সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

হজের কিছু মৌলিক বিষয়, শিক্ষা ও দর্শন

মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

মহান আল্লাহ বলেন, সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। সুতরাং লোকেরা যেন এ ঘরের (কাবা) হজ অথবা ওমরাহ করে এ দুটির মধ্যে যাতায়াত করলে তাঁর কোনো পাপ নেই। (আল-কোরআন, ২ : ১৫৮) আল্লাহপাক আরও বলেন, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ সুসম্পন্ন কর। (আল-কোরআন, ২ : ১৯৬) ইসলামী বিশেষজ্ঞ, ফকিহ ও মোহাদ্দেসিন হজকে ইসলামের পঞ্চম রোকন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত ইহরাম বাঁধা অবস্থায় আরাফাত, মুজদালিফা, মিনায় কংকর নিক্ষেপ, কাবাঘর তাওয়াফকরণ, সাফা-মারওয়া পাহাড় সাঈকরণ, কোরবানি করা এবং সবশেষে মাথার চুল মুণ্ডন বা কর্তন করার ইচ্ছা বা সংকল্পকেই মূলত হজ বলে। এমন সংকল্প থেকে মানুষ যাতে নিজেকে বঞ্চিত না করে তার জন্য আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, মানুষের ওপর আল্লাহ পাকের হক এই যে, এ কাবাঘর পর্যন্ত আসার সামর্থ্য যাদের আছে, তারা হজ করার জন্য এখানে আসবে। যারা কুফরি করবে (অর্থাৎ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ করতে আসবে না) তারা জেনে রাখুক যে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের মুখাপেক্ষী নয়। (আল-কোরআন, ২ :৯৭)

হজের কিছু মৌলিক বিষয় হলো- ১. হজের নিয়ত, ২. ইহরাম বাঁধা, ৩. আরাফাতের মাঠে অবস্থান, ৪. মুজদালিফায় রাতযাপন, ৫. মিনায় অবস্থান এবং শয়তানের প্রতি কংকর নিক্ষেপ, ৬. কাবাঘর তাওয়াফ, ৭. হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর)-এ চুমু দেওয়া, ৮. সাফা-মারওয়ায় সাঈকরণ, ৯. কোরবানি করা, ১০. মাথার চুল মুণ্ডন বা কর্তন। মহানবী (সা.) সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হজ পালনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে ইরশাদ করেন, বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার পাথেয় ও সফরের উপকরণ থাকা সত্ত্বেও যে হজ পালন না করে সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক কিংবা নাসারা হয়ে মরুক। (মিশকাত)

হজের শিক্ষা: হজের ইহরামের মাধ্যমে মানব জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি যে এক খণ্ড সাদা কাপড় পরে আল্লাহ পাকের দিকেই প্রত্যাবর্তন- এ সত্যকে জীবন্ত করে তুলে ধরা হয়েছে। কালো পাথরের স্পর্শ ও এর প্রতি ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাওয়াফ শুরু করার দ্বারা অন্য সবকিছুর আনুগত্য ও গোলামি প্রত্যাখ্যান করে এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে বা জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হতে হবে মুসলিম উম্মাহর সারাজীবনের একমাত্র কর্মপ্রচেষ্টা। সা-ঈ বা দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার দৌড়ানোর মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমানকে নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে তার জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাতে গমন, সেখানে সকল হাজির দিনের বেলায় অবস্থানের মাধ্যমে মানব সৃষ্টির সূচনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদকে মানবজাতির কল্যাণে নিয়োগ করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ, মুজদালিফায় রাতে অবস্থানের দ্বারা (ইবাদত-বন্দেগি) চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়ন ঘটানো, যাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুফলকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে তথা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়।

মানুষের মধ্যকার আমিত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতারূপী শয়তানকে পরাজিত করা ও আল্লাহপ্রেম তথা মানবপ্রেমকে জাগিয়ে তোলার জন্য ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মুজদালিফায় সংগৃহীত ৭০টি পাথররূপী বুলেট মিনায় অবস্থিত তিনটি শয়তানি প্রতীকে নিক্ষেপের মাধ্যমে শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সদা সক্রিয় থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ পাথর মারাই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইব্রাহিমি পন্থায় বিজয় বা কোরবানি ঈদ উৎসবের মাধ্যমে সেদিনই উদযাপিত হয়ে থাকে।

হজের মাধ্যমে আসা পরহেজগারির পূর্ণতাই অন্যকে সৎকাজের আদেশদান এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় করে তোলে। হজের মহাসম্মেলন স্পষ্টত প্রমাণ করে, দীন সমস্ত দুনিয়ার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যকার বিভেদ-বিভ্রান্তি ও অনৈক্যের কারণগুলো হজের দর্শনের পরিপন্থি। তাই হজই হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার একমাত্র সঠিক এবং সামগ্রিক শিক্ষা। দুনিয়ায় যাঁরাই এক আল্লাহর বন্দেগি করতে চাইবেন এবং বাস্তব কর্মজীবনে তাঁর আনুগত্য করে চলবেন, তাঁরা যে জাতি আর যে দেশেরই অধিবাসী হোক না কেন সকলেই একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে প্রতি বছর এসে সমবেত হবে; এ জন্য হজ করার পন্থা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, চাকা যেমন নিজ অক্ষের চারদিকে ঘুরে, মুসলমানদের জীবনেও তেমনি আপন কেন্দ্রেরই চারদিকে আবর্তিত হয়- এই গূঢ় রহস্যেরই বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে হজ।

সমতা, ন্যায়বিচার ও শান্তি: পবিত্র হজ পালনের মাধ্যমে মুসলমানরা ইনসাফ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সাম্য ও সমতার অনুশীলন করে। এ উপলক্ষে তাদের কিছু সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান ও আহকাম পালন করতে হয়। হজের জন্য তাদের সাদা পোশাক পরিধান করতে হয়। মুসলমানদের মাঝে বর্ণ, জাতীয়তা, ভাষা, সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহর সামনে সবাই সমান।

পাপ থেকে মুক্তি: সৎ উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহপাকের ভালোবাসার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে হজ সম্পাদন করলে একজন হাজি পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা সহকারে এবং পাপমুক্তভাবে সগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি এই (কাবা) ঘরের হজ করল এবং কোনোরূপ অশ্নীল ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়নি, সে তার জন্মদিনের মতো নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে যায়।’

এক উম্মাহ বা এক সম্প্রদায়: গোটা বিশ্বের মুসলমানদের নিয়ে এক মুসলিম উম্মাহ গঠিত। তাদের বাধ্যবাধকতা ও বিধিবিধান যেমন এক, তেমনি তাদের দায়িত্বও অভিন্ন। মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চিতই তোমাদের এ উম্মত প্রকৃতপক্ষে একই উম্মত। আর আল্লাহ তোমাদের রব। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর। (আল-কোরআন, ৯ :১০৫) সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদের একই সময়ে এবং একই স্থানে পবিত্র হজব্রত পালন করতে হয়। এ সময় একজনকে অন্যজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নশীল থাকতে হয়।

ওয়াদাসহ প্রত্যাবর্তন: হজ সম্পাদন শেষে একজন হাজি আল্লাহপাকের ভালোবাসা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করার এক পরিপূর্ণ উদ্দেশ্য ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে সগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি প্রতিদিন তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ্য রাখেন। তিনি সকল প্রকার খারাপ আচরণ ও অশ্নীল কার্যক্রম থেকে বিরত থাকেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত ও বলিষ্ঠ হয়। তিনি সকলের সেবা ও কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়োগ করেন এবং উদ্যোগী হন। অথচ তিনি থাকেন অত্যন্ত বিনয়ী, হৃদয়বান ও বন্ধুবৎসল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, ‘হে নবী! এই লোকদের বলে দিন যে, তোমরা আমল করো; আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনগণ সকলেই লক্ষ্য করবে যে তারপর তোমাদের কর্মনীতি কি রূপ হয়।’ (আল-কোরআন, ২১ :৯)

মদিনা শরিফে জিয়ারত: রাসুল (সা.)-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করা হজের অবধারিত কোনো অংশ নয়। কিন্তু রাসুলের মুখনিসৃত নিল্ফেম্নাক্ত বাণীসমূহ থেকেই আমরা বুঝতে পারব যে, মদিনা মুনাওয়ারার রওজা জিয়ারত মোমিনদের জন্য কতটুকু গুরুত্ব বহন করে। রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করবে, সে কেয়ামতের মাঠে আমার আশপাশে থাকবে। (মিশকাত) যে ব্যক্তি হজ সম্পন্ন করল এবং আমার মৃত্যুর পর আমার কবর জিয়ারত করল সে যেন জীবদ্দশায়ই আমার জিয়ারত করল। (মিশকাত) যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, আমার ওপর তার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল। (ফাতুহুল কাদির) আমার মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে হারাম ব্যতীত অপরাপর মসজিদের তুলনায় এক হাজার ওয়াক্তের নামাজ অপেক্ষা উত্তম। (মিশকাত)

সুতরাং প্রত্যেক মোমিন হজের সময় মদিনার রওজার রহমত ও বরকত দেখে ধন্য হয়েই হজের পূর্ণতা পেতে পারেন। তাই জিয়ারতের জন্য হাজিদের মদিনায় ৮ দিন সময় দিতে হয়। তা ছাড়া ইমানের প্রশ্নেও তাঁর প্রতি ভালোবাসার যে হাদিস এসেছে, সে কারণেও একজন হাজিকে মদিনার রওজায় যেতে হয়। রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার পিতা, সন্তান ও যাবতীয় লোকজন হতে আমাকে অধিক ভালোবাসতে না পারবে সে পূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না (বুখারি ও মুসলিম)।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন: চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.