শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১

সমতার ঈদে অসমতার গল্প

সাকিনা কাইউম

শো-রুমে সাজানো সারি সারি বাহারি জামাগুলো দেখে চোখ আটকে গেল। আমার মনে হচ্ছিল প্রতিটি জামা একেকটি প্রজাপতি। লাল,নীল, হলুদ, বহু রঙের প্রজাপতি।

ইচ্ছে হচ্ছিল সব প্রজাপতিগুলো বাক্সবন্দী করি।

আমাদের ইচ্ছে গুলো বহুমাত্রিক। আমাদের চাওয়া পাওয়া গুলো খুব নান্দনিক। আমাদের প্রাপ্তির খাতায় স্বয়ং ঈশ্বর থাকেন। অভাব নামের অশুভ হাত আমাদের স্পর্শ করতে পারে না কোনোদিন। সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্ম আমাদের। 

আমরা সুখী, ভীষণরকম সুখী। আমি তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে খুশিমনে ঢুকে পড়লাম একটা আলোক সজ্জায় সজ্জিত মস্ত বড়ো শো-রুমে। 

আমি একটার পর একটা প্রজাপতি কিনতে লাগলাম। লাল, নীল, হলুদ, বহু রঙের প্রজাপতি।

আমি প্রজাপতির মতো কাপড় গুলোর বিল দিতে যেয়ে আচমকা থমকে গেলাম! আমার ব্যাগের টাকা হাওয়া ! মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ভীষণ কান্না পাচ্ছিল আমার। এমনটা হবে ভাবতে পারিনি।

ঈদের একটা দিন, মন মানে না, মেয়েদের একটা জামা না কিনে দিলে! অনেক খুঁজে ব্যাগের কোণে মাত্র অল্প কিছু টাকা পেলাম। সব প্রজাপতি আমার আর কেনা হল না। আমার সামর্থ অনুযায়ী তিন মেয়ের জন্য একটি করে কটন ড্রেস কিনে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। মনটা কেমন খারাপ লাগছিল! এমনটা আগে কখনো হয়নি! মোটা অঙ্কের বাজেট নিয়েই করোনাকালীন আগের ঈদগুলোতে শপিং করেছি মনের মতো।

খুব কষ্ট হচ্ছিলো আমার। 

কষ্ট হওয়ার একটাই কারণ, – এ-ই চলমান মহামারীর কারণে আমাদের আয় কমেছে অনেক, কিন্তু খরচ আগের তুলনায় ঢের বেড়েছে। 

আমি আনমনা হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম।

অকস্মাৎ আমি দেখতে পেলাম, ফুটপাথে মার্বেল খেলছে তিনটি ছেলে। 

অপুষ্টিতে ভরা চোখ তাদের। হয়তো বহুদিন ভালো কিছু খেতে পায়নি তারা।

ওদের ভিতরের দারিদ্রতা খুব টের পাচ্ছিলাম আমি। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম তাদের চোখের ভেতরের বহুমাত্রিক স্বপ্নগুলো।

আমি টের পাচ্ছিলাম তাদের হৃদয়ে জেগে থাকা বেদনার গান।

খুব কান্না পাচ্ছিল আমার। 

মনে হচ্ছিল করোনা তাদের ছুঁতেই পারে না। করোনার থেকেও হয়তো বেশি ভয়ংকর ভাইরাসের সাথে তাদের প্রতিদিন যুদ্ধ করতে করতে এখন সব সয়ে গেছে সব।

হায়রে জীবন ! 

আমার চোখের ভেতরে ফের খেলা করে অগণিত বিস্ময় ! 

পাশেই এক কাঁঠাল বিক্রেতা তার নষ্ট হয়ে যাওয়া কাঁঠাল ড্রেনের পাশে নামিয়ে রাখল। আমি বোঝার আগেই বাচ্চাগুলো ঈগলের মতো ছোঁ দিয়ে কাঁঠালের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো। আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম! ভিতর থেকে কেমন বোবা কান্না বের হচ্ছিল আমার! নষ্ট কাঁঠালটি এক নিমেষেই খেয়ে জামার ভাজে বিচিগুলো ভাগ করে নিল ওরা তিনজন। আমার বাড়ি ফেরার তাড়া থাকলেও পা যেন চলছিল না। আমি কাছে ডেকে তিনজনের হাতে ৫০ টাকা করে দিয়ে কিছু না জিজ্ঞেস করেই হাঁটা শুরু করলাম। আমার আর কিছুই জানার নেই! আমি বুঝে গেছি ওদের ভিতরের যন্ত্রণা! 

বর্তমানে সরকারি হিসেবে, বাংলাদেশের ৩১ ভাগ মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। এদের বড় একটি অংশ হতদরিদ্র। করোনাকালীন এই সময়ে যারা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত তারাও এখন দারিদ্র সীমাতেই পড়েছে। 

ঈদ মানে আনন্দ হলেও, এই আনন্দকে মলিন করে দিয়েছে সামর্থ। ঈদ-উল-ফিতরের সময় যাকাত ও ফিতরার সাহায্য পেয়ে মোটামোটিভাবে ঈদ উজ্জাপন করলেও কোরবানীর সময় কারো সাহায্যের আশা করে না কেউ। মনের ভিতরেই চাওয়াগুলোকে কবর দিয়ে দেয় বহু মানুষ। ক’জন আর লাইন ধরে হুমড়ি খেয়ে এক মুঠো করে গোস্ত সংগ্রহ করতে পারে! অনেকের চুলো থেকেই কোরবানীর এই ঈদে গোস্তের সুগন্ধ আর ভেসে আসে না। 

এবার ঈদে অর্থনৈতিক মন্দা প্রভাবের ফলে আগে যারা দুটো পশু কোরবানী দিত – দিচ্ছে একটা। যারা একটা দিত – দিচ্ছে কয়েকজন মিলে ভাগে। গরুর বদলে ছাগল আবার অনেক অংশই কোরবানীই দিতে পারছেন না। 

তবুও তো ঈদ থেমে থাকবে না! সব সাধারণ দিনের মতোই এই দিনটি কেটে যাবে অনেকের। বুকের ভিতরের নীরব কষ্ট লুকিয়ে ঠোঁটে হাসি দিয়ে ইবাদতের মাধ্যমে ঈদ পালন করবে। 

জানিনা আবার সুদিন কবে আসবে! আমরা অপেক্ষায় সেই দিনের, যেদিন সৃষ্টিকর্তা জানের সদকার এই ঈদে সকলের জীবন হেফাজত করবেন।

সাকিনা কাইউম ঃ লেখক ও কলামিস্ট


© দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত