সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

সেই বেশি চায়, যার আছে ভুরি ভুরি

হাসান হামিদ

এই যে করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে কত মানুষ পথে বসলো, কত জন চাকরি হারালো, ব্যবসায়ীরা প্রায় না খাওয়া; তারপরও এক শ্রেণির কিন্তু কিছু আসলো গেলো না। তাদের দেদারছে প্রমোশন হচ্ছে, ইনক্রিমেন্ট-বোনাস সবই ঠিকঠাক। এরা হলেন আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীবৃন্দ। সব সুবিধার পরও এই মহামারিতে প্রকল্পের টাকার লুটপাটেও তাদের একটি অংশ দারুণ তৎপর! কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! আজকের পত্রিকায় দেখলাম, সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেশের ২২ জেলার অন্তত ৩৬টি উপজেলায় ঘর নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও ঘর নির্মাণের পর তা ভেঙে যাচ্ছে, আবার কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল। ঘর দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রকল্পের কাজে দুর্নীতির এ খবর নতুন নয়। কখনোই শাস্তি না পাওয়া, ঠিকমতো দেখভাল না করা, সরকারের সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় আজকের এ হাল হয়েছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্প মূলত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, যার মাধ্যমে গৃহহীন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ করা হয়। যুগ্ম সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন এই প্রকল্পের প্রধান। এই প্রকল্পের ইতিহাস খুব পুরোনো নয়। আমরা জানি, কক্সবাজারসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বেশ কিছু এলাকায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। তখন সেখানকার বহু পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। এরপর আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐ এলাকাগুলো পরিদর্শনে যান। তিনি সেখানকার মানুষের দুর্দশা দেখে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন এবং সকল গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের তাৎক্ষনিক নির্দেশ দেন। এরপর সে বছরই ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৮৪০.৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯৮,২৪৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন-অসহায়-ছিন্নমূল পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আয়বর্ধক পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে ২৭৫,৬৫৬ জনকে। আর ১৩৮,৭১৮টি পরিবারকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। জানতে পেরেছি, সবুজায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি প্রকল্পগ্রামে ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ করা হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রকল্পগ্রামে বসবাসরত উপকারভোগীদের জীবনমান সহজীকরণের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে ‘নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ কর্মসূচি’র আওতায় ১৪৩,৭৭৭টি পরিবারকে তাদের নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের জন্য ২৩৪টি টং ঘর ও বিশেষ ডিজানের ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য অতি মহৎ। সমস্যা হলো এর দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকে চোর আর দুর্নীতিবাজ হওয়ায় এর মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল, অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন; ঋণ প্রদান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে সক্ষম করে তোলা এবং আয়বর্ধক কার্যক্রম সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, গত বছর মার্চ মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের একটি মানুষও গৃহহীন বা ভূমিহীন থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর সারা দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। আর বঙ্গবন্ধু কন্যার স্বপ্নের এই প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ভূমি ও গৃহহীন আট লাখ পঁচাশি হাজার ছয়শো বাইশটি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার হিসেবে প্রতিটি গৃহহীন-ভূমিহীন পরিবারই পাচ্ছে দুর্যোগ-সহনীয় একটি বাড়ির মালিকানা। এর মধ্যে এক লাখ আঠারো হাজার তিনশো আশি জন ভূমিহীন পরিবারকে বাড়ি করে দিয়েছে বর্তমান সরকার।আর সরকারের এই শুভ উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে কিছুসংখ্যক মানুষের কারণে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, অনেকের অভিযোগ, এসব ঘর তৈরিতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি অনেক ঘরের জানালার পাল্লা পর্যন্ত লাগানো হয়নি। ঘরের দেয়াল এদিক সেদিক ফেটে যাচ্ছে। আর ঘর হস্তান্তরের শুরু থেকে কারো কারো ঘরে ছিল না পানি ও বৈদ্যুতিক সংযোগের ব্যবস্থা। বর্ষা শুরুর পর কিছু এলাকায় ঘর ভেঙে গেছে। তাছাড়া আরও অভিযোগ আছে।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী যেখানে এসব ঘর কেবল সমাজের হতদরিদ্রদেরই পাওয়ার কথা, সেখানে দেশের কোনো কোনো স্থানে তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বরাদ্দ নিয়েছেন। এর ফলে গৃহহীন দরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরির যে উদ্যোগ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন, আজ কিছু দুর্নীতিবাজের কারণে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে চলেছে। পত্রিকায় দেখলাম, মোট ২২ জেলার ৩৬টি উপজেলায় ঘর নির্মাণে নানা অভিযোগ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসনের পাঁচ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে বলে জেনেছি।

আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ কাজকর্মে উদাসীন। তারা যতটা প্রমোশন আর ইনক্রিমেন্টের চিন্তায় ব্যাকুল থাকেন, ততটা সিরিয়াস কাজের প্রতি থাকেন না। অনেক কৃষক তার সমস্যা নিয়ে ঘুরেন, কিন্তু ইউএনও-এর দরজার ভেতরে যাবেন সেই পরিবেশ খুব কম অফিসেই আছে। ভালো কর্মকর্তাও আছেন, কিন্তু কম। এই যে আশ্রয়ণ প্রকল্পে সমস্যা হলো, মনিটরিং ব্যবস্থা ঠিক থাকলে শুরুতেই এই অনিয়ম ঠেকানো যেত৷ যতদূর বুঝতে পেরেছি, প্রকল্পের এই ঘরগুলোর সাথে প্রধানমন্ত্রীর আবেগ জড়িত৷ মুজিব শতবর্ষে উপহার হিসেবে তিনি গৃহহীনদের এসব ঘর দিয়েছেন৷ তাই শুধু ওএসডি করলে হবে না, যারা এই অনিয়মের সাথে জড়িত তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে৷ দুদকেরও এটা দেখা উচিত৷ দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচার হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করতে অন্যরা সাহস পাবে না।

শুনেছি মাঠ পর্যায়ে কাজটির দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটিকে। এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন উপজেলা প্রকৌশলী, এসি ল্যান্ড, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। যেহেতু কমিটিতে শুধু ইউএনওরা ছিলেন না, তাই বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। এই প্রকল্পের কাজই হলো ঘর বানানো। আর ঘর নির্মাণ একটি টেকনিক্যাল কাজ। ভাবনায় আসে না, কেন এই ধরনের টেকনিক্যাল কাজ ইউএনওদের মাধ্যমে করাতে হলো? উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওরা তো সব কাজেরই সমন্বয় করেন। টেকনিক্যাল কাজটি তো প্রকৌশল বিভাগের। তাদেরকে মূল দায়িত্ব দেওয়া যেতো। এ দেশের গরিবদের নাম ভাঙিয়ে সরকারের টাকায় দুর্বৃত্তদের ভাগ বসানো কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

*লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত