সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

সবার উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন কী?

সালাহউদ্দিন নাগরী

আমাদের দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

মাস্টার ডিগ্রি পাশ করে জুতসই চাকরির অভাবে তথ্য বা ‘ডিগ্রি’ গোপন করে অনেক ছেলেমেয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিসের অফিস সহায়ক (পিয়ন) বা এ ধরনের নিম্নপদে চাকরি করছেন।

প্রাইমারি স্কুলগুলো ও কিন্ডারগার্টেনে মাস্টার ডিগ্রিধারী শিক্ষকের তো ছড়াছড়ি। আর যাদের ভাগ্যে তাও জুটছে না, তাদের কেউ কেউ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার, রিকশা গ্যারেজের সুপারভাইজার, ডেকোরেটরের দোকান বা ইটভাটার ম্যানেজার অথবা এ ধরনের নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে কোনোভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে আছেন।

প্রকৃতপক্ষে কোনো কাজকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, প্রতিটি কাজেরই মর্যাদা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওইসব কাজের জন্য কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে বিএ-এমএ পাশ করার দরকার আছে কি না।

আর কেনই বা তাদের এত বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে এ ধরনের কাজে যুক্ত হতে হবে। হতে পারে আমরা উচ্চশিক্ষিত জনসমষ্টিকে কর্মে নিয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কর্মকাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। বিষয়টি আমাদের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম এবং কর্মকাঠামোর অসামঞ্জস্যতা, সমন্বয়হীনতা ও অদূরদর্শিতাকেই নির্দেশ করে।

বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে অনেকেই নিজের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারছে না। তারপরও শিক্ষার ওই ধাপ অতিক্রম করার জন্য সবাই প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অর্জিত শিক্ষা ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে পারুক বা না পারুক, সবার এমএ ডিগ্রি চাই।

আর তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা সমাজের একশ্রেণির মানুষের এ ধরনের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে আমরাও সোৎসাহে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার কাজে নেমে পড়েছি।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসসংবলিত বহুতল ভবনের মধ্যে হয়তো কয়েকটি ফ্লোর নিয়েই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

এ ধরনের পরিবেশে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশ্বজনীন আবেদন কোথায়? বড় পরিবেশে না গেলে মনের প্রসার ঘটে না।

একজন শিক্ষার্থী সরকারি স্কুল-কলেজে যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর ক্ষুদ্র অবকাঠামোগত স্থাপনার মধ্যে তাকে বন্দি হয়ে যেতে হয়।

ঢাকা শহরের অধিকাংশ প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অডিটোরিয়াম, খেলার মাঠ নেই। বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনে অন্য প্রতিষ্ঠান বা ক্লাবের দ্বারস্থ হতে হয়।

দেশের অধিকাংশ সচেতন মানুষ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিতে পারেননি। অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে আরও মনোযোগ দেওয়ার জন্য কয়েক বছর আগে দেশের বড় বড় কলেজ থেকে এইচএসসি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। মনে হচ্ছে, মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন সব ছাত্রছাত্রীর জন্য অপরিহার্য ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপ, আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোয় উচ্চশিক্ষার বিষয়টি অন্য ধরনের। আমাদের এখানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন না করা পর্যন্ত সাধারণত লেখাপড়া শেষ হয়েছে বলে মনে করা হয় না।

আর ওই দেশগুলোতে গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেল তো লেখাপড়া শেষ। তারপর ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বা অন্য কাজ, অর্থাৎ কর্মজীবন শুরু।

যদি উচ্চতর ডিগ্রি কারও কর্মজীবনের জন্য অবশ্যম্ভাবী বলে প্রতীয়মান হয়, তবেই তিনি ওদিকে মনোনিবেশ করেন।

আর আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীরা সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার জন্য অকাতরে শ্রম, মেধা, মনন ও অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছে; পক্ষান্তরে ওই ডিগ্রি তাকে কর্মক্ষেত্রে উচ্চতর বা ভিন্ন কোনো উপযোগিতা সৃষ্টি করে দিতে পারছে না।

অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। কিন্তু কোয়ালিটি এডুকেশনে আমাদের পর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে।

ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইরান ও তুরস্কের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে তাদের মানসম্পন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত দেশে সাড়ে ৬ বছরের একটি শিশু যা শেখে, আমাদের দেশের শিশুরা তা শেখে ১১ বছর বয়সে। প্রাথমিক শিক্ষার মান দুর্বল।

সাধারণত সমাজের সচেতন ও সামর্থ্যবান বাবা-মা, সরকারি প্রাইমারির সচেতন শিক্ষকও তার শিশুসন্তানকে নিজের স্কুলে না পড়িয়ে মডেল কেজি বা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে।

শিক্ষকরা ভালো করেই জানেন প্রাইমারি স্কুলগুলোর লেখাপড়ার মান কোন পর্যায়ে। প্রাইমারিতে একজন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার ভিত্তি মজবুত না হলে উচ্চশিক্ষায় তার কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশার সুযোগ কোথায়?

শুধু কি প্রাইমারি স্কুলের এ অবস্থা? মাধ্যমিক থেকে উপরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির কনসেপ্ট ক্লিয়ার করতে পারছে না।

উচ্চশিক্ষায়ও সব ক্ষেত্রে শিক্ষার মান সমভাবে রক্ষিত হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু কিছু সাবজেক্ট আছে, যেগুলোতে পরীক্ষায় পাশের জন্য সারা বছর ধরে মনোযোগী থাকার প্রয়োজন পড়ে না। ব্যাক পকেটে ভাঁজ করা খাতাতেই সারা দিনের ক্লাস সম্পন্ন হয়ে যায়। পরীক্ষার দু-চার দিন আগে ৮-১০টি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করলে মোটামুটিভাবে ৫০ ভাগ নম্বর তোলা যায়।

গ্রাজুয়েশন, মাস্টার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি পেতে একজন শিক্ষার্থীর ৩-৪ বছর ধরে ৪০-৫০টি প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে ধারণা নিলেই যথেষ্ট। এসএসসি ও এইচএসসির চেয়ে অনেক কম লেখাপড়া করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জিত হয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষক অনার্স ফাইনালের খাতা নিরীক্ষার সময় এক ছাত্রের খাতায় ‘দ্বিতীয় মহাসমারোহ’ শব্দটি দেখে ‘স্লিপ অফ পেন’ ভেবে এড়িয়ে গেলেন। এরপর আরও বেশ কয়েকটি খাতায় এর পুনরাবৃত্তি দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন-দ্বিতীয় ‘মহাসমর’ হয়ে গেছে দ্বিতীয় ‘মহাসমারোহ’! মূল চোতার এই ভুলটি ধরার যোগ্যতাও ওই অনার্স পড়ুয়া ছাত্রদের ছিল না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জাতীয় শিক্ষাক্রমের খসড়া রূপরেখার অনুমোদন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী কার্যক্রম।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে শিক্ষাব্যবস্থা আরও আধুনিক ও মানসম্পন্ন এবং যুগোপযোগী করা একান্তভাবে অপরিহার্য। তৎপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রস্তাবনা মতে, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে না, আর দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। তাই সংগত কারণে প্রাইমারি ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাও রহিত হয়ে যাচ্ছে। নবম ও দশম শ্রেণিতে সায়েন্স, আর্টস, বাণিজ্য বা এ ধরনের কোনো বিভাগ থাকবে না। দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী একই সাবজেক্ট নিয়ে লেখাপড়া করবে। এইচএসসিতে গিয়ে নিজ নিজ পছন্দ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় ও বিভাগ বাছাই করে নেবে। আমাদের কোয়ালিটি এডুকেশনের দিকে নজর দিতে হবে এবং এর নিশ্চয়তা পেতে প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে লেখাপড়ার পরিবেশ ভালো করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে।

আমাদের একরৈখিক লেখাপড়ার পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। জীবনে চলার জন্য উপযুক্ত ও যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত যে চাকরিই হোক না কেন, যেখানে প্রকৃতপক্ষে এমএ পাশের দরকার নেই সেখানে এমএ পাশের শর্ত বাদ দেওয়া যেতে পারে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা গবেষণাধর্মী কিছু প্রতিষ্ঠানে চাকরি ছাড়া এমএ, পিএইচডি বা উচ্চশিক্ষার দরকার পড়ে না। যোগ্য ও পদস্থ কর্মকর্তা, সফল রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা নেই।

দেশ ও জাতি গঠনের পাশাপাশি প্রতিযোগিতার বিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই। কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এমনভাবে বিস্তৃত করতে হবে, যেন বেসিক এডুকেশন গ্রহণের পর ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে শিল্প-প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হবে এবং শিক্ষার্থীরাও স্বল্প সময়ে কর্মজীবন শুরু করে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

ফলে সবাই আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেও চাইবে না, শুধু গবেষণায় আগ্রহী ও মনযোগী শিক্ষার্থীরাই উচ্চশিক্ষায় আসবে। এতে উচ্চশিক্ষার মানও বাড়বে। জীবনে চলার মতো, বিশ্বকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য যুগ চাহিদানির্ভর শক্তিশালী বেসিক এডুকেশন সবার দরকার। এ জন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও কলেবর বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর ব্যবহারিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং উচ্চশিক্ষাকে অনেক দিনের জন্য নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছিল। ওই পদক্ষেপের কারণেই হয়তো তারা আজ বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ও প্রযুক্তি চর্চার মোড়লে পরিণত হতে পেরেছে। দেশের দ্রুত উন্নয়ন ও সয়ম্ভরতা অর্জনে আমাদের সবার শিক্ষাভাবনাও তো এ রকমই হওয়া দরকার।

বর্তমানে চলমান শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার পর উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে। এমএ-এমএসসি-এমকম বা সমমানের ডিগ্রি অর্জিত হলে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ হওয়ার গতানুগতিক ধ্যানধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।

ব্যবহারিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করার জন্য দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গ্রাজুয়েশন (স্নাতক) পর্যায়কে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার চূড়ান্ত ধাপ হিসাবে গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদের ‘মাইন্ডসেট’ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত