মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

ময়মনসিংহের যেখানে রাত কাটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে লর্ড কার্জন

শ্রেয়ণ

এক যে ছিল রাজা। রাজা না বলে মহারাজা বলেই ডাকা হত তাঁকে। মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া আরও কত কী ছিল তাঁর প্রাসাদে। দুর্গাপূজার বিসর্জনে হাতির মিছিল দেখে প্রজাদের তাক লেগে যেত। তিনি ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার।

লোকমুখে শোনা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে মহারাজা সূর্যকান্তের পূর্বপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী  ময়মনসিংহেরএই অঞ্চলের জমিদারি লাভ করলে মুক্তারাম কর্মকার নামের এক গরিব প্রজা তাঁকে একটা বড়ো পেতলের প্রদীপদানি (স্থানীয় ভাষায় – ‘গাছা’) দিয়ে অভিনন্দন জানান। এতে জমিদার শ্রীকৃষ্ণ আচার্য খুশি হয়ে নিজের জমিদারি অঞ্চলটির নাম রাখেন ‘মুক্তাগাছা’।

তারপর শুরু হয় মুক্তাগাছা জমিদারি শাসনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। মহারাজা সূর্যকান্তকে দত্তক নিয়েছিলেন এই পরিবারের মহারাজা শশীকান্ত এবং মহারানি লক্ষ্মীদেবী। এই সূর্যকান্তই ১৮৭৯ সালে তৈরি করিয়ে ফেললেন একটা লোহার বাড়ি, যেন বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর।

এই লোহার বাড়িটাই আলেকজান্ডার ক্যাসল। ব্রহ্মপুত্র নদীর কাছে ময়মনসিংহ শহরের সবথেকে জমজমাট কোর্ট-কাছারি এলাকায় এর অবস্থান। ১৮৭৯ সালে বাংলো আকারের এই বাড়িটা তৈরি করতে ব্যয় হয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। বাড়ির নামটি রাখা হয়েছিল ময়মনসিংহের প্রথম জেলাশাসক এন এস আলেকজান্ডারের সম্মানে।

আরেকটা মতও প্রচলিত আছে যে মহারাজা সূর্যকান্ত জুবিলি উৎসব পালনের জন্য তখনকার ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রা-র নামে এই বাড়িটা তৈরি করেন। এই বাড়িটা তাই ‘আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল’ নামেও পরিচিত। ২৭.১৫৫ একর জমির ওপর প্রাসাদোপম এই বাড়ির কাঠামোয় লোহার ব্যবহার এত বেশি হয়েছিল যে স্থানীয় মানুষের কাছে বাড়িটার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘লোহার কুঠি’।

বাড়িটার চত্বরে আছে মন শান্ত করা দীঘি আর বাগান। সামনের ফটকের দু’পাশে লাগানো আছে দু’টো গ্রিক মূর্তি, যদিও এখন মূর্তিগুলো গিয়েছে ভেঙে। গোটা বাড়িটাই একটা বিশাল স্তম্ভমূলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত ব্রহ্মপুত্র নদীর বন্যার হাত থেকে বাড়িটাকে রক্ষা করার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বাড়ির ঢালু ছাদ পুরোটাই ঢেউ খেলানো লোহায় তৈরি। দোতলার সিলিং-এ অভ্র আর চুমকি ব্যবহার করা হয়েছিল বাড়িটাকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করার জন্য।

তখনকার দিনের জমকালো আর অভিজাত আসবাব দিয়ে সাজানো হয়েছিল এই বাড়িকে। দু’খানা খুব সুন্দর রুপোর মূর্তি এখনও দর্শকদের মুগ্ধ করে। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে মহারাজা সূর্যকান্ত এখানকার বাগানে বাঘ পুষতেন, যে কারণে গোটা বাগান ঢাকা থাকত ইস্পাতের খাঁচায়।

এই বাগানবাড়ি মহারাজের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। অনেক বরেণ্য মানুষই এই ক্যাসেলে রাত কাটিয়েছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা করমচাঁদ গান্ধি। ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রেলপথে দুপুর নাগাদ ময়মনসিংহ পৌঁছান। তারপর চার দিন তিন আলেকজান্ডার ক্যাসেলের অতিথি ছিলেন। এই ১৯২৬ সালেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি এখানে থেকে যান।

এছাড়া ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ-র মতো তাবড় মানুষরাও এখানে পা রেখেছেন। ১৯৪৮ সালে এই ভবন ঘিরে তৈরি হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। প্রথমে আলেকজান্ডার ক্যাসেলকে ট্রেনিং কলেজের ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হত। পরে কলেজের ভবন আরও বাড়লে ক্যাসেলের দোতলায় শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তারপর অনেকদিন ধরেই আলেকজান্ডার ক্যাসেল ব্যবহৃত হচ্ছে কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে। এখন ক্যাসলের একতলায় আটটি ঘরে প্রায় ১৫ হাজার বই রাখা আছে।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত