বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১

শহীদ রাজুর ভাই বলছি || মুনীম হোসেন

১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ। প্রায় ২৭ বছর আগের দিনটি আজও শোকাহত করে তোলে। মঈন হোসেন রাজু, শহীদ রাজু, ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জীবন দিয়ে। আমার সেই ছোট ভাই রাজুর সঙ্গে স্মৃতিগুলো আজও ডানা ঝাপটায়। ভাই হারানোর ব্যথা এখনো এতটুকু কমেনি; বরং সেই ব্যথা যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। তাই হয়তো দিনকে দিন রাজুর শূন্যতা আরও বেশি অনুভব করি।

১৩ মার্চের সেদিনটি ছিল শুক্রবার। তখন পবিত্র রমজান মাস। আব্বা আমেরিকা থেকে দেশে এসেছেন। পরিবারের সবাই মিলে ইফতার করার রেওয়াজ ছিল। রাজু ছাড়া আমরা সবাই ইফতার করছি। এমন সময় বাসায় ফোনটা এল। খাবার টেবিল থেকে উঠে গিয়ে আমি ফোনটা ধরলাম। অপর প্রান্তে আতঙ্কের সুর। বলল, ‘রানা ভাই, হাসপাতালে আসেন।’ এইটুকু বলেই ফোনটা রেখে দিল। তখন তো মোবাইল ছিল না। ফিরতি কল করব, সেটাও সম্ভব হলো না। কিন্তু আমরা নিশ্চিত বুঝে ফেললাম, রাজুর কিছু একটা হয়েছে।

বাসা থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম। বেবিট্যাক্সিতে ওঠার সময় আমার এক বন্ধুকে বললাম মা-বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে। শ্যামলী থেকে খুব বেশি সময় লাগেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখি অনেক ছেলেপুলে, যাদের অনেককেই আমি চিনতাম রাজুর বন্ধু হিসেবে। তখনো জানতাম না রাজু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাই ওদের কাছে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে?’

রাজুর খাতার একটি পাতা

কেউ কিছু বলল না। সবাই শুধু সান্ত্বনা বাক্য বলছে, ‘চিন্তা করবেন না, রক্তের ব্যবস্থা করছি।’ সেখানকার এক ডাক্তার ছিলেন আমার বন্ধু। তাঁকে বললাম, আমাদের দুজনের রক্তের গ্রুপ এক, আমার রক্ত নিন।

আমার খালু ছিলেন সেখানে। একটু পর তিনি এসে অস্ফুটে বললেন, ‘সম্ভবত ও আর নেই।’ তাঁর কথা শুনে সমস্ত পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়াল।

রাত নয়টা কি দশটা বেজে গেল। তখন রাজুর মৃত্যুর খবর জানাজানি হয়ে গেছে। এক কোনায় বাবা শোকে পাথর হয়ে আছেন। এর মধ্যে পুলিশ আমার বাবাকে ডাকলেন, মৃতদেহ নেওয়ার ব্যাপারে তাঁকে সাতপাঁচ বোঝালেন। এরপর নিয়ম মেনে রাজুকে নিয়ে যাওয়া হলো।

দাফনের পরে জেনেছি সেদিনের ঘটনাগুলো। রাজুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা। অথচ সেদিন সকাল ১০টার দিকে আমি অফিসের গাড়িতে করে রাজুকে নামিয়ে দিয়েছি। সঙ্গে ছিল আমাদের ছোট বোন রুমা। সেদিন ওর কাঁধে একটি ব্যাগ ছিল। রাজুকে নামিয়ে দেওয়ার পর আমার শরীরে কেমন যেন অস্থিরতা ভর করেছিল। আমি বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। কিন্তু সেদিনের সেই অস্থিরতার বিষয়টা আজও আমাকে ভাবায়, আমি রাজুকে হারানোর পূর্বাভাস ছাড়া আর কোনো কারণ খুঁজে পাই না।

পাখি ও পাতার কষ্টেও ব্যথিত হতো রাজু

১৯৭২ সাল। আমরা তখন ঢাকার আগারগাঁওয়ে থাকতাম। বর্তমান নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনের দিকটায় ছিল বাসা। সেই ঢাকা মানে এই ঢাকা নয়। তখন ঢাকা ছিল অসাধারণ শহর। পুরোনো বিমানবন্দরের খালি জায়গায় আমরা গিয়ে খেলতাম। বিজয় সরণির জায়গাটা বোমার আঘাতে পুকুরের মতো হয়েছিল। সেই পানিতে থাকা মাছ ধরতাম আমরা।

কথাগুলো বলার কারণ, প্রকৃতি আর পরিবেশ বোঝানোর জন্য। একজন মানুষের বেড়ে ওঠায় পরিবেশের তো ভূমিকা থাকে। রাজু তখন ছোট। কোনো পাখি ডানা ঝাপটে পড়ে গেছে রাজু গিয়ে শুশ্রূষা করত। সুস্থ করে ছেড়ে দিত। একটা পাখির কষ্ট, একটা পাতার কষ্ট ছুঁয়ে যাওয়া রাজুর মনটা গড়ে উঠেছিল সে পরিবেশে। তখন অতিথি পাখি বিক্রি হতো। এটি বন্ধের জন্য রাজুর ছিল নানা উদ্যোগ। কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছিল সে।

ছোটবেলার একটা সময় পর্যন্ত রাজু ছিল চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। সেভেনে ওঠার পর ওর মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক সচেতনতা, নিজের আদর্শগত জায়গা, নেতৃত্ব গুণ লক্ষ করতাম।

আমি তখন দেশ পত্রিকা রাখতাম। বইয়ের বেশ একটা সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলাম। রাজু ছিল এই লাইব্রেরির নীরব পাঠক। এ ছাড়া আমাদের পাড়ার জালাল ভাইয়ের ছিল ইংরেজি-বাংলা বইয়ের বিশাল সংগ্রহ। আমরা রীতিমতো তাঁর সংগ্রহের বই গিলতাম!

রাজুর সঙ্গে আমার বয়সের ফারাক ছয় বছরের। অন্য ভাইবোনদের মতো ওর সঙ্গে বোঝাপড়া ছিল, তবে আমাদের মধ্যে একটা শ্রদ্ধার দূরত্ব ছিল। পাড়ায় ওর বন্ধুদের দলটাও ছিল আলাদা। খেলাধুলা করত। নিজে সংগঠিত করত অন্যদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি যে বছর পাস করে বেরোলাম, রাজু সে বছর ভর্তি হলো। শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র ছিল রাজু। মহল্লায় ছাত্র ইউনিয়ন করত জানতাম। কিন্তু দিনে দিনে রাজনৈতিক যুক্ততা এতটা বেড়েছে তা জানলাম একদিন ক্যাম্পাসে গিয়ে। এক বন্ধু এসে বলছিল, ‘তোর ভাই শহীদুল্লাহ হলে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে দাঁড়িয়েছে।’

সে সময় ওর কাছে প্রচুর বইপত্র আসত। বিদেশি বইও থাকত তার মধ্যে। লক্ষ করতাম, বাসায় ফোন এলে অনেক সময় গোপনীয়তা রাখার চেষ্টা করত। বুঝতাম রাজনৈতিক কোনো ফোন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় দেখেছি, রাজু খুবই একাগ্রভাবে যুক্ত। একদিন বাসায় তাকে সে আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়াতে বারণ করা হলো। কিন্তু রাজু সে বারণ মানেনি। ওর কিছু ছবি আছে সে সময়ের, এগুলো দেখলে বোঝা যায়, গণতান্ত্রিক সেই আন্দোলনে কতটা সক্রিয় ভূমিকা ছিল রাজুর।

এখন ভাবি, একদিন পাতা-পাখির কষ্ট যাকে ব্যথিত করত, সে যে মানুষের-দেশমাতৃকার জন্য ব্যথিত হবে, সেটাই ছিল স্বাভাবিক। যেমনভাবে তাকে ব্যথিত করেছিল সন্ত্রাসবাদ, ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীলতা। যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে দিতে হয়ে প্রাণ।

 তারপর হলো ইতিহাস

কখনো ‘হবো’, কখনোবা ‘হব’। এই বানানেই পাতায় পাতায় লেখা, ‘তারপর হব/হবো ইতিহাস’। মিছিলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় রাজুর কাঁধে যে ব্যাগ ছিল সেটিতেই ছিল নোটবুক। যাতে এসব লেখা। রাজুর খাতা, নোটবুকের পাতাগুলো যখন উল্টাই, তখন বিশ্বাসটা ভীষণ জোরালো হয়—সে কি জানত তার পরিণতির কথা? না জানলে, পাতায় পাতায় এ কিসের আভাস?

শুধু সে শব্দটিই নয়, আরও বেশ কিছু শব্দ ও বাক্যের পুনরাবৃত্তি রয়েছে ওর লেখায়। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেছে আমার আঁকা একটি বাড়ির ছবির ওপর, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে…’। আবার লিখেছে, ‘শুকতারা নিভে গেলে কাঁদে কি আকাশ’।

ওর ব্যবহৃত জিনিসপত্র এখন আমার কাছে গচ্ছিত। স্মারকগুলোর ডিজিটালাইজেশন করেছি। এসব স্মারক থেকেই আবার গণতন্ত্র, মৌলবাদবিরোধী, যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি রাজুর অবস্থান বোঝা যায়। সে কখনো লিখেছে, ‘উৎখাত চাই হন্তারকের, বিনাশ চাই মৌলবাদের’, ‘সুনীল পৃথিবীতে বন্ধ হোক সকল যুদ্ধের প্রয়োজন’, কবি আবুল হাসান থেকে ধার করে লিখেছে, ‘হে শোক, আমি অশোক হবো’—এমন আরও কত–কী!

 রাজু হয়ে কেউ এল না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের রাজুর যে অবয়ব ফুটে তোলা হয়েছে, সেটা আমাকে সামনে রেখে তৈরি করেছেন ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী। রাজুর সঙ্গে আমার চেহারার অনেক মিল। আমৃত্যু প্রতিবাদী সেই রাজুর মধ্যে নিজেকে দেখে গর্বিত হই।

কিন্তু রাজুর আত্মত্যাগ যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, তা যেন আরও প্রকট হয়েছে। এখানে বলতেই হয়, সন্ত্রাস মানে শুধু অস্ত্র–সন্ত্রাস নয়, এর মধ্যে রয়েছে আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিও। আমাদের দেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে, এগোচ্ছে। কিন্তু ওর যে স্বপ্ন ছিল, তার ধারেকাছেও আমরা যেতে পারিনি। ২৭ বছর তো হয়ে গেল। এই সময়ের মধ্যে আরও অনেক রাজু তৈরি হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। এসব ভাবলে কিছুটা হতাশ হই। একরাশ হতাশা নিয়েই ভাইয়ের আত্মত্যাগ স্মরণ করি।

(লেখা ও ছবিসূত্র- প্রথম আলো)


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত