বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

শোক হোক শক্তি || শাহরিয়ার জাহাঙ্গীর

‘মোর লাগি করিয়ো না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক’। লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক’ হ্যাঁ তাঁর রয়েছে মহান সব কর্ম এবং সত্যিকারের এই বাংলা ও বাঙালির জীবনালোক। তাই তাঁর জন্য কেন করব শোক? তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে তাঁর নির্দেশিত পথে চলবার কোন বিকল্প নেই। আর তাঁর অসমাপ্ত কাজ দুঃখি মুখে হাসি ফুঁটিয়ে সোনারবাংলা প্রতিষ্ঠা করাই হবে তাঁর রক্তের ঋণ শোধ করবার শ্রেষ্ঠ উপায়।

বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের চুয়াল্লিশ বছর পরেও আমরা শোক করব কেন? বঙ্গবন্ধুর শাহাদত বার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে অবশ্যই শ্রদ্ধার সাথে পালিত হবে। তবে এখনো কেন আমরা বলব ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’? কেন আমরা বলব না ‘জাগো বাঙালি জাগো’? বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের চুয়াল্লিশ বছর পরে আমরা তাঁর সৃষ্ট এই বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে অবশ্যই অবনতচিত্তে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে। প্রতিবছর ১৫ আগষ্টের এই দিনটি এলে আমার মনে হয় তিনি আরও বেশি জীবন্ত, আরো শক্তিশালী, আরো ব্যক্তিত্বময় হয়ে আছেন আমাদের মাঝে। মৃত্যুর চুয়াল্লিশ বছর পরে আজও তাঁর ছবি, তাঁর বজ্রকণ্ঠের ভাষণ, তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও অন্যান্য লেখায় প্রতিদিনই তিনি আমাদের কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠেন। আমার মনে হয় নতুন করে তাঁর নব জন্ম হয়েছে তাঁরই সৃষ্ট এই বাংলায়। তিনি আজ আমাদের নতুন করে জেগে ওঠার শক্তি শপথ আর সাহসের অপর নাম।

১৫ আগষ্ট আর কোন শোক নয়, এখন থেকে ১৫ আগষ্ট হোক শুধু স্মরণ, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, দোয়া অনুষ্ঠান ও তাঁর স্বপ্ন, ও তাঁর দেখানো পথ, তাঁর শিক্ষাকে আমাদের অন্তরে ধারণ ও বরণের মধ্য দিয়েই বাঙালির উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠার দিন। দরকার হয় সেই মহান নেতার জন্মদিনের মতো আমরা তাঁর প্রয়াণ দিবসেও উৎসব পালন করে তাঁর হত্যাকারি আর হত্যার নেপথ্যের শয়তানদের মুখের হাসি-আনন্দ-সুখ কেড়ে নেবোনা কেন?

বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছিল তারা চেয়েছিল আমাদের দেশের স্বাধীনতাকে হত্যা করতে। ওরা চেয়েছিল এই বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানাতে। কেউ কেউ চেয়েছিল পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন করতে। আবার কেউ চেয়েছিল ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ করতে। আবার কেউ মুসলিম বাংলা বানাতে চেয়েছিল। ওরা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে অনেকটা সময় পিছিয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। ওরা ব্যর্থ হয়েছে। ওরা আমাদের বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে ঠিকই। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, আমাদের বাঙালিত্বের অহংকার, আমাদের সংস্কৃতিকে হত্যা করতে পারেনি। ওরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি এদেশের মানুষের ভালোবাসাকে হত্যা করতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্ম ও তাঁর সৃষ্টি ইতিহাসের শ্বাশ্বত অধ্যায়কে দানবেরা মুছে ফেলতেও পারেনি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে হত্যাকারীদেরকে যারা ‘সূর্ষসন্তান’ বলেছে, যারা রাষ্ট্রদূতের চাকরি পুরস্কার দিয়েছে, তারা আজ কোথায়? তারা আজ ইতিহাসের আস্তকূড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ঐ ১৫ই আগষ্টের কালো দিনটিতে যারা বিশাল কেক কেটে ভূয়া জন্মদিন পালন করেছে, তারা আজ কোথায়? আজ তারা কেউ জেলের ঘানি টানছে কেউবা শাস্তির ভয়ে দেশ-দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা আজ না আছে ক্ষমতায়, না আছে সংসদে, না আছে রাজপথে! তারা আজ জেলে বা নির্বাসনেই জীবনের ভুল আর শয়তানীর মাশুল দিচ্ছে। আর হত্যাকারীদের অনেকেরই ফাঁসী হয়েছে এবং বাকিরা ফাঁসীর দন্ড নিয়ে পালিয়ে আছে দেশে বিদেশে। তাদের মদদ দাতার দল বিএনপি নামক সেই প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানীর অস্তিত্ব আগামীতে থাকবে কিনা সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

আজ বঙ্গবন্ধুর এই বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর তাঁর সুযোগ্যা কন্যা দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে। তিনি নিজের আর তাঁর পরিবারের প্রতি মূহূর্তের জীবনের নিরাপত্তার হুমকি উপেক্ষা করে লড়াই করছেন এ দেশের দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে। তাদের জন্য সুখি সম্মৃদ্ধ এক উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চেষ্টায়। বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক বা রোল মডেল।

তাই আমি বলি, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের। আমরা এখন শোক করব কেন?

আজ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, তাদের দোসর আর নাটের গুরুদের শোকের মাতম! তাদের সীমাহীন অপরাধের পাপ নিয়ে কারো কারো ফাঁসি হয়েছে। কেউ কেউ বিদেশে বিভূঁইয়ে আত্নীয় পরিজনহীন অযত্ন অবহেলায় মৃত্যু হয়ছে। কেউ চোরের মত পালিয়ে বেড়াচ্ছে এদেশে ওদেশে। আর যারা ষাট-সত্তর কেজির বিশাল কেক কেটে উৎসব করেছে এক সময়, সেই তাদের উৎসব আজ কোথায়? তাদের আজ শোকের মাতম চলছে এবং চলবেই….

শোক বেশীদিন পুষে রাখলে মানুষের মনের শক্তির যায়গাাটাকে দুর্বল করে দিতে পারে। মানুষের মনের হতাশা বা তার বিষন্নতাবোধ তার মনের শক্তির যায়গাটাকে নষ্ট করে দিতে পারে। যে কোনো প্রিয়জনের প্রয়াণ অবশ্যই কষ্ট আর বেদনার। কিন্তু তাঁকে নিয়ে শুধু শোক করলেই কি চলবে? আমাদের প্রিয়জনকে আমরা অবশ্যই ভুলবনা।

আজ বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের চুয়াল্লিশ বছর পার হোল। বঙ্গবন্ধু এদেশর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। আমাদের জাতির জনক। আমাদের মহান নেতা। আমরা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করবো তাঁর দেখানো আদর্শের পথে নিজেদেরকে চলবার যোগ্য করে গড়ে তুলতে। তাঁর স্বপ্নের সোনারবাংলা গড়ার প্রতিটি কাজে। আজ তাঁর প্রয়াণের চুয়াল্লিশ বছর পরেও আমরা কেন বলবো ‘কাঁদো বাঙালী কাঁদো’? আমরা কেন বলবো না ‘জাগো বাঙালি জাগো’? বঙ্গবন্ধু তাঁর রক্ত দিয়ে এদেশের মাটিকে পবিত্র করে দিয়ে গেছেন। তাঁর রক্তের ঋণ আমাদের শোধ করতে হবে, তাঁর স্বপ্নের সোনারবাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তাঁর দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে। আজ চুয়াল্লিশ বছর পরে আমরা তাঁর শোককে কেন শক্তিতে পরিণত করব না? তাঁকে আমরা স্মরণ করবো, তাঁর আদর্শে, তাঁর কাজে, তাঁর লেখায়, তাঁর বিশ্বাসে, তাঁর ভালোবাসায়,তাঁর জীবন যাপনের যাবতীয় শুভকর্মে। আর এটাই হতে পারে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। আর তাঁর শোক হোক আমাদের শক্তির শ্রেষ্ঠ উৎস। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক সেই মহান নেতার আদর্শের, তাঁর স্বপ্নের সোনারবাংলার বাস্তবায়ন।

কিন্তু সেই মহান নেতার ছবি বা তাঁর নাম ভাঙ্গিয়ে আত্নপ্রচারের যে বাণিজ্যমেলা চলছে তো চলছেই। আত্নপ্রচারের এই বাণিজ্যমেলাত কি আর চলতে দেয়া যায়? আমার দুঃখ হয় যখন দেখি সেই মহান নেতার ছবির পাশে, দেশের সকল অঞ্চলের চোর বাটপার গুন্ডা বদমায়েশেরা যে যার মতো করে বঙ্গবন্ধুর ছবির সাথে নিজেদের বিশাল বিশাল ছবি দিয়ে, যে ব্যানার পোষ্টার ফেষ্টুন দিয়ে আত্নপ্রচারের মহা এক অসুস্থ প্রতিযোগীতা । এই অসুস্থ প্রতিযোগীতা আর কোনোভাবেই চলতে দেয়া যায়না। আজকাল তাঁর শাহাদত বার্ষিকী ঘিরে দেশে চলে শত হাজার কোটি টাকার ব্যবসা আর চাঁদাবাজি। দেশের নানা স্থানে কাঙালী ভোঁজের নামে যে খানাপিনার উৎসব চলছে তাও বন্ধ করলে ভালো হয়। এতে করে বঙ্গবন্ধুর আত্না একটু শান্তি পায়।

আর বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে, তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা, সেলফি বা ছবি তোলার অসুস্থ প্রতিযোগীতাও বন্ধ হওয়া দরকার।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী আর জাতীয় সংসদের স্পিকার ছাড়া অন্য কারো পুস্পাঞ্জলী দেবার বিষয় সরাসরি সম্প্রচর বন্ধ করা হোক। আর বিশেষ দিনগুলোতে বেদীমূলে সবার যাবার অধিকার সংরক্ষিত হোক। আর তা করলেও তা যেন দুপুর বারটার পরে হয়। আর এটা করা হলে, শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা লোকজনদের মধ্যে ঠেলাঠেলি ধাক্কা ধাক্কি কনুয়ের গুতাগুতি বা এর থেকেও বেশী অশোভন কিছু বিষয় বা কারো কারো শক্তি প্রদর্শন বা নিজেদের ছবি টেলিভিশনে দেখাবার বাসনায় দীর্ঘক্ষন নির্লজ্জভাবে দাড়িয়ে থাকার অসুস্থ প্রবণতা কমানো যাবে।

আমাদের বাঙালীর মতো নির্লজ্জ আর আত্নপ্রচার প্রবণ জাতি পৃথিবীতে আর আছে বলে আমার জানা নেই। সবাই চায় যে কোনোভাবেই হোক তার নিজের মুখ খানা টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হোক। এ এক অসুস্থ আর বিকৃত মন-মানসিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ। তা না হলে, কনুইয়ের গুতাদিয়ে, অন্যকে ঠেলে ধাক্কিয়ে, নিজের কল্লা জাগিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেবার জন্য কতো নির্লজ্জতাই না আমরা করি!!! এক্ষেত্রে সবার নির্লজ্জতা আর অশোভন বিষয়গুলো উপস্থিত সব মানুষের চোখে না পড়লেও , ক্যামেরার চোখকে কেউ ফাঁকি দিতে পারেনা। ধিক্ এসব নেতাদের। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে বিগত কয়েক বছরের ১৫ আগষ্টের সেই সকালে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা, যুব মহিলা লীগের নেতৃদের নির্লজ্জতা আর অশোভন কার্যকলাপ অত্যন্ত লজ্জা আর ঘৃনার বিষয়। আর বিটিভি কর্তৃক ধারণকৃত গতবছরের সেই সকালবেলার ভিডিও চিত্রের কপি আমার কথার প্রমান হিসেবে যে কেউ দেখতে পারেন। জাতীয় শোক দিবসের জাতীয় সেই অনুষ্ঠানের অশোভন আচরণের জন্য দলীয়ভাবে শাস্তির ব্যাবস্থ করা দরকার। তা না হলে আমাদের নির্লজ্জতা আর আত্নপ্রচারের এই সর্বগ্রাসী খায়েস বন্ধ করা যাবেনা। এই বেহায়াপনা আর নির্লজ্জতায় সেই মহান নেতার স্মরণ অনুষ্ঠানের না থাকে ভাব না থাকে কোনো গাম্ভির্য। আর ভাবগাম্ভির্যতা তো অবশ্যই নয়।

জয়বাংলা।  জয়বঙ্গবন্ধু।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত