শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯

রবীন্দ্রনাথের ভেস্তে যাওয়া সম্বন্ধ

অনিতেশ চক্রবর্তী

“জানো, একবার একটা বিদেশী অর্থাৎ অন্য Province-এর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল। সে একটা পয়সাওলা লোকের মেয়ে, জমিদার আর কি বড়গোছের।”

রবীন্দ্রনাথ তখন মংপুতে। একদিন তাঁর বিয়ের গল্প শুনতে চাইলেন মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁর বিয়ের কোনো গল্প নেই বলেও একটা গল্প বলেছিলেন বটে রবীন্দ্রনাথ। না হওয়া বিয়ের গল্প। সাতলক্ষ টাকার উত্তরাধিকারিণী একটি মদ্রজা কন্যাকে দেখতে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ও আরো কয়েকজন। এমন সময়ে ঘরে এসে বসলেন দুজন অল্পবয়সী মেয়ে। বাকি গল্প রবীন্দ্রনাথের বয়ানেই শোনা ভালো–

“একটি নেহাৎ সাদাসিদে, জড়ভরতের মত এক কোণে বসে রইল; আর একটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে। চমৎকার স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই, বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজায় ভালো—তারপর music সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হল। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়।– এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে, কিন্তু শৌখীন লোক। ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, ‘Here is my wife’ এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে ‘Here is my daughter’… আমরা আর করব কি, পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করে রইলুম; আরে তাই যদি হবে ভদ্রলোকদের ডেকে এনে নাকাল করা কেন?”

অননুকরণীয় রসবোধে এই গপ্প বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এখন, এর ভিতরে ‘বডি শেমিং’-এর উপাদান খুঁজতে গেলে সেই রস চোদ্দ আনাই মাটি হয়ে যাবে। সেদিনের ভগ্নহৃদয় যুবা রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবুন তো একবার! যাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবছিলেন ‘এখন পেলে হয়’, জানতে পারলেন সেই মহিলা কিনা তাঁর হবু শাশুড়ি। ধাক্কা লাগাই স্বাভাবিক। এত্তগুলো বছর পরে অবশ্য সেদিনের সেই ‘নাকাল’ হওয়ার স্মৃতিও জড়িয়ে গেছে মজায়। রবীন্দ্রনাথও তাই এখানে না থেমে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলতেই থাকেন, “এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়। যা হোক, হলে এমনই কি মন্দ হত! মেয়ে যেমনই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্যে তো এ হাঙ্গামা করতে হতো না। তবে শুনেছি সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত।”

গপ্পের ভিতরেই কত কিছু লুকোনো থাকে। বয়স্ক কর্তার স্ত্রী আর মেয়ের বয়স প্রায় এক। এই তথ্যটিকে ভাঙলে বুদ্ধিমান পাঠকমাত্রেই বুঝে যাবেন যা বোঝার। তাছাড়া, বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ জোগাড়ের ‘হাঙ্গামা’র কথাটিও এই গল্পে প্রচ্ছন্ন। আরেকটি তথ্যও অবশ্য রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সেই ‘না হওয়া পাত্রীর’ দু’বছরের মধ্যেই বিধবা হওয়ার খবর। কবিকে রূপে ভোলাতে না পারলেও অন্যত্র বিয়ে তো তাঁর হয়েই ছিল। এবং, বিয়ের পর তাঁর বৈধব্যের খবরও এসে পৌঁছেছিল রবীন্দ্রনাথের কানে। এসে পৌঁছেছিল নাকি তিনি নিজেই খোঁজ নিয়েছিলেন—তা আর জানা সম্ভব না। কিন্তু এই ঘটনাটিকে, এমনকি পাত্রীটিকেও যে কারণেই হোক স্মৃতি থেকে একেবারে মুছে ফেলতে পারেননি তিনি। পারলে এই গল্প হত না। “একটি নেহাৎ সাদাসিদে, জড়ভরতের মত এক কোণে বসে” থাকা মেয়ের ভবিতব্য নিয়েও তাঁর সামান্য কৌতূহলও যে কেন বেঁচে ছিল, তাও আমরা জানি না। কিন্তু, কৌতূহলই সার। সেদিনের অপছন্দ হওয়া পাত্রীটির দুর্ভাগ্য নিয়ে খুব ব্যথিত ছিলেন কি তিনি আদৌ? গল্প থেকে তো তেমন আভাস মেলে না। কিংবা, হয়তো এই রসিকতা প্রতারক। মজা আর কখনই বা সবটা সত্যি বলে!

তবে, ধনী পরিবারের সন্তান সেই জনৈকা মদ্রজা রমণীটির ভাগ্য সত্যিই মন্দ। কারণ তাঁকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথই শুধু একা রসিকতা করেননি, করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরও। নাম না করে অবশ্য। সে এই গল্পটি বলার অনেক আগের কথা। ১২৯০ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ‘ভারতী’তে একটা কাহিনি-কাব্য লিখলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। নাম ‘যৌতুক কি কৌতুক’। একেবারেই কৌতুক করে লেখা এই কাব্যের কাহিনির মূলে রবীন্দ্রনাথ আর সেই মদ্রজা রমণীর বিয়ের সম্বন্ধের গল্পটাই। যদিও, দ্বিজেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে হয়তো সম্যক পরিচিত ছিলেন না। কিংবা, হয়তো জেনেও লিখতে চাননি। উদ্দেশ্য, প্রিয় ছোটো ভাইকে নিয়ে রসিকতা করা। তাতে, অত ডিটেলিং না থাকলেও চলে। তাছাড়া, সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি তো কল্পনা।

অতএব, বাস্তবনির্ভর কাল্পনিক কাব্যই লিখলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। কিন্তু, এমন কাব্য লিখলেন কেন? উত্তরটা সহজ, ধনী পরিবারের মেয়ের সঙ্গে ছোটোভাইয়ের বিয়ের সম্বন্ধ তাঁর ভালো লাগেনি। ফলে, বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় তাঁর আনন্দও হল খুব। সেই আনন্দই এই কৌতুক কাব্যের রূপ নিল। কাব্যে ছিল এক রাজপুত্তুর আর এক রাজকন্যে। রাজপুত্রের জীবনে একদিকে খাঁটি প্রেম অন্যদিকে রাজত্বের লোভ। যাঁরা ঘটনাটি জানতেন, তাঁরা এই কাব্য পড়ে হাসি সামলাতে পারেননি। আর, কাব্যের শেষে উৎসর্গেও কুড়ি বছরের ছোটো ভাইয়ের প্রতি আশীর্বাদ বর্ষণের মধ্যেও স্বভাবসুলভ রসিকতাটি বুনে দিয়েছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ—

“শর্বরী গিয়েছে চলি! দ্বিজ-রাজ শূন্যে একা পড়ি
প্রতীক্ষিছে রবির পূর্ণ উদয়।
গন্ধহীন দু-চারি রজনীগন্ধা হয়ে তড়িঘড়ি
মালা এক গাঁথিয়া সে অসময়
সঁপিছে রবির শিরে এই আজ আশিসিয়া তারে
‘অনিন্দিতা স্বর্ণমৃণালিনী হোক্‌
সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার’! মদ্রজার করে
যে পড়ে পড়ুক খাইয়া চোখ।”

বেচারা মদ্রজা রমণী। কী কুক্ষণেই যে তাঁর সঙ্গে সম্বন্ধ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের! এই গোটা ঘটনায় তাঁর কী দোষ, তাও জানা নেই। জানার মধ্যে রয়েছে তাঁকে ঘিরে বিতৃষ্ণা-জনিত উপহাস, রসিকতা। আর হ্যাঁ, বিয়ের দু’বছরের মধ্যেই তাঁর বিধবা হওয়ার খবরও। যে তথ্যটির সঙ্গেও জড়িয়ে রসিকতা। সে যাহোক, বিয়ে না হলেও এতটা গল্পের মূলে থেকে গেলেন সেই মদ্রজা রমণী। আর, রবীন্দ্রনাথের বিয়ে করা ‘ভাই ছোটবউ’। তাঁকে নিয়ে গল্প নেই বলেছিলেন কেন রবীন্দ্রনাথ? নাকি, এইসব গল্পের সঙ্গে তাদের একাসনে বসাতে চাননি। সেই প্রশ্নের উত্তর নাহয় খোঁজা যাবে অন্য একদিন।

তথ্যসূত্রঃ মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, মৈত্রেয়ী দেবী; গত শতকের প্রেম, পূর্ণেন্দু পত্রী


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত