মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় পাইলগাও জমিদার বাড়ি

আনোয়ারা খাতুন

কালক্রমে কত শত জীবন্ত জিনিস ইতিহাসের গর্বে হারিয়ে যায়। তেমনি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে রাজা রসময় চৌধুরীর রাজ বাড়িটি। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলা, পাইলগাও গ্রামে কুশিয়ারা নদীর কোল ঘেষে অত্যান্ত মনোরম পরিবেশে এক সময়ের জৌলুস পূর্ণ রাজ বাড়িটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় রাজা রসময় চৌধুরী এই বাড়িটি রেখে ভারত চলে যান। তার পর থেকে এক সময়ের জমজমাট রাজ বাড়িটি নিরব হয়ে যায় চিরতরে।

ঢাক ঢোল উলুধ্বনি কিছুই আর বাজে না। বসে না মজমাশালা। নূপুরগুঞ্জনে মুগ্ধ হয়ে আসরে চিৎকার করে কেউ বলে না কেয়াবাত, কেয়াবাত। রাজার গান বাজনার সেই প্রিয় ঘরটির ছাদ কষে কষে পড়ছে। প্রজাদের আনাগোনা যে কাছারি ঘরটি একসময় মুখরিত থাকতো, সেটিও একটু একটু করে ভেঙ্গে পড়ছে। মূল পটকে বট আর অশ্বথ গাছ পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠছে। সারা ঘরময় গোবরের স্তুপ। আহা কি বিশ্রী অবস্থা।

প্রত্যেকটা দালান লতা পাতা ঘেরা জঙ্গল। দেখে মনে হয় বহু বছর ধরে ভূতেরা বসবাস করে। দিনের বেলাই গা ছমছম করে উঠে। সাপ জোক নির্বিঘ্নে ঘুরাঘুরি করছে। রাজার বসত ঘরটি আজও দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। কত শত স্মৃতি দেয়ালে মাথা টুকে ক্লান্ত হচ্ছে। মূল ঘরের সামনে এক চিলতে উঠান, তার পরে সান বাঁধানো পুকুরঘাট। ঘাটে দাঁড়ালে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ধারণা করা যায় রানী এই ঘাটেই স্নান সেরে আলতু পায়ে প্রাসাদে প্রবেশ করতেন। তুলসি তলার কোন চিহ্নই নাই। যেখানে মিনতি দাসী সকাল সন্ধায় গলায় আঁচল জড়িয়ে উলুধ্বনি দিতো। স্হানীয় এক বয়স্ক লোক বসির মিয়ার ভাষ্যমতে, বহু বছর ধরে এই বাড়িসহ অসংখ্য জমিজমা মুসলমান এক ভদ্রলোক সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে নিজের মতো ভোগ করছেন। তিনি তার বাবা ময়না মিয়ার কাছ থেকে শুনেছেন, রানী মার তুলসী তলা দাঁড়িয়ে আছে জাম্বুরা গাছ।

রানীর প্রাসাদ দেখে বুঝার উপায় নাই যে, এখানে কোন কালে কোন ভদ্রলোক বাস করতো। পাশেই রাজ বাড়ির রন্ধনশালা। জরাজীর্ণ এই লম্বা ঘরটি শত শত দাস দাসীর সুখ দুঃখের কাহিনীর সাক্ষী হয়ে কালের পরিক্রমা আজও ঠিকে আছে। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠে, না জানি কতো দাস দাসীর পায়ের চিহ্ন লেগে আছে, কতো মানুষের অভিসাপ হেসেলের গরম ধোঁয়ার মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। রান্নার স্বাদ- বিসাদের কারণে মন্ত্রী, নায়েবের চোখ রাঙানি ফুটে আছে।

এতো বেদনার মাঝেও আমি একটি জিনিস দেখে অবাক হয়েছি। রাজ বাড়ির রন্ধনশালার ছালটি ঢেউ খেলানো ইটের বাহারি ডিজাইনে ছাউনি। যা বর্তমানে বহু বিত্তবানেরা সখের বসে বাড়ির ছাদে টিনের চালের আদলে করে থাকেন। অবাক হয়েছি এইভেবে যে, যেটাকে আমরা আধুনিক ভেবে মনের তৃপ্তি মিটাই সেটা আরো তিনশত বছর পূর্বে রাজা জমিদাররা পুরাতন করে রেখে গেছেন। বর্তমানে একটি মুসলিম পরিবার বাসবাস করে। তাদের দেখেও সেলুট করতে ইচ্ছে করে। এমন একটি ভূতুরে পরিবেশে মেয়ে ছেলে নিয়ে কি করে মানুষ এই একবিংশ শতকে বাস করে। বাড়ির চল্লিশ উর্দ্ধো ভদ্র মহিলাকে দেখে বড্ড মায়া হয়। যেখানে প্রচন্ড রোদের মাঝেও অন্ধকার মনে হয় এক চিলতে রোদের মুখ কোথায় গিয়ে দেখে কে জানে।

বাড়ি থকে বেড় হওয়ার কোন রাস্তা নাই। একটা কাঁদা মাখা সরু আইল ধরে হেঁটে কোন রকমে জন মানবের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। এমন সাপ কোপের আড্ডায়, ভূতুরে বাড়িতে কেউ কম দুঃখে থাকে না। যিনি রাজ বাড়িসহ সম্পত্তি লিজ নিয়েছেন তিনি বাস করেন বিভাগীয় শহর সিলেটে। তিনিই এই গরিব পরিবারকে এখানে থাকতে দিয়েছেন, তার অবর্তমানে দেখা শোনা করার জন্য। এই জঙ্গল বাড়িতে বাস করা বড়ই দুঃসাহসের কাজ। রাত বিরাতে কারো অসুখ বিসুখ হলে কি অবস্থা হবে তা কেবল আল্লাই জানেন। এই বিশ্বায়নের যোগেও যেখানে একফোঁটা নেট নেই সেখানে বিপদের রাতে কিভাবে অন্যের সাথে যোগাযোগ করে তা কেবল তারাই জানে।

বাড়ির মহিলাকে দেখে আমার কেবল শরৎ চন্দ্রের বিলাসীর কথাই মনে পড়ছিলো, “এ যে ফুলদানিতে ভিজিয়ে রাখা বাসি ফুলের মতো, এতোটুকু নাড়াচাড়া করলেই ঝরে পড়বে।” ভদ্র মহিলাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা ভয় পান না? তিনি মুখখানা কালো করে ছলছল নয়নে বললেন, আল্লাহর দুনিয়াতে যদি এতোটুকু মাথা গুঁজার ঠাঁই থাকতো তবে কি জীন ভূতের হাতে সন্তানাদির জীবন তুলে দিতাম। সাধে কি আর জঙ্গলে পড়ে থাকি? এখানে কি শুধু জীন ভূতেরাই থাকে? মানুষ ভূতের কি অভাব আছে? ঐ যে কাছারি বাড়ি দেখছো, সেখানে সন্ধা বিকেল থেকেই মদ জোয়ার আসর বসে। কতো রাত অব্দি চলে হিসেব নাই। সমাজে কি মন্দ লোকের কমতি আছে নাকি? এই সেই জেলখানা। যেখানে জড়িয়ে আছে ন্যায় অন্যায়ের কাহিনী। কতো দোষীরা রাজনীতির মার পেচে পাড় পেয়ে গেছে, আর নির্দোষীরা ঝুলেছে ফাঁসির দড়িতে।

কোথায় আজ রাজা মহারাজারা? কোথায় তাদের অত্যাচার জুলুমের ক্ষমতা? যে প্রাসাদের সামনে দিয়ে প্রজারা ছাতা উড়িয়ে, জোতা পায়ে হাঁটতে পারতো না, তাদের নায়েব, সেপাইদের আদাব আদাব কর্তা, আদাব কর্তা বলে তোয়াজ করতে হতো তারা আজ কোথায়? কোথায় তাদের দাপট। পরিত্যক্ত রাজ প্রসাদটি দেখে করুনা হচ্ছে। প্রসাদের প্রতিটা ইট, পাথর যেনো নিরবে কাঁদছে এতোটুকু মুক্তির আশায়। এই সব অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ক্ষমতা চিরকাল থাকে না।

যাক, সব রাজা জমিদার এক রকম না। অনেক মহৎ রাজার কাহিনীও আমাদের ইতিহাস সমৃদ্ধ করে আছে। প্রাসাদের সামনে সুন্দর পুকুরটি দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। কিছু দূরে শিব মন্দির। যেখানে নিয়মিত পূঁজা অর্চনা হতো। আজ সব কিছু কেবলই অতীত। রাজবাড়ির আঙিনা এখন বীজতলা। ছোট ছোট খন্ডে ধানের বীজ রোপন করা হয়েছে। যেখানে ক্ষেতে ক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে রঙ- বেরঙের কাকতাড়ুয়া। বাহারি কাকতাড়ুয়াগুলো বাচ্চাদের বেশ আনন্দ দেয়। লোকজন না থাকলে যা হয় আর কি! পাশেই কুশিয়ারা নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহি রাণীগঞ্জ বাজার। যা রাজা রসময় চৌধুরীর স্ত্রী রাণীর নামে নাম করণ করা হয়েছিলো। রানীগঞ্জ ফেরি ঘাটটি আজও এই অঞ্চলের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম । কুশিয়ারার দুইপাড়ের জনবসতি সংযোগ স্হল এই ফেরি ঘাটটি। যার উপর দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সেতুর নির্মান কাজ চলছে। রাণীগঞ্জের এই সেতিটিকে বলা হয় দক্ষিণে প্রবেশ দ্বার। যা হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনাগন্জের মানুষের জন্য অত্যন্ত সুখের খবর।

সেতুটি চালু হলে ঢাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার সাথে সাথে কয়েক জেলার মানুষের অর্তনৈতিক অবস্হার উন্নতি হবে। কাজেই রাজা রসময় চৌধুরীর রাজ বাড়িটি সংস্কার করলে এই এলাকা হতে পারে এক অপূর্ব সুন্দর দর্শনীয় স্হান। যেখানে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভীড় জমাবে বলে আমার বিশ্বাস। সত্যিই চমৎকার একটি বিকেল কাটালাম।

লেখক- সম্পাদক, অঙ্গজা (সাহিত্য ম্যাগাজিন)


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত