সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০

সেশনজট থেকে মুক্তি চান আগামীর ডাক্তাররা

হাসান হামিদ

পৃথিবীজুড়ে সংক্রামক করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশে করোনা বিস্তারের অষ্টম মাস চলছে। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, এর মধ্যে কেউ কেউ যুক্ত হচ্ছে মৃতের মিছিলে। করোনার বিস্তার রোধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা হলেও কার্যত এখন পুরোদমে চলছে বলেই আমার মনে হয়। অবশ্য প্রায় সব শিক্ষা কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে আমাদের এখানে। এরই মাঝে প্রাথমিক ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষাসহ স্কুল-কলেজের সব পরীক্ষায় অটো প্রমোশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এইচএসসি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও নেওয়া হবে না, তাতে বিকল্প মূল্যায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

করোনার এই সময়ে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিবিষয়ক নানা পরিকল্পনার কথা আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের মতো করে মূল্যায়নের চিন্তা করছে বলে খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু মেডিক্যাল শিক্ষার্থী যারা এদেশে আগামীতে ডাক্তার হবে, তাদের লম্বা একটা সময় অপচয়ের ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যথা দেখছি না। মেডিক্যাল কলেজগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমে সেশনজট বিষয়টি তীব্রভাবে সব শিক্ষার্থীকে ভোগাবে। সেই সাথে আমরা কয়েক হাজার ডাক্তার দেরিতে পাবো। দেশে সামনেই একটা সময় আসন্ন যেখানে মেডিক্যালে ইন্টার্ন ডাক্তারের সংকট দেখা দেবে। আর এজন্য সেশনজট থেকে তাদের বাঁচাতে হবে দেশের স্বার্থেই। আমাদের ভাবতে হবে, মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের সেশনজটমুক্ত করতে হবে অনেকগুলো জীবন বাঁচানোর জন্যই। এ শিক্ষাকে অবহেলা করে আমরা নানা দূষণের এই পৃথিবীতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাব না, কখনোই না।

খোঁজ নিয়ে জেনেছি, এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করতে সব মিলিয়ে ইন্টার্নিসহ ছয় বছরের বেশি সময় লেগে যায়। পরীক্ষার সিস্টেম হচ্ছে প্রতিটা চাপ্টার পড়ানোর পর আইটেম দিতে হয়। ভাইবার মতো। অনেকগুলো আইটেম ক্লিয়ার করে কার্ড দিতে হয়। আবার কার্ড ক্লিয়ার হলে এরপর টার্ম। যদি টার্ম ক্লিয়ার থাকে তাহলে তাকে প্রফের জন্য ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়। এজন্য ৭৫% এটেন্ডেন্স কাউন্ট করা হয় স্ট্রিক্টলি। টার্ম প্রফ পরীক্ষায় আবার তিনটা পার্ট থাকে। রিটেন, ভাইবা, অসপি এবং প্র‍্যাক্টিকাল। যেকোনো বিষয়ে পাসের জন্য এই তিনটাতেই আলাদা আলাদা ৬০% নম্বর পেতে হয়। যদি কোন একটায় ৬০% এর কম আসে তাহলে ওই বিষয়ে আবার পরীক্ষা দিতে হবে পুরোটাই।

প্রফ পরীক্ষা (ইয়ার ফাইনাল) হয় মে মাসে। করোনার জন্য এ বছর সবকিছুই মার্চ মাসে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এর আগেই মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের আইটেম কার্ড টার্ম ক্লিয়ার করা শেষ। শুধু প্রফ দেয়া বাকি ছিল ১ম, ২য় আর ৩য় প্রফের স্টুডেন্টদের। এরপর দীর্ঘ সাত মাসের বন্ধ। শুরুতে কয়েকদিন অনলাইন ক্লাসে সেই পুরোনো পড়া পড়ানো হয় তাদের। আদতে গত সাত মাস ধরে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে আছে। নেক্সট ফেজের কোন ক্লাস শুরু হয়নি। এখন যে প্রফ মে মাসে নেওয়ার কথা ছিল, সেই প্রফ ডিসেম্বরে নেওয়ার কথা হচ্ছে। আবার শিক্ষার্থীদের এক্সামের আগে বন্ড সাইন করতে বলা হয়েছে বলে জেনেছি। বন্ড হলো, সে যদি পরীক্ষার ৭ দিন আগে করোনা পজিটিভ হয়, বা পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে পজিটিভ আসে পরীক্ষার্থী নিজ থেকেই আর অংশগ্রহণ করবে না। আরো ৬ মাস পরে সাপ্লিমেন্টারী পরীক্ষার জন্য ওয়েট করবে।

এখন প্রশ্ন হলো, করোনার মধ্যে সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা যদি বন্ধ থাকে, তবে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের প্রফ দিতে হবে কেন? আর যদি করোনার মধ্যে প্রফ নিতেই হয় তবে কেন ৭ মাস বসিয়ে রাখার পর এই সিদ্ধান্ত জানানো হলো? এখন যদি এক্সাম নেয়া হয় তাহলে আরো ৪ মাসের মত সময় লাগবে। এজন্য তারা পরবর্তী ফেজের ক্লাসের জন্য সময় কম পাবে। মানে তাদের ৭ মাস, আরো ৪ মাস অর্থাৎ মোট ১১ মাস যাবে। আর যারা ১ম, ২য় প্রফ পরীক্ষার্থী আছে তারা যদি এখন ডিসেম্বরে একটা প্রফ দেয় যেটা মে মাসে হওয়ার কথা ছিল, তাহলে ওরা নেক্সট প্রফের জন্য মাত্র ৪ মাস সময় পাবে। কারণ ওদের নেক্সট ডিউ প্রফ মে, ২০২১ সালে। আর যারা বেসরকারি মেডিক্যাল পড়ছে তারা গত ৭ মাস ধরে ক্লাস না করেও বেতন দিয়ে যাচ্ছে, যা ৮-১২ হাজারের মত প্রতিমাসে। ভাবা যায়?

তারচেয়ে বড় কথা হলো, করোনাকাল ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ সবচেয়ে প্রকট হবে। এমতাবস্থায় যদি পরীক্ষা নেয়ার কথা ভাবাও হয়, তা কতটা যুক্তিযুক্ত? আর পরীক্ষা যদি করোনার তীব্র ঝুঁকির মধ্যেই দিতে হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত ৭ মাস আগেই নেয়া দরকার ছিল না? কেননা এখন মোটামুটি সবাই জানি, আসছে শীতে মানে করোনার সেকেন্ড ওয়েব আসবে। মেডিক্যাল কলেজগুলোর হোস্টেল হসপিটালের পাশেই। সেইসব ব্যবস্থাপনা আর পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষার নীতিনির্ধারকেরা কিছু কি ভাবছেন? কারণ, করোনা নামের এই ভাইরাস দীর্ঘদিন পৃথিবীতে থাকতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কোভিড-১৯ এখন বিশ্বের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রথম ধাপে রয়েছে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে বিশ্বের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ আক্রান্ত হয়েছিল। সেই সময় প্রথম ধাপে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে স্প্যানিশ ফ্লুর আক্রমণ মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আর করোনাভাইরাসের স্বভাব অনেকটা স্প্যানিশ ফ্লুর মতো মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবরে পড়েছি, মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ড ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’কে বলেছেন, আগামী শীত মৌসুমে ভাইরাসটির আক্রমণ আরও বেশি কঠিন হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। তার মানে এটি লম্বা সময় ধরে থাকার এবং পরবর্তী ধাপে পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের মেডিক্যাল শিক্ষাপঞ্জিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আগামী অক্টোবর এবং নভেম্বরে ইউরোপের অনেক দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে। এসব দেশের মধ্যে আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিক, বেলজিয়াম, ইতালি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পোলান্ড, নেদারল্যান্ড, স্পেন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের মধ্যেই রয়েছে এখন পর্যন্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন শীতে করোনার ভাইরাস দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশংকা করেছেন। এর যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। চীনে যখন করোনা ভাইরাস মহামারী রূপ নেয় তখন সেদেশে প্রচন্ড শীত ছিল। তাপমাত্রা ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে শীত রয়েছে, সেখানে করোনা সংক্রমণ বাড়ে, আবার কমেও। গরমে আমাদের দেশে করোনা সংক্রমন কমার কথা ছিল। কিন্তু কমেনি। তবে কোন সময় এই ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে কিংবা কমে সেটা এখনো গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে। তবে শীত মৌসুমে যেহেতু এদেশে বেশি ভাইরাসজনিত রোগ দেখা দেয়, তাই এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।

সবচেয়ে খারাপ লাগছে এটা ভেবে, এই দীর্ঘ সাত মাসে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রানলয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়, বিএমডিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেউই ভাবেনি। সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ধাপের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেশনজটের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে বলে আমার বিশ্বাস। আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা মে মাসের পেশাগত পরীক্ষার পরীক্ষার্থী ছিল, তারা প্রায় সবাই উপরে উল্লেখিত ধাপগুলো অতিক্রম করে পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ কারণে অটোপ্রমোশন দিয়ে তাদের পরিবরর্তী ধাপের পড়ালেখা শুরুর নির্দেশনা দেওয়া সম্পূর্ণ যুক্তিপূর্ণ বলেই আমি মনে করি। আর তা না হয়ে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়লে দেশ একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তীব্র ইন্টার্ন সংকটেও পড়বে।

খবরে দেখলাম, অটো প্রমোশন ও সেশনজটমুক্ত শিক্ষাবর্ষের দাবিতে মানববন্ধন করেছে সিলেটের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থীরা। গত শনিবার বিকেলে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট বিভাগের ৬টি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের কয়েকশো শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা জানান, করোনা মহামারিতে যখন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা বাতিল করা হচ্ছে সেখানে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের প্রফ পরীক্ষার নেওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অবিলম্বে তা বাতিল করে বিকল্প বা অটো প্রমোশন দেয়ার দাবি জানান তারা। সেই সাথে সেশনজট পরিহার করতে অনতিবিলম্বে অনলাইন ক্লাস শুরুরও দাবি তাদের। সারাদেশেই মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের এই দাবি। করোনার এই সময়ে তাদের যেন রাস্তায় নামতে না হয়, কর্তৃপক্ষ আশাকরি ভাববেন।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ আরো অনেক আগেই এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের অটোপ্রমোশনের মাধ্যমে পরবর্তী ধাপের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে৷ সম্প্রতি কেমব্রিজেও অটোপ্রমোশন দিয়ে মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ধাপে উন্নিত করা হয়েছে। তাহলে আমাদের মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা কেন পিছিয়ে থাকবে?


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত