শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম, হিন্দু মুসলমান’

হাসান হামিদ

আমরা মানুষ। আজ থেকে অনেক দিন আগে চণ্ডীদাস বলেছিলেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।” আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানে লিখেছেন, ‘‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম, হিন্দু মুসলমান।” আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায়, “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে, রাষ্ট্রিক স্বার্থবৃদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?’ (‘হিন্দু মুসলমান’, রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খন্ড, ঐতিহ্য সংস্করণ, পৃ. ৭০৬)।

আসলে প্রকৃতির সৃষ্টি তত্ত্বে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য বা ভেদাভেদ নেই। কিন্তু মানুষ নিজেই তার জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের বিভেদ সৃষ্টি করে। অথচ ধর্ম, জাতি, গোত্রের চেয়ে মানুষই যে সর্বশ্রেষ্ঠ সে কথা জোরালোভাবে বলেছেন অনেকেই। কবি নজরুল তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন,

“গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

(আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল রচনাবলী, প্রথমখন্ড, বাংলা একাডেমী, পৃ. ২৩৪)

ধর্মকে কেন্দ্র করে যে বিভেদের কথা আজকাল শুনি, যারা সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন; তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প কোন ধর্মের শিক্ষা? আসলে কি কোনো ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে? বলে না। কিন্তু আশ্চর্য হলো এই ধর্মের নামেই একদল সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন। অথচ প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মপালন কিংবা বর্জন তার নিজস্ব অধিকার। মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তুমি বল, তোমার প্রতিপালক প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য প্রেরিত, অতএব যার ইচ্ছা সে ইমান আনুক, আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সূরা কাহাফ : ৩০)।

‘ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’- এই সহজ কথাটি এখন আমাদের দেশের অনেক সার্টিফিকেটধারী লোকও বুঝে না। ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বললে তারা খারিজ করে দেয়। মর্মবাণী না বুঝেই তারা ধর্মীয় লেবাস নেয়, তাদের ভাবনাগুলো না জানার কারণে আর শুদ্ধ হয় না। নিজের ধর্মের ছাড়া অন্য ধর্মের লোকদের তো অবশ্যই এমনকি নিজেদের অনুসারীদের মধ্যেও যারা লেবাসধারী নয় তাদের সম্পর্কে প্রবল আপত্তিকর মন্তব্য করে বসে। বেঁধে যায় গোলমাল। কেউ কেউ উগ্র হয়ে ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হয়। অথচ একটু পড়াশোনা করলেই জানা যায়, সহিংসতার সাথে ধর্মের আদতে কোনো সম্পর্ক নেই। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সূরা আশশুরা, ৪২:৪২) ‘অবশ্যই অত্যাচারীদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে।’ (সূরা ইবরাহিম, ১৪ : ২২) ‘আল্লাহ অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না’। (সূরা আলে ইমরান, ০৩ : ১৪০) উপরের আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা মানুষের ওপর অত্যাচার করতে নিষেধ করেছেন। আবার, হিন্দুধর্মের গীতায় উল্লেখ আছে, ‘যে যথা মাং প্রপদ্যান্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম, মম বর্ত্মানুবর্তস্তে মনুষ্যা : পার্থ সর্বশঃ (গীতা, জ্ঞানযোগ, শ্লোক-১১, পৃষ্ঠা-১২৮) যে আমাকে যেভাবে উপাসনা করে, আমি তাকে সেভাবেই তুষ্ট করি। মনষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথেরই অনুসরণ করে। অর্থাৎ মানুষ যে পথই অনুসরণ করুক না কেন, সব পথেই আমাতে পৌঁছাতে পারে। এ শ্লোকে যে হিন্দুধর্মের সম্প্রীতি বার্তা রয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট। তবুও যারা নিজেদের ধার্মিক মনে করে, তারা তার প্রমাণ দিতে চায় অন্য ধর্মকে ছোট করে। এভাবেই তৈরি হয় ভেদাভেদ।

পৃথিবীতে মানুষের আগমনের সূচনাপর্বে কোনো ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্রভেদ ছিল না। ফলে তখন তাদের মধ্যে তখন সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষও ঘটেনি। পরবর্তীতে মানুষ যখন সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল, তখন থেকে আত্মস্বার্থের কারণে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, জাতি, বর্ণভেদ, গোড়া ইত্যাদির প্রকাশ ঘটে। জাতিবিদ্বেষের তীব্র বিষ ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে, দেশে দেশে। বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এই জাত্যভিমান ছিল সবচেয়ে বেশি। ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, উপমহাদেশে মুঘল আমলে দোল খেলাকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসকরা হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিবাদ বাধানোর চেষ্টা করেছিল। নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এবং হিন্দু-মুসলমান যাতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরবর্তীতে আন্দোলন করতে না পারে। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ এই কয়েক বছরে একশটিরও বেশি দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়েছে। পরবর্তীতে ভারতে ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও বাঙালি হিন্দু মুসলমানরা একত্র হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেছে। ১৯৭১ সালে এদেশের হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিস্টান, বাঙালি-অবাঙালি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ঘোষিত হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোক নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। এখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের স্ব স্ব ধর্ম, স্বাধীনভাবে পালন করে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে। সমান নাগরিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারে।

মুসলমানরা এখানে স্বাধীনভাবে ঈদসহ তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে। হিন্দুরা দুর্গাপূজাসহ বারো মাসে তের পার্বণ পালন করে, বৌদ্ধরা বৌদ্ধ পূর্ণিমা, খ্রিস্টানরা ইস্টার সানডে ও বড়দিনের উৎসব পালন করে। এসব উৎসব পালনে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করে না, বরং পরস্পর পরস্পরের আচার অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখেই এদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যে গভীর সংহতি ও ঐক্য তা জাতীয় ইতিহাসে গৌরবময় ঐতিহ্য হয়ে আছে। রাজনৈতিক কারণে মতবিরোধ থাকলেও জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। অথচ মাঝেমধ্যেই একদল বক ধার্মিক, ধর্মান্ধ এখানে সাম্প্রদায়িক নানা ইস্যু তৈরি করে, যার সুযোগ নেয় কাছাকাছি মতের অন্য আরও পক্ষ। অথচ ধর্মের প্রকৃত জ্ঞান যদি কারো থাকে, সে মুসলমান হোক আর হিন্দু হোক; সে কখনো অন্যকে মারতে যাবে না। অত্যাচার করতে যাবে না।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এইসব সাম্প্রদায়িকতা মানুষকে কিছুই দেয়নি, উল্টো অনেক ক্ষতি করেছে। সাম্প্রদায়িকতা মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় উন্নতির অন্তরায়। এই বিষ মানুষের সভ্য, সুস্থ ও শান্তিময় জীবনকে নষ্ট করে। হীন সাম্প্রদায়িকতার মূল নিহিত আছে বিভিন্ন ধর্মের গোঁড়ামি। প্রকৃত ধর্মকে জানলে, বুঝলে কেউ সাম্প্রদায়িক হবে না। কারণ কোনো ধর্মই ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে না। ধর্ম ব্যবসায়ীদের কারণেই দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে সীমাহীন ভেদবুদ্ধি, বিভেদ ও হিংসার অগ্নিদহন। জাতি বিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ থেকেও পৃথিবীর বহু জাতি, রাষ্ট্র যুদ্ধ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আমাদের বাংলাদেশকে আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে জানি। দেশের অনেক জায়গায় মন্দির মসজিদ পাশাপাশি আছে, যে যার ধর্ম পালন করে বন্ধুত্ব বজায় রেখে জীবন অতিবাহিত করছে। আর এই সম্প্রীতি একান্ত জরুরি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি না থাকলে সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। কাজেই জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অপরিহার্য। আমাদের প্রতিটি নাগরিকের প্রধান কর্তব্য হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনকে মজবুত করে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তোলা। তাতেই সবার কল্যাণ নিহিত।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত