রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২০

সুনামগঞ্জের উন্নয়ন: অতীত-বর্তমান

সুজাত মনসুর

সুনামগঞ্জের উন্নয়ন নিয়ে ইদানীং বেশ মাতামাতি হচ্ছে। কিছু মানুষের ভাবখানা এই, সুনামগঞ্জের যা কিছু উন্নয়ন তা হয়েছে গত ১০ বছরে এবং সেজন্য কৃতিত্বের দাবিদার মাত্র একজন ব্যক্তি। এতে অবশ্য আশ্চর্য হই না। অতীত বিস্মৃত হওয়া বর্তমানের পদলেহন নীতি ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয় বৈ কিছু নয়। আর এই নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় হয়েছে বলেই যার যা প্রাপ্য নয়, তাকে সব বিশেষনে ভূষিত করি। যারা আজ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কিংবা যুব মহিলা লীগের কলঙ্ক, কিছুদিন আগে এরাই ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কিংবা কিংবদন্তি। এদের পতন হবার সাথে সাথে আর কেউ নামও উচ্চারণ করে না।

ফিরে আসি মূল আলোচনায়। বিষয় সুনামগঞ্জের উন্নয়নঃ অতীত-বর্তমান। যারা বর্তমানের ঢোল পেটাচ্ছেন বিষয়টি মূলত তাদের জন্য। যদিও এর মাধ্যমে অন্যরাও একটু ইতিহাস জেনে নিতে পারবেন। সময়কাল ১৯৭২ থেকে বর্তমান পর্যন্ত। স্বাধীনতার আগে যারা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কপথে যাতায়াত করতেন, তাদের নিশ্চয়ই ভুলে যাবার কথা নয়, ‘মুড়ির টিন’ মার্কা বাস আর খানাখন্দময় রাস্তার কথা। শুধুমাত্র ধারণ পর্যন্ত পাকা রাস্তা ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর চরম যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ভয়াবহ ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার মাঝেও মাত্র দুই বছরে সিলেট-সুনামগঞ্জ রাস্তা পাকা হয়েছিল। তখন মন্ত্রী ছিলেন মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ এবং সুনামগঞ্জ সদরের এমপি ছিলেন মরহুম আব্দুজ জহুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুরের এমপি ছিলেন মরহুম আব্দুর রইস এডভোকেট। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ভূমিকা তো ছিলোই। আগের নেতারা নিজেদের পকেট ভারি না করে, মানুষের কল্যানের কথা চিন্তা করতেন।

আসি পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে। আব্দুস সামাদ আজাদ ৯১ সালে ও ৯৬ সালে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুর থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। ৯৬ সালে পুনরায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ঐ সময়ে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। যদিও ঐসময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সক্ষমতা এখনকার মতো ছিল না। দেশব্যাপী সরকারের সমন্বিত ও সম উন্নয়ন নীতিও ছিল না। তবুও উন্নয়ন হয়েছে। যেমন ধরুণ, পাগলা-জগন্নাথপুর সড়ক। জগন্নাথপুর, রানীগঞ্জ ও আউশকান্দি হয়ে বিশ্বরোড, জগ্ননাথপুর-রসুলগঞ্জ সড়ক উল্লেখযোগ্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত সীমিত সক্ষমতা থাকাসত্বেও প্রত্যম্ত গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এখন তো আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোন মন্ত্রী বা এমপি কোন ধরনের চেষ্টা তদবির না করলেও মুজিববর্ষের মধ্যেই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। ডাবর ও আহসানমারা ব্রিজও ঐসময়ে করা। সুনামগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলার উন্নয়নের ইতিহাসের ব্যাপারে আমার তেমন জানা থাকলেও দিরাই-শাল্লার ব্যাপারে বলতে পারি, যা হয়েছে তা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের আমলেই হয়েছে। বর্তমানে সরকারের সার্বজনীন উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে চোখে পড়ার মতো বিশেষ কোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বরং অতীতে যা হয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক রাস্তাঘাট নাকি চলার অনুপযোগী হবার উপক্রম।

যারা গত দশ বছরের উদাহরণ টেনে কোন বিশেষ ব্যক্তির ঝুড়িতে সকল কৃতিত্ব উজাড় করে দিতে চান, তাদের নিকট বিনীত নিবেদন, সরকারের সার্বজনীন উন্নয়নের বাইরে গিয়ে এমন কোন উন্নয়নের উদাহরণ দিন, যাতে করে আমরাও সমস্বরে বলতে পারি, ‘ ইয়েস, উনিই হলেন উন্নয়নের রূপকার’। তবে, দয়াকরে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ কিংবা সিলেট-ছাতক-সুনামগঞ্জ রেললাইন স্থাপনের কথা বলবেন না। এসবই হলো সরকারের সার্বজনীন উন্নয়নের অংশ। যে এলাকায় আওয়ামী লীগের এমপি বা মন্ত্রী নেই সেসব এলাকায়ও একইভাবে উন্নয়ন হচ্ছে এবং হবে।

আজও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবজেলায় পর্যায়ক্রমে একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। মেডিকেল কলেজের বেলায়ও একই নীতি। নতুন নতুন রেললাইন স্থাপনও সরকারের মহাপরিকল্পনার অংশ। সুতরাং গত দশ বছরের অভাবনীয় উন্নয়নের জন্য কৃতিত্ব একমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যারই প্রাপ্য। এরপর যদি কৃতিত্ব দিতে হয়, দিতে হবে আমাদের প্রয়াত নেতাদের। যারা নীতি, নৈতিকতা ও সততার দিক থেকে আমাদের আদর্শজন। তাঁরা হলেন সুনামগঞ্জের সুনাম।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত