সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর করুণ প্রেমগাঁথা

ছবির ভদ্রলোকের নাম নুরুদ্দীন মহম্মদ সেলিম বা সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট এবং সম্রাট আকবর এর পুত্র। যুবক বয়সে তিনি যখন শাহজাদা, তখন প্রেমে পড়েন আনারকলির।

আনারকলির প্রকৃত নাম নাদিরা বেগম। কেউ বলেন শরীফুন্নেছা। তিনি ছিলেন এক ইরানীয় সওদাগরের সুন্দরী কন্যা। আনারকলি আর শাহজাদা সেলিমের প্রেমকাহিনী নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানে কত যে সিনেমা, নাটক আর সাহিত্য রচিত হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। শত বছর ধরে মুখে মুখে ঘুরে ফিরেছে এই বিয়োগান্তক করুণ প্রেমগাঁথা।

আনারকলি একদিন তার পিতার সঙ্গে আফ্রিকার উত্তর উপকূল থেকে সওদাগরি জাহাজে করে যাত্রা করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫। জলদস্যুরা তার বাবাকে হত্যা করে তাকে অপহরণ করে এবং ইস্তাম্বুলের ক্রীতদাস বাজারে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে মনোরঞ্জনের নানারকম তালিম নেয়ার পর তার অবস্থান হয় এক ধনাঢ্য পরিবারে। ওই পরিবারের ধনাঢ্য ব্যক্তি তাকে কিছুদিন পর তুরস্কের সুলতানের কাছে নজরানা পাঠান। তখন এটাই নিয়ম ছিল যে, কোনো উচ্চপদস্থ বন্ধুকেও কেউ কেউ খুশি করতে নারীদের উপহার হিসেবে দিত।

> আরও পড়ুন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ের গল্প

তুরস্কের সুলতান আনারকলিকে উপহার হিসেবে সম্রাট আকবরের কাছে পাঠান। সম্রাটের ভাষায় যার রূপ ছিল আনারের দানার ন্যায় রক্তিম। যৌবন রক্তজবার কলির ন্যায়। সম্রাট তাই তাকে ভালোবেসে নাম দেন আনারকলি।

শাহজাদা সেলিম (জাহাঙ্গীর) দেখলেন, মঞ্চের এ তন্বী পৃথিবীর কোন রমনী নয়। যেন অন্য গ্রহ থেকে আসা রূপসী। তার গাঢ় নীল চোখ, ডিম্বাকৃতি মুখমন্ডল, খাড়া নাক আর অসাধারণ গুণাবলিতে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ে গেলেন শাহাজাদা, তার হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। এতো রূপ কোন মানবী অঙ্গে থাকতে পারে সেলিম তা আগে কখনো দেখেননি। আনারকলিকে পেতে সেলিম উৎকোচ দিয়ে হাত করেন সম্রাট আকবরের হেরেমের রক্ষী সারাকে।

একবার সম্রাট আকবর তিন সপ্তাহের জন্য শিকারে গেলে সারা অতি গোপনে আনার কলিকে শাহজাদা সেলিমের খেদমতে হাজির করেন। পরবর্তীতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, আনারকলিও তার প্রেমে মজেছিলেন। তারা অভিসারে যেতেন। তবে তাদের মধ্যকার সাক্ষাত গোপন রাখা হতো। তাদের রোমান্টিক সম্পর্কের সময় আনারকলির বয়স ছিল চল্লিশের কোঠায় আর শাহজাদা সেলিমের বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়।

মুঘল সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম প্রেমে পড়েন রাজ্যের নর্তকী অনিন্দ্য সুন্দরী আনারকলির। কিন্তু সম্রাট আকবর এই সম্পর্ক কখনোই মেনে নেননি। সম্রাট আনারকলিকে সেলিমের চোখে খারাপ প্রমাণ করতে নানা ধরনের চক্রান্ত করেন। পিতার এ কৌশলের কথা জানামাত্র সেলিম নিজ পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু শক্তিশালী আকবর বাহিনীর কাছে সেলিম খুব সহজেই পরাজিত হন।

নিজ সন্তানের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেন আকবর। তখন প্রিয়তম সেলিমের জীবন বাঁচাতে আনারকলি নিজের জীবনের বিনিময়ে সেলিমের জীবন ভিক্ষা চান।

সম্রাট আকবর বন্দী করে আনারকলিকে হেরেমখানায় নিয়ে যান। সেখানে সেলিমের উপস্থিতিতে আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেবার শাস্তি দেন যেন আনারকলি তিলে তিলে মারা যায়। পরে জানা যায়, সেলিমের অনুরোধে তার দাদী হামিদা অর্থাৎ সম্রাট আকবরের মা আনারকলিকে গোপনে বিষ সরবরাহ করেন, যেন কষ্ট পেয়ে মারা না যেয়ে একেবারে মারা যান।

পাকিস্তানের লাহোরে রয়েছে আনারকলির সমাধি।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত