সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

শিশুর বমি কীভাবে থামাবেন?

ফুড পয়জনিং, ইনফেকশন, যানবাহন চড়া জনিত অসুস্থতা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় আপনার শিশুর বমি হতে পারে। শিশু ঘনঘন বমি করলে অথবা বমির সময় সে ব্যথা পাচ্ছে মনে হলে চিকিৎসকের কাছে নেয়া জরুরি। এ বমি থেকে রিফ্লাক্স ইসোফ্যাজাইটিস হতে পারে- এ কন্ডিশনে পাকস্থলির অ্যাসিড খাদ্যনালিকে উক্ত্যক্ত করে এবং এটির জন্য মেডিক্যাল চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

শিশুদের মধ্যে বমির আরেকটি মারাত্মক কারণ হলো পাইলরিক স্টেনোসিস, যেখানে ২ মাসের কম বয়সের শিশুদের দ্রুত গতিতে বমি হয়ে থাকে। পাকস্থলি ও অন্ত্রের মধ্যকার মুখ সংকীর্ণ হয়ে গেলে অথবা সেখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে এ বমি হয়। এ দশার চিকিৎসা না করলে তা তীব্র পানিশূন্যতা ও ওজন হ্রাসের কারণ হতে পারে। এটি হলো মারাত্মক জরুরি অবস্থা। যদি সন্দেহ করেন যে আপনার শিশুর পাইলরিক স্টেনোসিস রয়েছে, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান- এ দশায় সাধারণত সার্জারির প্রয়োজন হয়।

যেসব ছেলেমেয়ে হঠাৎ করে বমি করতে শুরু করেন তাদের গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস থাকার সম্ভাবনা বেশি- গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস হলো পাকস্থলি ও অন্ত্রের একটি ইনফেকশন, যা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা হয়ে থাকে। ভাইরাস জনিত ইনফেকশন মাঝারি মাত্রার হতে পারে এবং এর সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ থাকতে পারে, যেমন- গলা ব্যথা, শ্লেষ্মায় নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া ও কান ব্যথা। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া জনিত ইনফেকশন খুব তীব্র হতে পারে- এটি এমন মারাত্মক ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে যেখানে রক্তের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যেতে পারে। ভিন্নদেশে ভ্রমণকালে অথবা ভ্রমণের পরে যে ডায়রিয়া হয় তার বেশিরভাগ কেসই ব্যাকটেরিয়া ঘটিত। গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিসের ছেলেমেয়েদের ডায়রিয়ার পাশাপাশি জ্বরও ওঠতে পারে। অধিকাংশ গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস কেসের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন নেই, শিশুরা কিছুদিনের মধ্যে এমনিতে ভালো হয়ে যায়।

বমির অন্য কারণগুলো হলো

* মোশন সিকনেস বা গতি অসুস্থতা, যা সাধারণত গাড়িতে চড়লে হয় (এটি হলো ছেলেমেয়েদের বমির অন্যতম সাধারণ কারণ)

* ফুসফুস, কান, মূত্রতন্ত্র, পাকস্থলি ও অন্ত্রের ইনফেকশন

* অ্যাপেন্ডিসাইটিস বা অ্যাপেন্ডিক্সের প্রদাহ (যেখানে পেট ব্যথা ও জ্বরও আসতে পারে)

* বিষাক্ত কিছু খাওয়া

* মাথায় ইনজুরি, যেখানে কনকাশন বা মাথায় আঘাতের পর সাময়িক প্রতিক্রিয়া (যেমন- মাথাব্যথা, মনোযোগ বসাতে সমস্যা, স্মৃতি সমস্যা, ভারসাম্য সমস্যা ও সমন্বয় সমস্যা) ও ব্রেইন হেমোরেজ বা মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণও অন্তর্ভুক্ত

* বিরলক্ষেত্রে ব্রেইন টিউমার অথবা মস্তিষ্কের অন্যান্য সমস্যা।

বমির চিকিৎসা

* আপনার শিশুকে পর্যাপ্ত তরল পান করান, বিশেষ করে তার ডায়রিয়াও হলে। পানিশূন্যতা প্রতিরোধ ও বমি-ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া তরল, লবণ ও ক্যালরি প্রতিস্থাপনের জন্য এটি অপরিহার্য। এমনকি আপনার বাচ্চার বমিভাব থাকলেও তরল পান করাতে থাকুন। আপনার শিশু সবেমাত্র বমি করলে তরল পান করানোর পূর্বে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং তারপর অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করুন।

* বমি আরম্ভের প্রথম ২৪ ঘন্টায় আপনার বাচ্চাকে শক্ত খাবার বা সলিড ফুড খাওয়াবেন না। এর পরিবর্তে চামচ বা বোতলের মাধ্যমে পরিষ্কার তরল অল্প পরিমাণে ঘনঘন ডোজে (প্রতি ৫ মিনিট পরপর) পান করান। আপনার শিশুকে বরফের টুকরো অথবা জীবাণুমুক্ত ভেজা কাপড়ও চুষাতে পারেন। বয়স্ক শিশুদেরকে তরল পান করাতে স্ট্র দিতে পারেন। আপনার শিশুর তরল পানে সমস্যা না হলে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান।

* স্তন্যপানকারী শিশুদেরকে বুকের দুধই খাওয়াবেন, কিন্তু সচরাচরের তুলনায় একটু ঘনঘন খাওয়াতে হবে (এক থেকে দুই ঘন্টা পরপর) এবং তা ছোট ডোজে (একবারে ৫ থেকে ১০ মিনিট)। মায়েরা স্তন থেকে দুধ বের করেও চামচ, কাপ বা বোতলের মাধ্যমে বাচ্চাদেরকে খাওয়াতে পারেন। যেসব শিশুরা ফর্মুলার ওপর আছে তাদেরকে পূর্ণ শক্তির ফর্মুলা খাওয়াতে হবে।

* বুকের দুধ ও ফর্মুলা ছাড়াও আপনার শিশুর পানিশূন্যতা প্রতিরোধ ও খনিজ ঘাটতি পূরণের জন্য পিডিয়ালাইট, রাইসলাইট অথবা কাও লেক্ট্রোলাইটের মতো প্রোডাক্ট খাওয়াতে পারেন- এসব ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন বমির মাধ্যমে হারানো তরল ও লবণ প্রতিস্থাপনে সাহায্য করে। বয়স্ক শিশুকে এসব ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন থেকে তৈরি করা ফ্রোজেন আইস পপ বা বরফের টুকরো চুষতে দিতে পারেন। আপনার বাচ্চার বয়স ৬ মাসের উর্ধ্বে হলে এবং সে স্বাদবিহীন ওরাল ডিহাইড্রেশন সল্যুশন পছন্দ না করলে প্রতি ডোজে অর্ধ চা-চামচ আপেলের রস মেশাতে পারেন।

* বয়স্ক শিশুদের ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন ছাড়াও অন্যান্য তরল পান করতে দিন। কিন্তু ডায়রিয়া হলে ফলের রস ও কোমল পানীয় পান করতে দেবেন না, কারণ এসব তরলের উচ্চ সুগার কনটেন্ট ডায়রিয়ার পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে। আপনার শিশুর ডায়রিয়া ছাড়াই বমি হলে ফলের রস দেয়া যাবে, শুরুতে অল্প পরিমাণে দিন, পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।

* আপনার শিশু বমির প্রথম আট ঘন্টাতে বমি ছাড়াই তরল খেতে পারলে ধীরে ধীরে শক্ত খাবার বা সলিড ফুড খেতে দিন। অল্প বয়সি শিশুদেরকে ব্লান্ড ডায়েটের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, অর্থাৎ তাদেরকে নরম, কম আঁশ ও মসলামুক্ত খাবার খেতে দিন, যেমন- আপেল সস, কলা ভর্তা ও ইনফ্যান্ট সিরিয়াল। বয়স্ক শিশুদের (১ বছরের উর্ধ্বে) ক্রেকার্স, টোস্ট, মিশ্র শস্য, স্যূপ, আলু ভর্তা ও সাদা পাউরুটি খাওয়ানো যাবে। বমি থেমে যাওয়ার ২৪ ঘন্টা পর শিশুকে স্বাভাবিক ডায়েটে ফিরিয়ে আনা যাবে।

যখন চিকিৎসকের কাছে নেয়ার প্রয়োজন হবে

* আপনার শিশুর মধ্যে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি মেডিক্যাল সেবার প্রয়োজন হবে, যেমন- অত্যধিক দুর্বলতা অথবা অলসতা অথবা ক্লান্তি, ঠোঁট বা মুখের শুষ্কতা ও সচরাচরের তুলনায় দেরিতে মূত্রত্যাগ (১ বছরের কম বয়সের শিশুরা চার থেক ছয় ঘন্টা পর ও ১ বছরের বেশি বয়সের শিশুরা ছয় ঘন্টারও বেশি সময় পর মূত্রত্যাগ দুশ্চিন্তা করার মতো বিষয়)। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের ব্যাপারে বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে, কারণ তারা খুব দ্রুত পানিশূন্য হতে পারে। এক বছরের কম বয়সি শিশুরা পানিশূন্যতায় ভুগলে সানকেন ফন্টানেল হতে পারে, অর্থাৎ তাদের খুলির ওপরে যে নরম স্পট রয়েছে তা সচরাচরের তুলনায় বেশি গভীর হতে পারে।

* এক মাসের কম বয়সী শিশুকে প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর সময় বমি করে দিলে মোটেই অবহেলা করা যাবে না, কালক্ষেপন না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তিন মাসের কম বয়সি শিশু ঘনঘন, তড়িৎ গতিতে বমি করলে তা পাইলরিক স্টেনোসিসের লক্ষণ হতে পারে।

* বমির সঙ্গে তীব্র পেট ব্যথা অথবা মাথাব্যথা হলেও ঘরে বসে থাকা যাবে না, বাচ্চাকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। আপনার বাচ্চার বমি ও জ্বর আসলে এটি মেনিনজাইটিসের লক্ষণ হতে পারে, বিশেষ করে ডায়রিয়া না হলে। মেনিনজাইটিসের অন্যান্য বিপদজনক লক্ষণ হলো: ঘাড় নাড়াতে না পারা বা শক্ত হয়ে যাওয়া ও ত্বকে র‍্যাশ।

* মাথায় ইনজুরির পর বমি হলে তা এটা ইঙ্গিত করতে পারে যে আপনার শিশুর কনকাশন অথবা মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ (ব্রেইন হেমোরেজ) হয়েছে।

* কফির সঙ্গে রক্ত বের হলে এবং তা দেখতে কফির গুড়ার মতো হলে এটি পাকস্থলিতে রক্তক্ষরণের লক্ষণ হতে পারে।

* সবুজ বমি হলে ও সেইসঙ্গে তীব্র পেটব্যথা থাকলে এটি আপনার শিশুর অন্ত্রে প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিতবাহী হতে পারে।

* একাধিকবার বমি হলে এবং এ সময়ের মধ্যে পেট শক্ত বা টাইট মনে হলেও বাচ্চাকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে নিতে দেরি করবেন না।

* আপনার শিশুর মেন্টাল স্ট্যাটাস বা মেজাজে অতিমাত্রায় পরিবর্তন আসলে ও তাকে অত্যধিক ক্লান্ত দেখালে এটি মস্তিষ্ক/মেরুরজ্জুতে ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র : প্যারেন্টস


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!