মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

সুনামগঞ্জ জেলার সাচনা হাসপাতালের আত্মকথন

পরিতোষ ঘোষ চৌধুরী

যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি এখন তোমার সব হয়েছে, পর হয়েছি আমি? না না শুধু পর নয়, অবাঞ্চিত- অবহেলিত অযন্তে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছি আমি। কেহ খোঁজও নেয় না আমার। আপনারা অবাক হচ্ছেন! অবাক হবেন না, শুনে নিন আমার কথা।

আমার জন্মসালটা মনে নেই- তবে অনুমান করি বৃটিশ আমলে ১৯৩৫ সাল হইতে ১৯৪০ সাল হবে। ১৯৪০ সালে জামালগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠা হয়। এর আগে ১৯৩৫ সাল থেকে জামালগঞ্জে ভাসমান থানা ছিল। খুব সম্ভবত জামালগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠার আগেই আসাম প্রাদেশিক সরকার সুরমার পুর্বপাড়ে দীর্ঘ পিয়াইনের মোহনায় সাচনা লামাবাজারে আমাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে আমার নাম রাখা হয় ‘সাচনা ডিস্পেনসারী’। সম্পুর্ন আসাম প্যাটার্ন ঘর তৈরী করা হয়। অনেক দূর থেকে খুব সুন্দর দেখা যেত। আমার মনে হয় তখন পুরা জামালগঞ্জে এত সুন্দর স্থাপনা ছিল না।

অনেক বড় বড় ডাক্তার এই হাসপাতাল নিয়োগ পেয়েছেন। সাবেক রেলমন্ত্রী বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান, সুনামগঞ্জ-২ আসনের বারবার নির্বাচিত প্রয়াত সাংসদ বাবু সুরঞ্জিতসেন গুপ্ত এই হাসপাতালেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে নিজেই ১৯৭৯ সালে সাচনাবাজারে এক জনসভায় বলেছিলেন। উনার পিতা দেবেন্দ্রনাথ গুপ্ত এই হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। কিছুকাল পরেই আমাকে ‘সাচনা ডিস্পেনসারী’ না বলে সাচনা হাসপাতাল বলতে শুরু করে সরকার ও জনগণ। ১৯৭৭ সালের পুর্ব পর্যন্ত আমিই ছিলাম জামালগঞ্জ থানার প্রধান হাসপাতাল।

পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের জনগণও আসতেন আমার কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে। নিরলসভাবে আমি চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছি। হাসপাতালে ডাক্তার ও কম্পাউন্ডারদের থাকার জন্য কোয়ার্টারও ছিল। আমার এখানে সর্বশেষ ডাক্তার ছিলেন গিষপতি নন্দন চৌধুরী ও সর্বশেষ কম্পাউন্ডার ছিলেন গোপেন্দ্র আচার্য।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার কোলেই শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ। যুদ্ধের পর আমার পাদদেশে করা হয় শহীদমিনার। ইহাই জামালগঞ্জের কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার। ১৯৭৭ সালে হাসপাতালটি জামালগঞ্জ থানা হে’ড কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি চোখের জল ফেলি। তখন বলা হয়েছিল, এখানে একজন ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। কিন্ত না- অদ্যাবধি কিছুই দেওয়া হয় নাই। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত সেলিমগঞ্জ বাজারে ‘সোনার বাংলা’ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর বর্তমানে পূর্ণ সরকারি হাসপাতালের মর্যাদা পেয়েছে কিন্ত আমার সাথে বিমাতা সুলভ আচরণ করা হয়েছে।

আমার আংগিনায় বড় একটি রেন্টি গাছ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গরমের দিনে এই গাছের ছায়ায় প্রতিদিন কতমানুষ প্রাণ জুড়িয়েছেন । সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলাকে দু,ভাগ করে রেখেছে সুরমা নদী। সুরমার পশ্চিমপাড়ে রয়েছে উপজেলা প্রশাসন সহ তিনটি ইউনিয়ন, জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়ন, ফেনারবাক ইউনিয়ন ও ভীমখালি ইউনিয়ন। অন্যদিকে পুর্বপাড়ে রয়েছে- সাচনাবাজার ইউনিয়ন, বেহেলী ইউনিয়ন ও জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন। এই বৃহৎ এলাকার বৃদ্ধ, শিশু ও মহিলাদের খরস্রোতা সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে জামালগঞ্জে যাওয়া খুব কষ্ট দায়ক। বিশেষ করে কোন প্রসুতি মা অথবা কোন মুমুর্ষ রোগি রাতের বেলা নদী পাড় হওয়া অসম্ভব। তাই আমার মিনতি এখানে একটি ছনের ঘর/ টিনশেড ঘর/পাকা দালানঘর করে সার্বক্ষণিক ১/২ জন ডাক্তার দ্বারা সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা চালু করা হউক। আমার আবেদনটা যেন দুই সংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সহ কতৃপক্ষের নেক নজরে আসে। তবেই আমি শান্তি পাব।

লেখাটি মশিউর রহমান (সুনামগঞ্জ ডটকম) এর শেয়ারকৃত ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত