিউই, জ্যাঁ জ্যাক রুশো, জন ফ্রেডরিক হার্বাট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন মনিষী শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং একে একটি সর্বজনীন কাঠামোর ভেতরে এনে দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। যে শিক্ষা মানুষের ভেতর সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটাবে,চেতনার জগত ব্যাপক পরিবর্তন এনে তাকে মানবধর্মে উদ্বুদ্ধ করবে এবং তার জাগতিক প্রয়োজন মেটাবে সে ধরনের একটা শিক্ষা ব্যবস্থা বিনির্মাণের যারা ধারক তাদের সাথে জাতির জনকের নামও অনায়াসে যুক্ত করা যায়।
স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। এরই ধারাবাহিকতায় কুদরতে খুদা শিক্ষা কমিশন তিনি গঠন করেছিলেন। জাতীয়করণ করেছিলেন প্রাথমিক স্কুলগুলোকে।
এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। শিক্ষা পৌঁছে যায় সকলের দোরগোড়ায়।এবং প্রাথমিক শিক্ষকগণেরও আর্থিক দৈন্যদশার উন্নয়ন ঘটে।
২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণ করেন।গনতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে আরও অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তার মধ্যে সবার জন্য উপবৃত্তি চালু, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু,ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালুসহ আরও অনেক অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যে বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে,যে বিষয়টি মূল্যায়িত করেছে সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনকে তা হলো প্রাথমিকে শিক্ষা পদক চালু করা। বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতা ফুটবল টুনার্মেন্ট ও আন্তঃপ্রাাথমিক ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করা।
আমাদের আজকের প্রবন্ধ-প্রাথমিক শিক্ষা ও আমাদের করণীয়।
শিক্ষা জীবনভর চলমান একটি প্রক্রিয়া, শিক্ষার কোনও শেষ নেই। যদিও পদ্ধতিগত,কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার সময় ও সিলেবাস নির্ধারিত এবং আমরা এই পদ্ধতিগত শিক্ষার কথাই বলছি।
তাহলে এই শিক্ষার সাথে প্রাথমিক শব্দটি যুক্ত করে একে বিশেষায়িত কেন করা হলো?
করা হয়েছে এজন্য যে প্রাথমিক শিক্ষা হলো উচ্চ ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি স্বরূপ। শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্খিত প্রান্তিক যোগ্যতা সমূহ শতভাগ অর্জন করে সুশিক্ষিত ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে, বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাবে এবং যোগ্য নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। উচ্চ শিক্ষা অর্জনের, বিশাল পৃথিবীর বিশাল মঞ্চে যে কর্মযজ্ঞ তাতে প্রথম পা ফেলার প্রথম পদক্ষেপ হলো প্রাথমিক শিক্ষা, বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিযোগিতায় সফল করা,টিকে থাকা তারই প্রস্তুতি হলো প্রাথমিক শিক্ষা এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম।
একটি ক্ষুদ্র চারাগাছ মহীরূহতে পরিণত হবে কিনা, চারা অবস্থায় তা বীজ, মাটি, আবহাওয়া ও যত্নের উপর নির্ভর করে, তেমনি মানব শিশুর বেলায়ও তাই।
শিক্ষাবান্ধব অনুকুল একটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা একটি শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।
সেই লক্ষ্যে আমাদের শিক্ষাবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন নিরন্তর। সেই সাথে প্রাথমিকের বিশাল যে জনবল কাঠামো কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত – সবাই আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য।
কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে আমরা ইপ্সিত অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি।
সুনামগঞ্জের ক্ষেত্রে–
* শতভাগ ভর্তিঃ শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে ইতিমধ্যেই।যদিও সুনামগঞ্জ জাতীয় অর্জন থেকে কিছুটা পিছিয়ে,৯৪% প্রায়।আমরা সচেতন এ ব্যপারে, এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
কিন্তু স্কুলগুলোতে শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাত যেখানে জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী ১:৩০ হওয়ার কথা,সেখানে সর্বত্র এই অনুপাত বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। হাওর জেলা সুনামগঞ্জে এই অনুপাত ১:৫৫।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী শিক্ষক শিক্ষার্থী অনুপাতে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে সুনামগঞ্জের অবস্থান দ্বিতীয়। সদ্য জাতীয়করণকৃত স্কুল সমূহে এটি আরও বেশি।
* উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে দেশের সাড়ে ছয়শো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ এর নিচে নেমে এসেছে,২৫টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০ জনের কম।
বলা হয়ে থাকে এজন্য সংশ্লিষ্ট স্কুল শিক্ষকগণ দায়ী এজন্য।আমাদের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিচার করতে হবে।
একটি দেশে সকল শিক্ষার্থীর জন্য কেন একই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকবেনা?
কোনও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে তাঁদের সন্তান পড়াতে চান না,কারণ প্রাথমিক স্কুল গুলোতে সকল শ্রেণির শিশুরা পড়ার সুযোগ পায়। আভিজাত্য, স্বাতন্ত্র্যময়তা ধরে রাখার মনোভাব এক্ষেত্রে দায়ী বলে আমি মনে করি। এতে শিশুরা বৈষম্যের মাঝে বেড়ে উঠে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষকবৃন্দই সবচে বেশি দক্ষ এবং যোগ্যতা সম্পন্ন।
এক্ষেত্রে দীর্ঘ স্কুল টাইম, টিফিন টাইমের স্বল্পতা এবং ব্যক্তি মানসের হীনমন্যতা বোধ দায়ী বলে মনে করেন অনেকে।আবার অনেক অভিভাবক চান তার শিশু অধিক বই পড়ুক,স্কুলের ব্যাগের চাপে পিষ্ট হয় অজান্তে অনেক শিশুর শৈশব- আর প্রাথমিক স্কুলের অনেক শিশু পর্যাপ্ত খাতা কলমও কিনতে পারেনা অনেকসময়।
* প্রাথমিক স্কুলে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা আসে,তাদের অনেক সময় পরিবারের কাজে সাহায্য করতে হয়।উপবৃত্তি মাসে একশত টাকা শর্ত সাপেক্ষে,অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে তারা সেই শর্তগুলো পূরণে প্রায়শই ব্যর্থ হয়।
বাবাকে কাজে সাহায্য করলে বা মায়ের অবর্তমানে ঘরের কাজে সাহায্য করলে এরচেয়ে অধিক টাকা তাদের পরিবার একদিনেই রুজি করতে পারে।
এজন্য স্কুলে উপস্থিতি কম হয়।
* অনেক পরিবারে সকালের খাবারের সংস্থান থাকেনা, ফলে তারা না খেয়ে এবং দুপুরের খাবার না খেয়েই স্কুলে চলে আসে ,বিরতির পর এরা স্কুল পালায়। আকর্ষণীয় বিদ্যালয় ভবন এর কাছে পেটের খিদা হার মানে।
তারপরও শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অনেক অভিভাবক সন্তানের খাবারটি রান্না হওয়ার পর স্কুলে এসে দিয়ে যান।
স্কুলের দীর্ঘসময় কোমলমতি শিশুদের কাছে ক্লান্তিকর মনে হয়, অনেকসময় অনেক শিশু শ্রেণিকক্ষে ঘুমিয়ে পড়ে। তারা পায় না পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ।
* সুনামগঞ্জ একটি হাওর বেষ্টিত এলাকা।কথায় আছে হেমন্তে পাও,বর্ষায় নাও।
প্রাকৃতিক কারণেই স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম থাকে।বর্ষায় হাওর পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া অনেক সময় বিপদজনক,শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই।
এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার আশু উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন হাওর এলাকার জন্য আলাদা ভাবে গৃহীত সুচিন্তিত পরিকল্পনা।
* বিভিন্ন আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগও মান সম্মত শিক্ষা অর্জনে প্রভাব ফেলে।অকাল বন্যায় ফসল হানি,কর্মের অভাবে অভিভাবকগণ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র গমন করেন।
এর প্রভাব সমাপনী পরীক্ষায়ও প্রভাব ফেলে।
২০১৮ সালে সমাপনীতে সুনামগঞ্জ জেলার পাশের হার ছিলো ৯২.৯১%।
তুলনায় উন্নত ছাতকে এই হার ৯৭%।
শাল্লায় সবচে কম ৭৯.৩%।
* মাঠপর্যায়ে যারা প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব পালন করেন,উচ্চ পর্যায়ে গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রনয়ণের সময় তাঁদের মতামত নেয়া ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা জরুরী।
কারণ মাঠ পর্যায় সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকবৃন্দ।
* শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এই তিনের সমন্বয় ব্যতীত কোনও কর্মসূচীই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এজন্য অভিভাবকদের জন্য শুধু হোম ভিজিট,মা/ অভিভাবক সমাবেশ,উঠান বৈঠকই যথেষ্ট নয়,প্রয়োজন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য তাদের নিয়ে মাঝে মাঝে শিক্ষামুলক সেমিনার,সভা,কর্মশালার আয়োজন করা।
* সুনামগঞ্জ যেহেতু ভৌগলিক ভাবে একটি দুর্গম ও হাওর বেষ্টিত এলাকা,এজন্য এই জেলার জন্য পৃথক কোনও পরিকল্পনা নেয়া যায় কিনা তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবীদার।
* আমরা প্রাথনিক শিক্ষা পরিবার,শত বাধার মুখেও আমরা সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন সংক্রান্ত যে কোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর।
* প্রাথমিক স্তর যেহেতু শিশুর ভিত তৈরীর স্তর – কাজেই শিক্ষক শিক্ষার্থীর নিবিড় সম্পর্ক এবং সেই সাথে নিবিড় সাহচর্য্য প্রয়োজন। কোনও অবস্থায়ই এর ব্যত্যয় ঘটানো কাঙক্ষিত ফল বয়ে আনবেনা,কাজেই শিক্ষকগণ অবশ্যই শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করবেন এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন করে অফিস সহকারি নিয়োগ জরুরী।
* সেই সাথে আমি শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য বিনীত আহবান জানাই।
আহবান জানাই যাদের জন্য সকল আয়োজন- সেই কোমল মতি শিশুদের কথা ভেবে সকল কর্মসূচী গ্রহন করার জন্য।

Advertisement


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত