সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

ম্যারাডোনা জীবদ্দশায় নিয়মের তোয়াক্কা করেননি

খেয়ালি ম্যারাডোনা জীবদ্দশায় পৃথিবীর কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। অন্যরাও তাকে নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধতে পারেনি। যে ৬০টি বছর দুনিয়ার বুকে ছিলেন, ম্যারাডোনা চলেছেন নিজের মতো। সেসবই করেছেন, যেটা করতে তার মন চেয়ে, ভালো লেগেছে। মানে ম্যারাডোনা ছিলেন নিজের মনের পুজারি। এই নিজের মনের পুজারি হতে গিয়েই ম্যারাডোনা ছিলেন খারিনকটা বেপারোয়া, তার চেয়েও বেশি করে খেয়ালি। খেয়ালির আগে ‘খাম’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে লতে পারেন খামখেয়ালিও!

বিশ্ব গণমাধ্যমে বহুল প্রচারিত, প্রকাশিত ম্যারাডোনার একটা ছবিই উপরের কথাগুলো প্রমাণ করতে যথেষ্ট। ম্যারাডোনার অনেক ছবিতেই নিয়ম ভাঙার বার্তা ফুটে উঠেছে। তবে তার মধ্যে একটা ছবি বিশেষ। ছবিটা সমুদ্র ভ্রমণের। উন্মত্ত সাগরের বুক চিরে ভেসে চলছে জাহাজ। জাহাজের খোলা অংশের রেলিং ঘেষে উদোম শরীরে আয়েশি ঢঙে বসা ম্যারাডোনা। ডান হাতের বাহুতে বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী চে গুয়েভারার উল্কি আঁকা। মুখে হাভানা চুরুট। সাগরের নীল জলরাশির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাথার উপরে বিশাল নীল আকাশ। মুখটা উপরের দিকে তুলে চোখ বন্ধ করে চুরুটে সুখ টান দিচ্ছেন ম্যারাডোনা। চুরুট টানার ভঙিতেই যেন স্পষ্ট, পৃথিবীর সব নিয়মকে যেন বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন তিনি!

নিয়ম ভঙ্গ করা খেয়ালি ম্যারাডোনার বার্তাটি যেমন স্পষ্ট, তেমনি ছবিতে অন্য একটি বার্তাও স্পষ্ট-ম্যারাডোনা বিপ্লবী। তিনি মার্কসবাদী বামপন্থী রাজনীতির পুজারি। ৬০ বছরের জীবনে ম্যারাডোনা কখনোই সরাসরি রাজনীতি করেননি বা জড়াননি। তবে বামপন্থী রাজনীতির চেতনা যে তার রক্তে. শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয়েছে, তা আরও অনেকভাবেই ফুটে উঠেছে।

আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত বিপ্লবী চে গুয়েভারার উল্কি তার বাহুতে আঁকা। এ রকম আরও একটি উল্কি নিজের বাঁ পায়ে এঁকেছিলেন ম্যারাডোনা। মাঠে ফুটবল পায়ে অনিন্দসুন্দর কারিকুরি দেখানোর জন্য তার পা জোড়া সম্পর্কে বলা হতো ঈশ্বরের অবিশ্বাস্য আর্শিবাদ। মাঠে দু পায়েই ভেল্কি দেখাতে পারতেন ম্যারাডোনা। তবে বাঁ পায়েই যেন জাদুর পরশ ছিল বেশি। নিজের সেই বাঁ পায়েই ফিদেল কাস্ত্রোর উল্কি এঁকে নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। উদোম শরীরে চে গুয়েভারার উল্কিটা যেমন দুনিয়াকে দেখিয়েছেন, তেমনি বাঁ পায়ে আঁকা ফিদেল কাস্ত্রোর উল্কির খবরও সবার জানা। ম্যারাডোনা স্বয়ং কাস্ত্রোকে তা দেখিয়েছেন, দেখিয়েছেন সারা দুনিয়াকে।

তো আধুনিক সভ্য দুনিয়ায় চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রোর চেয়ে বড় বিপ্লবী আর কে আছে! এমন মহান দুই বিপ্লবীর উঁল্কি যিনি নিজের শরীরে এঁকে তা সারা দুনিয়াকে দেখিয়ে বেড়াতে পারেন, তাকে বিপ্লবী না মেনে উপায় আছে। ম্যারাডোনার রক্তে, মননে বিপ্লবী চেতনাটা জন্মগতভাবেই। তার জন্ম আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের নিকটবর্তী ছোট্ট শহর ভিল্লা ফিওরিতোর বস্তি-এলাকার এক দরিদ্র পরিবারে। শিশুকাল, শৈশব, কৈশর কেটেছে চরম অভাব-অনটনে, খেয়ে না খেয়ে। ফলে দারিদ্রের কষাঘাতের কষ্টটা তার খুব ভালো করে জানা। সেই ছোট বেলা থেকেই দেখেছেন শাসককূল ও সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষদের ধারা অসহায় দরিদ্র মানুষদের পদেপদে শোষিত হওয়ার করুণ দৃশ্য।

এসব দেখে দেখেই শোষিত মানুষদের হয়ে পুঁজিবাদী শাসককূলের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেতনাটা জন্ম নেয় তার মননে। জন্ম নেয়ন বিপ্লবী মনোভাব। বড় হলে তাই বিপ্লবীদের সংস্পর্শই টেনেছে তাকে। তাই তো স্বদেশি বিপ্লবী চে গুয়েভারা তার আদর্শ। কিউবার অবিসংবাদিত মার্কসবাদী কমিউনিষ্ট নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে গড়ে উঠে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সন্তপ্রাণে সমর্থন জানান বিপ্লবী কাস্ত্রোকে।

লাতিন আমেরিকার আরেক বিপ্লবী হুগো চাভেজের রাজনৈতিক আদর্শকেও নিজের আদর্শ বলে গ্রহণ করেন ম্যারাডোনা। ভেনেজুয়েলার সাবেক এই প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও ম্যারাডোনার ছিল অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব। ম্যারাডোনা নিজে কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি, তিনি বামপন্থী। তবে এটা স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘আমি ফিদেলিস্তা, আমি চাভিস্তা।’ মানে ‘আমি ফিদেলের সমর্থক, চাভেজের সমর্থক।’

মতাদর্শের জায়গা থেকে কথাটা এক ভুবনের বিপ্লবীদের প্রতি আরেক ভুবনের বিপ্লবীর হৃদয় নিংড়ানো নৈবেদ্য। ম্যারাডোনার মৃত্যুর তারিখটি এই অর্ঘকে যেন আরও পূর্ণতা দিল। ম্যারাডোনার মৃত্যু ২৫ নভেম্বর। পিতৃসম বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুও ২৫ নভেম্বর। ২৫ নভেম্বর তারিখটি, ম্যারাডোনাকে মিলিয়ে দিয়েছে তার ফুটবল ভুবনের নায়কের সঙ্গেও।

ফুটবল দুনিয়ায় ম্যারাডোনার শৈশবের নায়ক ছিলেন দুজন। ব্রাজিলের সাবেক কিংবদন্তি রিভেলিনহো এবং জর্জ বেস্ট। এই দুজনের খেলঅ দেখেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন তিনি। তো এর শেষের জনের সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে-কখনো বিশ্বকাপ খেলতে না পারা ফুটবলারদের মধ্যে জর্জ বেস্টই সেরা। তো এই জর্জ বেস্টের মৃত্যুর ডেটলাইনও ২৫ নভেম্বর।

যাই হোক বিপ্লবী ম্যারাডোনা সব সময়ই শোষিতের হয়ে শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৪ সালে মার্কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছেন। ২০০৫ সালে ‘সুমিত অব দ্য আমেরিকাস’-এ অংশ নিতে আর্জেন্টিনায় যান যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। গায়ে ‘বুশকে আটকাও” লেখা টি-শার্ট পরে ম্যারাডোনা সশরীরেই বুশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। যুদ্ধ পিপাষু বুশকে ‘মানবতার জঞ্জাল’ বলেও আখ্যায়িত করেন ম্যারাডোনা। ২০০৭ সালে এ রকমই এক টি-শার্ট পরে ইরানের মানুষদের প্রতি নিজের সমর্থন জানান ম্যারাডোনা।

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ রাষ্ট্র গঠনেরও পক্ষে ছিলেন। ফিলিস্তিনের গাজায় নিরস্ত্র অসহায় মানুষদের উপর ইসরায়েলের বর্বোচিত হামলার প্রকাশ্য প্রতিবাদ করেন। স্পষ্ট করেই বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েল যা করছে, তা লজ্জাজনক।’

অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লবী ম্যারাডোনার বজ্রকণ্ঠে প্রতিবাদ গল্প এখানেই শেষ নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে পোপ দ্বিতীয় জন পলের সঙ্গে তর্ক করতেও পিছ পা হননি। সম্পর্কের বৈষম্য নিয়ে ধর্মীয় গুরু পোপ জন পলের সঙ্গে ম্যারাডোনা সরাসরি তর্কে লিপ্ত হন সেই ১৯৮৭ সালে। শোষিতের হয়ে প্রতিবাদ করার সেই সাহজটা তিনি দেখান আবার ইতালিরই ক্লাব নাপোলিতে খেলার সময়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন প্রতিবাদ আরও অনেকবারই করেছেন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ম্যারাডোনা। তবে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে আর কখনোই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেখা যাবে না। তার প্রতিবাদের কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। গত ২৫ নভেম্বর মৃত্যুর সুধা পান করিয়ে সৃষ্টিকর্তা মর্ত থেকে ম্যারাডোনাকে তুলে নিয়েছেন নিজের কাছে। তবে ম্যারাডোনা পরপারে চলে গেলেও তার কর্ম, প্রতিবাদের গল্প অন্যায় বিরোধী বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে চিরকাল!

ওপাড়ে ভালো থাকুন ম্যারাডোনা। দীর্ঘজীবী হোক বিপ্লব।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত