রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০

শিক্ষার্থীদের প্রতি একজন শিক্ষকের খোলাচিঠি

প্রিয় শিক্ষার্থী,

আসসালামু আলাইকুম। আমার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিও। করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব আজ থেমে গেছে। তোমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসও নির্বাক।যতবার জুবিলীর সামনে দিয়ে যাই, মনে হয় পুত্রশোকে কাতর, পিতৃত্বের ছাপ নিয়ে দাড়িয়ে থাকা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। সবুজ ঘাসের বুকে তোমাদের পদচারণা নেই, নেই কোলাহল। ভোরের পাখির মতো তোমাদের কন্ঠে আজকাল ভেসে আসে না,

“আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালবাসি”
দলনেতার কমান্ডে কুঁচ-কাওয়াজে মুখরিত নয় আজ।ছুটির ঘন্টার শব্দে তোমাদের দুরন্তপনার দৃশ্যটা এখন দেখি না। টিফিন ঘন্টায় ছুটির আবেদন নিয়ে তোমাদের আসতে দেখি না কতদিন। প্রবাল চিমটি কেটেছে স্যার, তন্ময় ভেংচি কেটেছে স্যার, ওসব অভিযোগ আসে না। রোল কলের চিরায়ত শব্দ “ইয়েস স্যার” “প্রেজেন্ট স্যার” শব্দগুলো শুনি না।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

আজ ৪৩ দিন পেরিয়ে গেলো। আর কতদিন যাবে তাও জানিনা। উদ্বেগ, উৎকন্ঠা নিয়ে তুমি, আমি, সবাই খাঁচায় বন্দী। একসময় চিড়িয়াখানা দেখে মজা নিয়েছি। পশুর রাজা সিংহের সাথে খুঁনসুটি করেছি।সাপের খাঁচায় গিয়ে বীরত্ব দেখিয়েছি। বাঘের খাঁচায় গিয়ে শিস দিয়েছি।
কী দারুণ প্রতিচ্ছবি!
কী দারুণ প্রতিশোধ!
দেখেছো ওরা সব এখন স্বাধীন। আমি, তুমি, আমরা এক বন্দীদশায় জিম্মি। ক্ষুদ্র একটা জীবাণুর কাছে পুরো পৃথিবী অসহায়।

প্রিয় শিক্ষার্থী,
হয়তো পুরনো ছন্দে ফিরে আসবে এ পৃথিবী। তোমাদের পদচারণায় মুখরিত হবে প্রিয় ক্যাম্পাস। নতুন করে টীকা, প্যারাগ্রাফ, রচনা লিখার বিষয় হবে আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন, কোভিড-19, লক-ডাউন ইত্যাদি।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

আজ থেকে অনেক দিন পর আজকের এইদিনগুলো হবে ইতিহাস। তোমরা ইতিহাসের স্বাক্ষী। Aim in life রচনা লিখতে বললেই তোমরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইতে। কিছু ছেলে ছিলে যারা এডভেঞ্চার পছন্দ করো তারা অনায়াসে লিখতে আর্মি অফিসার, পুলিশ অফিসার, গোয়েন্দা অফিসার এসব। আজকের পর হয়তো ওসব বেয়ারা ছেলেগুলোই হতে চাইবে ডাক্তার, পুলিশ অফিসার। কারণ করোনা যুদ্ধ দেখিয়ে দিল ডাক্তারি পেশার চেয়ে এডভেঞ্চার আর কী হতে পারে?
এ যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেয়ে গবেষক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। অনুজীব নিয়ে পড়াশোনা হবে পরবর্তী বিশ্বের আইকন। গুলাগুলি আর কামানের দিন ফুরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়ে গেলো Covid-19. পরবর্তী বিশ্ব শাসনের হাতিয়ার হয়তো জীবাণু অস্ত্র।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

বন্দী দশার এই মূহুর্ত উপভোগ করো তোমার পরিবারের ভাই-বোন, মা, বাবা নিয়ে। বেঁচে থাকার জন্য পরিবারের গুরুত্ব বুঝে নাও। পরবর্তী পৃথিবীকে তোমাদের হাতের মুঠোয় নিতে পিছুপা হলে চলবে না। তাই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। উদ্বিগ্ন নয়, সাহস রাখো বুকে। নিশ্চয়ই কষ্টের পর আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। যার যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজেকে সংশোধন করো।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

তোমাদের পাশে থাকার জন্য আপাতত দূরত্ব আমাদের কোনো সমস্যা নয়। আধুনিক যোগাযোগ আর সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আজ আমরা খুব কাছাকাছি। তাই আমি আছি তোমাদের পাশে।
পড়াশোনা নিয়ে তোমাদের কাছেই আছি। বিশেষ করে গণিত নিয়ে কারো সমস্যা থাকলে আমার মেসেঞ্জারে রিকুয়েষ্ট দাও। যথাসাধ্য তোমার সমস্যা সমাধানে আমি বদ্ধপরিকর।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

তোমাদের আনাগোনা ছাড়া আমাদের দিনগুলো ভালো যায়না। চোখের সামনে আমাদের সন্তানের চেহারায় তোমাদেরকে উপলব্ধি করছি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আমাদের অগণিত সন্তান এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের জন্য দোয়া রইলো। দেশ, জাতি, মানুষের জন্য ওদের ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে বুকটা বড় হয়ে আসে। মহান রবের কাছে ফরিয়াদ ঐসকল সূর্যসন্তানের প্রতি যারা নিবেদিত মানুষের কল্যাণে।

পরিশেষে তোমাদের সুস্থতা আর দীর্ঘ হায়াতের দোয়া করি। তোমাদের মুনাজাতে আমাদেরকেও রেখো।জুবিলীর সকল শিক্ষকদের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি রইলো শুভকামনা। ঘরে থাকো, সুস্থ থাকো।

(লেখাটি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষক জনাব আনোয়ার হোসেন এর ফেইসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত