বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১

সেই চিকিৎসকের প্রতি দুঃখ প্রকাশ মাশরাফির : ফেসবুকে সমালোচনা

২৫ এপ্রিল নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালে গিয়ে বিনা ছুটিতে চার চিকিৎসককে অনুপস্থিত দেখে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের তাগদা দিয়েছিলেন স্থানীয় সাংসদ মাশরাফি বিন মর্তুজা। ঝটিকা সফরের ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর চার চিকিৎসককে প্রথমে কারণ দর্শানো নোটিশ, এরপর সোমবার সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এ ঘটনায় চিকিৎসক সমাজ এবং সমাজের নানা স্তরে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে মাশরাফি বলেছেন, তিনি যে অবস্থান নিয়েছেন সেটিই সঠিক বলে মনে করেন। তবে তার ওই দিনের ফোনালাপের ভাষায় যদি ওই চিকিৎসক কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে তিনি দুঃখিত। সোমবার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে এসব কথা বলেন মাশরাফি।

বিশ্বকাপগামী বাংলাদেশ দলের জার্সি উন্মোচন এবং অফিসিয়াল ফটোসেশনের আয়োজন ছিল এদিন। বিশ্বকাপ সম্পর্কিত নানান প্রশ্নের ফাঁকে অধিনায়ক মাশরাফিকে নড়াইলের চিকিৎসকদের ঘটনাটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। এসময় নড়াইল-২ আসনের এই সাংসদ বলেন, ‘আসলে অল্প কথায় ঘটনাটা বোঝানো সম্ভব নয়। ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। তবে এটুকুই শুধু বলি, সেদিন আমি হাসপাতালে গিয়ে যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে ওই ডাক্তারকে ফোন দিয়েছিলাম। হয়তো আমার ফোনকলের ভাষায় তিনি দুঃখ পেয়েছেন। তারপরও কিন্তু ওনার সঙ্গে আমার তিন থেকে চারবার কথা হয়েছে।

আমি তাকে বলেছি, ‘আমার ভাষায় যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আমি দুঃখিত। আর সেজন্য আমি জনসমক্ষে দুঃখিত বলতে রাজি আছি। কিন্তু যে কারণে আমি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, আমি মনে করি সেটা সঠিক ছিল। এটা থেকে আমি সরে আসবো না।’

হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে হাজিরা খাতা দেখা, স্টোর রুম পরিদর্শন ও চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে যাওয়া মাশরাফি বলেন, ‘ওগুলো যে ভিডিও করা হচ্ছিল, সেটা আমি জানতাম না। পরে যে ভিডিও করেছিল, তাকে অনুরোধ করেছিলাম এটা যেন ফেসবুকে না দেওয়া হয়। কিন্তু আপনারা জানেন আমাদের সমাজব্যবস্থা যে ধরনের…ভিডিওটা ভাইরাল হওয়া থেকে আটকাতে পারি নাই।’

হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসককে না পেয়ে ফোনে হুমকি-ধমকি দেয়ায় স্থানীয় সাংসদ ও জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার সমালোচনা করেছেন অনেকেই। চিকিৎসক ও নাগরিক টিভির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আবদুন নুর তুষার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘চিকিৎসক কর্মস্থলে যায় না, সেটার জন্য নিয়মানুযায়ী শাস্তি হবে, প্রতিকার হবে, হোক। কিন্তু তাকে ধমকানো তো সরকারী বিধান নয়। প্রশ্ন করেন, সবার ডিউটি আট ঘন্টা । সপ্তাহে ৫ দিন। চিকিৎসক কেন ৬ দিন? কোন সরকারী আইনে এটা করা হচ্ছে? ডাক্তারদের অন্যায় থাকলে সেটার শাস্তি হোক। কিন্তু এলাকার লোককে তো স্বাস্থ্য সেবা দিতে হবে। তাই প্রশ্ন করতেই হবে। উত্তরও দরকারী। ডাক্তার কোন ফেরেশতা না। কিন্তু সবখানে অনিয়ম রেখে হাসপাতালকে শুধু স্বর্গোদ্যান বানানো সম্ভব না। আল্লাহ আপনাকে আরো বড় করুক। এত বড় যাতে আপনি একদিন এসব প্রশ্ন করতে পারেন সংসদে।’

তবে মাশরাফির দুঃখ প্রকাশের পর অনেকেই সেটিকে ভুল হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, দুঃখ প্রকাশের পর আর সেটিকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক হবে না। জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ডা. জুনায়েদ আহমেদ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নিজ আচরণের জন্য মিডিয়াতে দু:খ প্রকাশ করেছেন ম্যাশ। প্রকাশিত সবকিছুই যার মানবিক, তার দু একটি ভুল শব্দ চয়নের জন্য আমরা এতটা অধৈর্য্য না হলেও পারতাম। যে যাই বলি আমরা, “কইসি তো, কী করবি” টাইপ বর্তমান সমাজে এরকম জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাবান একজন ব্যক্তিত্ব যখন নিজ ভুল বুঝতে পারেন এবং আন্তরিক ক্ষমা চেয়ে ডাক্তার দের এতটুকু সম্মানিত করতে পারেন, তখন এই লোকটির দু একটি কটু কথা শুনতে আমার মন্দ লাগবে না। অথচ আপনার কোন স্বজাতি নেতাও তো পাবলিক ডোমেইনে আপনাকে সম্মানিত করতে দু একবার ঢোক গিলে নেয়। চিন্তা আর মননশীলতায় উন্নত হয়ে মানবিক হলে, সম্মান আপনা আপনি ই আসবে। সম্মান কোন ডিগ্রি নয়, দিনরাত পড়াশুনা করে অর্জন করে ফেলবেন। আমাদের মত দেশে ডাক্তার হিসেবে আপনার সাফল্য, কতটুকু বড় ডিগ্রিধারীর চেয়ে কতটুকু মানবিক ডাক্তার আপনি, তার ওপরই বেশী নির্ভর করে। অনিয়ম আর দূর্নীতি প্রতিটি সেক্টরেই আছে। একজন ডাক্তার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি, সব পেশার লোকের চেয়ে ডাক্তাররাই সবচেয়ে বেশী কর্তব্যপরায়ণ এবং মানবিক। তবুও আত্মশুদ্ধির বিকল্প নেই।’

এদিকে চিকিৎসকদের প্রতি তার সবসময়ই  শ্রদ্ধাবোধ ছিল ও আছে উল্লেখ করে মাশরাফি বলেন, ‘আমার পরিবারেও ডাক্তার আছেন। আমি ডাক্তারদের কী পরিমাণ শ্রদ্ধা ও সম্মান করি সেটা আপনারা অতীতেও দেখেছেন। তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এখনো আগের মতোই আছে।’


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত