মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

মানসম্মত শিক্ষা বনাম বেকারত্ব

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার বাড়ছে। মাত্র সাত বছরে এ হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আইএলও’র প্রতিবেদন অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি।

২০০০ সালে বাংলাদেশে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৩.৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে এই হার হয় ৪.৪ শতাংশ। বাংলাদেশে পুরুষ বেকারের হার ৩.৩ ও নারী বেকারের হার ১২.৮ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, উচ্চশিক্ষা এখন আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশে ১০.৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৬.৮ শতাংশ, ভারতে ৮.৪ শতাংশ, মিয়ানমারে ২.৭ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৪.১ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছে তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের ২৮টি দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১০.৭ শতাংশ যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে তরুণদের বড় অংশ নিষ্ক্রিয়। তারা কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না, দেশে এমন তরুণের হার ২৭.৪ শতাংশ। মেয়েদের এই হার ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে বেকার ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার, যা এর আগের বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার বেশি। আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না।২০১৫ সালের পত্রিকায় প্রকাশিত আইএলও’র তথ্যমতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা সে সময় ছিল প্রায় ৩ কোটি এবং এতে বলা হয়েছিল বেকারত্বের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৬ কোটিতে। বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অভাব। দেশে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে শ্রেণীবিন্যাস এবং বিরাট বৈষম্য। আমাদের সংবিধানের ১৭(ক) ধারায় বলা আছে, রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর নেই। আমাদের দেশে বর্তমানে মোটা দাগে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। সাধারণ শিক্ষা, ইংলিশ মিডিয়াম এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। সাধারণ স্কুল বা কলেজে নিুমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে বিত্তবানদের এবং মাদ্রাসায় গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়ে। ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদ্রাসায় বাংলাকে প্রায় অবজ্ঞা করা হয় বলা যায়। এখানে শিক্ষার্থীদের দেশাত্মবোধ বা মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, যা আমাদের সংবিধান পরিপন্থী। ২০১৪ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার বেড়েই চলেছে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বেকারের হার ১৪.২ শতাংশ। প্রতিবছর ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। দেশে কর্মসংস্থানের হার ২ শতাংশ বাড়ানো গেলে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত হবে এবং ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের ইনটেলিজেন্স ইউনিটের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সে সময় বলা হয়, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ শতাংশই বেকার। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ১০ জন শিক্ষিত তরুণের ৩ জন বেকার।বেকারত্ব যে আমাদের প্রধান সমস্যা তা আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন কর্মসংস্থানের অভাবকে। আমাদের প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বৈপরীত্য রয়েছে। বিগত এক দশক ধরে আমাদের জিডিপি ৬ শতাংশের উপরে এবং বিগত ৩ থেকে ৪ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে উন্নীত হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, বাংলাদেশে কাজ করেন এমন মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৫ লাখ; কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটির ওপরে।

এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। আমরা যারা অভিভাবক রয়েছি, তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানদের পেছনে একটা বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছি, যাতে করে তারা পড়ালেখা শিখে আয়-রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু মানসম্পন্ন বাস্তবমুখী কারিগরি শিক্ষা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের এ শিক্ষা আদতে কোনো কাজে লাগছে না, ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং শিক্ষকদের গুণগতমান, নীতি, নৈতিকতার অভাব শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রাপ্ত এক তথ্য থেকে দেখা যায়, দেশের ৩৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ৭৭ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি। ৫৫৮২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩০৩ শিক্ষক।এ তো গেল একটিমাত্র পেশাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র। এ রকম বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেধাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবে জোড়াতালি দিয়ে চলছে। তাই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে এ খাতের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে দুর্নীতিগ্রস্তদের পকেটে না গিয়ে যথাযথভাবে প্রকৃত খাতে ব্যয় হয় সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষার দিকে না ঝুঁকে মানসম্পন্ন শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি, মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব, পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রতারণা করার সুযোগ ইত্যাদিই একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মানে হল একটি জাতির অবলুপ্তি। আর দেরি না করে উন্নয়নের পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষার ক্ষেত্র এবং শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার জন্য বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করবে- এটাই সবার প্রত্যাশা ও কাম্য।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও গবেষক


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত