সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২

মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার যেন ভুলে না যাই

সেলিনা হোসেন

আমরা এবার একসঙ্গে জাতীয় জীবনের তিনটি অধ্যায়ের মাইলফলক স্পর্শ করেছি। স্বাধীনতা-বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি এবং একই সঙ্গে বাঙালির মুকুটমণি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীও উদযাপন করছি। আমাদের এই ভূখণ্ডে অনেক বাঙালি প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতা জন্মেছেন। জাতির কল্যাণে তাদের অবদানও কম নয়। তাদের সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর মতো কেউ বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেননি। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন এবং তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় পরিকল্পিত ছক কষে।
দু’দিন আগে আমরা পালন করলাম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের শাসকদের নির্দেশে মূল লক্ষ্য স্থির করেছিল এই জাতিকে মেধাশূন্য করে দেওয়ার। তারা সেই নির্মম-নিষ্ঠুর-পৈশাচিক পথেই হেঁটেছিল। একাত্তরে পুরো সময় আমি ছিলাম ঢাকা শহরেই। দেখেছি রক্তগঙ্গা সাঁতরিয়ে ছিনিয়ে আনা বিজয়ের সেই দিন। সেই উত্তাল অধ্যায়ের অনেক স্মৃতি এখনও মনে হলে শিউরে উঠি। এর মধ্যে একটা খণ্ডিত দুঃসহ স্মৃতি হলো- একজন মুক্তিযোদ্ধার রক্তাক্ত লাল ঊরু এবং একটি বিচ্ছিন্ন পা (বাম)। আসলে স্মৃতি নয়; হৃদয়ের গভীর থেকে একজোড়া ভিন্ন চোখ দিয়ে দেখা স্মৃতির মতো উজ্জ্বল। চোখ বুজলে সেই না-দেখা দৃশ্য ছবি হয়ে ফুটে ওঠে। এর প্রায় দু’দশক পর ১১ নম্বর সেক্টরসহ আরও নানা ঘটনা নিয়ে যে উপন্যাসটি লিখি তার নাম ‘যুদ্ধ’। আর সেই অসাধারণ মাকে নিয়ে লিখি ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’। বিজয় দিবস আমার স্মৃতির ঊর্ধ্বে মুক্তিযুদ্ধের অম্লান বিজয়গাথা। সেদিকে তাকিয়ে দেখি- কথা কয় ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ও নেতৃত্বে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকে বীর বাঙালি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণের পর থেকেই।
বঙ্গবন্ধু ফাঁসির মঞ্চের খুব কাছে থেকে ফিরে এসেছিলেন স্বাধীন দেশে। তার সংগ্রাম-চিন্তা-চেতনা-আদর্শ-মূল্যবোধ- মুক্তির সব স্বপ্ন ধারণ করেছিল স্বাধীন দেশে প্রণীত বাহাত্তরের সেই সংবিধান। কিন্তু স্বজাতদ্রোহী কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা-সদস্য ও রাজনীতিকের যোগসাজশে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে সপরিবারে তাকে হত্যা করে ঘাতকরা যে বিয়োগান্ত অধ্যায়ের সৃষ্টি করে; এর মধ্য দিয়ে আমাদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। উল্টোপথে যাত্রা শুরু করে রক্তস্নাত বাংলাদেশ। আইন করে রুদ্ধ করে দেওয়া হয় ঘাতকদের বিচার। উপরন্তু তাদের নানাভাবে করা হয় পুরস্কৃত। বিলম্বে হলেও এর অবসান ঘটানো গেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার একে একে সব ক্ষয় ও ক্ষতের উপশমে পদক্ষেপ নেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারসহ জাতীয় চার নেতা হত্যা অর্থাৎ জেলহত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ প্রশস্ত হয়। এই বিচারে দণ্ডিত অনেকেরই চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর হলেও এখনও অনেকে বিদেশে পলাতক। বিজয়ের ৫০ বছরের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের দাবি- ওদের ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার সব ব্যবস্থার জন্য নেওয়া হোক আরও জোরালো উদ্যোগ। ৫০ বছরের বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে- এমন প্রশ্ন সামনে আসে। এ কথা সত্য, আমাদের অর্জন ৫০ বছরে কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার-প্রত্যয়েরই তো প্রতিফলন ঘটেছিল বাহাত্তরের সংবিধানে। সংবিধানে হারিয়ে যাওয়া মূলনীতির অনেকটা ফিরে এলেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রয়ে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই জায়গা থেকে ফিরে আসতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার বা বিকাশসহ বেশ কিছুতে রয়েছে আমাদের বড় অর্জন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা ভারত-পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে। তারপরও অনার্জিত রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু, যা দেশ-জাতির জন্য অপরিহার্য। বৈষম্য, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনার বৈরী ছায়া এখনও দৃশ্যমান। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র হীন তৎপরতায় লিপ্ত। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এখনও আক্রান্ত হচ্ছে নানাভাবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপরেও কখনও কখনও নিপীড়ন-নির্যাতন কিংবা তাদের অধিকার-বঞ্চনার খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির ছায়াও কম বিস্তৃত নয়। মোটা দাগে বলতে গেলে বলা যায়- বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে এখনও আমরা বেশ দূরে। অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, আরও বিকশিত গণতান্ত্রিক কিংবা মানবিক মূল্যবোধের বাংলাদেশ গড়তে হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধরে তার নির্দেশিত পথেই আমাদের হাঁটতে হবে।
বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে লাহোরে এক রাজনৈতিক বৈঠকে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। লাহোর থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি ওই ৬ দফার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ৬ দফা পর্যায়ক্রমে বাঙালির মুক্তির সনদ বলে আন্দোলন-সংগ্রামের পথে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬ দফা থেকে স্বাধীনতা আমাদের গৌরবের ইতিহাস। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বঙ্গবন্ধুর সেই দূরদর্শী চিন্তা-চেতনার গুরুত্ব উপলব্ধি করি আমরা। আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাম্যসহ মানবিক যা কিছু দরকার সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে, যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে চাই। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতাহীনতা, মূল্যবোধের ধস ক্রমেই আমাদের সমাজকে যেভাবে বিষিয়ে তুলছে, এর নিরসন ঘটাতে না পারলে সভ্য, মানবিক সমাজ হিসেবে রক্তস্নাত এদেশের স্বর্ণোজ্জ্বল পরিচিতিটাই ম্লান হয়ে যাবে। সুকুমারবৃত্তির চর্চা করার মধ্য দিয়ে নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে রাখার জোরদার প্রচেষ্টা খুব জরুরি।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের রাজনীতি নিয়ে যেসব নেতিবাচক কথা শুনতে হয়, দেখতে হয়, তা তো কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। আমাদের সব অর্জনের পেছনে রয়েছে রাজনীতির ব্যাপক ভূমিকা। রাজনীতিই ছিল সব অর্জনের নিয়ামক শক্তি- এ সত্য অস্বীকারের কোনো পথ নেই। সেই রাজনীতি কেন, কাদের কারণে শ্রীহীন হলো, তাও সচেতন মানুষমাত্রেই জানা। যে কোনো মূল্যে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন রোধে শুভবোধসম্পন্ন রাজনীতিকদের হতে হবে যূথবদ্ধ। গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে ও হূতঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে হবে আরেকটি মাইলফলকের দিকে। আর এ কাজে প্রজন্মকে সঙ্গী করে মূল ভূমিকাটা নিতে হবে প্রগতিশীল রাজনীতিকদেরই। আমাদের যে অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে, তা উদ্ধার করতেই হবে দেশ-জাতির সামগ্রিক স্বার্থ ও প্রয়োজনে। আমরা যেন আমাদের অঙ্গীকার ভুলে না যাই।
সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.