সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১

লম্বা ছুরির রজনীর অজানা রহস্য

হাসান হামিদ

লম্বা ছুরির রজনী (Night of the Long Knives) জার্মানির ইতিহাসে ‘অপারেশন হামিংবার্ড’ নামে পরিচিত, যা ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন রাতে হয়েছিল। কী হয়েছিল সেই রাতে? কেনইবা এই রাতের এমন নামকরণ করা হয়েছে? মূল বিষয়ে যাবার আগে একটু পেছনে তাকাতে হবে।

১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার একটি গ্রামে জন্মেছিল এক শিশু। বালক বয়সেই তার বাবা মারা যান। মা ছিলেন কৃষক। তাই খুব দরিদ্র পরিবেশে বেড়ে ওঠতে থাকেন তিনি। এই শিশুটিই পরবর্তী বিশ্ব কাঁপানো অনেক ঘটনার জন্মদাতা এডলফ হিটলার।

হিটলারের স্বপ্ন ছিল চিত্র শিল্পী হবেন। স্কুল জীবন সমাপ্ত করে রাজধানী ভিয়েনায় যান তিনি। কিন্তু ছবি আঁকা শেখার জন্য ফাইন আর্ট একাডেমিতে ভর্তির সুযোগ পাননি কিশোর হিটলার। মনে কষ্ট পেলেন। এরপর সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে  অংশ নেন। যুদ্ধ শেষ হয়। এবার জার্মানিতে তিনি একটি প্রেসে কাজ নেন। কিন্তু এ কাজে মন বসে না তার। ভালোও লাগে না। তাই রাজনীতি করার মনস্থির করেন।

১৯১৯ সালে ৩০ বছর বয়সে জার্মান শ্রমিক দলে যোগ দেন তিনি। কথা বলায় পারদর্শী হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত মেধাবী হবার কারণে অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে যান দলে। হিটলার যোগ দেবার আগে জার্মান শ্রমিক দলের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না। তিনি যুক্ত হবার পর দলের কর্মসূচি নির্দিষ্ট করে দেন।

হিটলার দলের নাম পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন নাম হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মান শ্রমিক দল। সংক্ষেপে নাৎসি পার্টি। এরপর তিনি দলের নতুন  কর্মসূচি দেন। সেই কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ জার্মান রাষ্ট্র গঠনের পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থান, মুনাফাখোরদের উচ্ছেদ, ভূমি সংস্কার এসব বিষয় স্থান পায়।

হিটলারের প্রচারসেল ছিল খুব শক্তিশালী। তাই কিছুদিনের মধ্যে দলে দলে লোকজন সমবেত হতে থাকে।

এবার হিটলার একটি পত্রিকা বের করেন। পত্রিকার নাম ছিল ‘পিপলস অবজারভার’। সেই পত্রিকায় নাতসিদের কর্মসূচি নিয়ে লেখা প্রকাশ হতে থাকে। দলে জনগণ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।

১৯২৩ সালে শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করতে গিয়ে হিটলার ব্যর্থ হন। বিচারে ৫ বছরের জেল হয় তার। জেলখানায় বসে লিখেন একটি বই। বইটির নাম Mein Kampf বা আমার জীবনী। জীবনী গ্রন্থ বলা হলেও এটি ছিল আসলে নাৎসিদের কাছে বাইবেল স্বরূপ। এই বইয়ে নাৎসিদের আদর্শ, এ আদর্শ বাস্তবায়নের উপায় এসব বিষয়ে হিটলার বিশদ ব্যাখ্যা করেন।

এরপর নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে নাৎসি দল সরকার গঠন করে। নাৎসি দল ক্ষমতায় আসার পর এডলফ হিটলার জার্মানির সর্বত্র একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি নিজেকে জার্মানির প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলর হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক কারণে অযৌক্তিক ভাবে অনেক মৃত্যু দণ্ড কার্যকর করেছিলেন।

লম্বা ছুরির রজনী বলতে যে রাতকে বুঝানো হয়েছে, সেই রাতে মূলত কয়েক শ নাৎসি নেতাকে হিটলারের আদেশে হত্যা করা হয়েছিল।

যখন জার্মানিতে আধা সামরিক বাহিনী এসএ (SA) ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন হিটলার ভয় পেয়ে যান। তিনি তার অভিজাত রক্ষীদের আদেশ দেন একসময়ের  তার অনুগত সেনা কর্মকর্তা আর্নেস্ট রোহেমসহ সংগঠনের কয়েক শ নেতাকে হত্যা করার।

১৯৩৪ সালের ৩০ জুন রাতে হিটলারের বিপক্ষের অনেক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ওয়েমার প্রজাতন্ত্রের সর্বশেষ চ্যান্সেলর কার্ট ভন স্লেইচ, গ্রেগর স্ট্র্যাসার (একসময়ে যিনি হিটলারের ডান হাত ছিলেন), বিচ্ছিন্নতাবাদী গুস্তাভ ভন কাহর, রক্ষণশীল সমালোচক এডগার জং এবং ক্যাথলিক অধ্যাপক এরিক ক্লাউসনার।

এই বিষাক্ত রাতে এমন অনেককেই হত্যা করা হয়, যারা মানুষের প্রতি অনুগত ছিলেন; এমনকি হিটলারকে ক্ষমতায় রাখতে যারা সাহায্য করেছিলেন। প্রশ্ন জাগে তাহলে কেন তাদের হত্যা করা হয়েছিল?

উত্তর অনেকটা এমন যে, হিটলারের ভয় ও ঈর্ষার কারণে। রোহেম হিটলারের খুব কাছের একজন ছিলেন। নাৎসি নেতা হেনরিক হিমলার এবং হারম্যান গোয়ারিং আর্নেস্ট রোহেম এবং তার ক্ষমতার প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিলেন। রোহেম এস এ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। জার্মান সরকারের ভয় ছিল, কেননা রোহেম এবং অন্যান্য নেতারা নাৎসিদের প্রচারিত জাতীয় সমাজতন্ত্র খুব দ্রুত ও গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিল। এটি জার্মানির শিল্প নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের জন্য জার্মানিকে প্রস্তুত করতে হিটলারের কর্মীদের অধিকার দমন করার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করবে।

সেই ভয়াল রাতে কী ঘটেছিল তা হিটলার পরে শুধু কয়েক লাইনে ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণা অনুষ্ঠানে নাৎসি গানে ‘লং নাইফ ড্রামা’ বলে উল্লেখ করা হয়। হিটলার দাবি করেন, সেই রাতে ১৩ জঙ্কে গ্রেফতার এবং ৬১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। তবে কেউ কেউ বলেছেন, সেই রাতে অন্তত ৪০০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

এই ঘটনার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন হিটলার। ১৯৩৪ সালের ৩৪ জুলাই নাৎসি ছাড়া অন্য সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন তিনি। একটি মাত্র ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়া অন্য সকল ট্রেড ইউনিয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আইন সভার অনুমোদন ছাড়াই আইন প্রণয়ন এবং শাসনকার্য পরিচালনা করা শুরু হয়।  প্রাদেশিক পরিষদ বিলুপ্ত করে এক কেন্দ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দেশের সংবাদপত্র, বেতার, শিক্ষাসহ সকল প্রতিষ্ঠানের অধিকার এবং স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়। যে কোনো সময় দেশের যে কোনো নাগরিককে গ্রেফতার ও বিনা বিচারে আটকে রাখা খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বন্দী শিবির খোলা হয়। এককথায় হিটলার বিরোধী কোনো মানুষের পক্ষে জার্মানিতে বসবাস করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

জার্মানির অনেক বিজ্ঞানী, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতকর্মী সেই সময়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আইনস্টাইন, হেনরিখ, টমাস মান্নি, নগার, ওয়েনবার্টসহ অনেকেই নিজের দেশ ছেড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। নাৎসি বাহিনী শুধু শক্তি ও বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় ছিল তা নয়; নাৎসিবাদ জার্মানিতে এক সর্বগ্রাসী সামাজিক বিশ্বাসে পরিণত হয়। জার্মানির প্রায় সব পত্র-পত্রিকা, প্রচারপত্র, শিক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি নাৎসি ভাবধারা মানুষের মনে জাগ্রত করতে সহায়তা করে।

জার্মান যুব সমাজের মাথায় এমনভাবে আর্য বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে, তারা ভাবতে শুরু করে, তারাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তারাই কেবল শ্রেষ্ঠ রক্ত, তারাই বিশুদ্ধ। হিটলার আজীবন দাম্ভিক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের অনেক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এ যুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ ছিল পিছু না হটার নীতি। হিটলারের এই দম্ভ তাঁকে এক সময় ৪৮,০০,০০০ বর্গ মাইলের মালিক থেকে মাত্র ৫০ বর্গ মাইলের মালিক বানাতে খুব বেশি সময় নেয়নি। তবুও তিনি কখনো মাথা নত্য করতে চাননি।

আমরা জানি, হিটলার মুসোলিনীর অনুসারী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন জানলেন যে, মুসোলিনী পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছে এবং খুন হয়েছে; এমনকি মুসোলিনীর মৃতদেহ নিয়ে মিলানের রাস্তায় এক উৎসব হচ্ছে, তখন হিটলার নিজেকে এমন পরিণতিতে ফেলতে চাইলেন না। তারপর তিনি আত্নহত্যা করলেন।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত