বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

হাওরবাসীর স্বাস্থ্য সমাচার : কিছু সুপারিশ

হাসান হামিদ

বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি রয়েছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ বিষয়টি গুরুত্ব পায় অনেক দিন আগে, সেই ১৯৭৮ সালে। অথচ বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষার কিছু প্রতিবেদনে হাওরের স্বাস্থ্য সমস্যার বর্তমানের যে চিত্র ওঠে এসেছে, তা রীতিমতো হতাশ করেছে অনেককে। আমাদের বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের সূচকগুলো কাঙ্খিত সময়ের মধ্যে পূরণকল্পে নানা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অন্যতম একটি সূচক হলো স্বাস্থ্যগত অবস্থার উন্নয়ন। অথচ হাওর এলাকায় এখনও স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সুবিধাদি উল্লেখযোগ্য মানে পৌঁছায়নি। কিন্তু হাওরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন অবহেলায় রেখে সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আরেকটি ব্যাপার খুব গুরুত্বপুর্ণ। সেটি হলো হাওরাঞ্চলের নীতি, পরিকল্পনা, বার্ষিক প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষক ও জেলেদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে করে এসব কাজে হাওরবাসীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নে কাঙ্খিত অবদান রাখা যায়।

আমাদের দেশের মোট আয়তনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে হাওর ও জলাভূমি। এসব হাওরাঞ্চল জীব বৈচিত্র্য, মৎস্য সম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। সারাদেশে জলাভূমির পরিমাণ প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন হেক্টর। এসব এলাকাকে মিঠাপানির অঞ্চল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। আর দেশের বেশির ভাগ হাওরের অবস্থান সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরের কিছু স্বাস্থ্য চিত্র নিয়ে আজকের এই লেখা।

ছোটবেলা হাওরে বড় হবার সুবাধে আমি জানি, এখানকার মানুষজন সাধারণত কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরে তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ৪১.৭ শতাংশ মানুষ মৎস্য খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট (IUCN 2015)। এই এলাকার মানুষ কম শিক্ষিত। সেই জন্য সচেতনতাও কম। আর এ কারণেই স্বাস্থ্য সুবিধার ক্ষেত্রে হাওরের মানুষ ঔষধী লতাপাতা, কবিরাজী ও গ্রাম্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের-২০২১ রূপকল্প অনুযায়ী, ২০১১ সালের মধ্যেই সবার জন্য বিশুদ্ধ পানির সংস্থান এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রত্যেক বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা থাকার কথা (BBS, 2017) কিন্তু সামাজিক অবস্থা, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত কারণে সারাদেশে সমউনড়বয়ন সম্ভবপর না হওয়ার কারণে এই ২০১৯ সালে এসেও আমরা সেই কাঙ্খিত মানে নিজেদের দাঁড় করাতে পারিনি। তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়নি তা নয়, তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন স্বপ্নের তুলনায় নিতান্ত কম। অবশ্য জাতীয় পর্যায়ে ভাবলে বলা যায়, ১৯৯৫ সালে যেখানে এদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫৮.৭ বছর, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সালে ৭১.৬ বছর হয়েছে। তাছাড়া শিশু মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছ। তবে গ্রাম বা হাওর এলাকায় জাতীয় উন্নয়নের হারে এগুতে পারেনি বা এর নানা প্রতিকূলতাও অস্বীকার করা যাবে না। তবে এসব এলাকার প্রতি উদাসীনতাও যে নেই, তা কিন্তু নয়। যে এলাকা দুর্বল সেই অঞ্চলে বেশি নজর দিতে হয়, সেটি সম্ভবত ঠিকঠাক হচ্ছে না। আর সেজন্যই গ্রাম এলাকায় প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার ২০.৯, যা জাতীয় পর্যায়ে ১৮.৭ (উন্নয়ন সমীক্ষা, ২০১৭)। সুনামগঞ্জের প্রায় পুরোটাই যেহেতু হাওরাঞ্চল সেহেতু এসব এলাকা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যান্য অঞ্চল থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এর পেছনে নানাবিধ কারণও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি হারের কথা বলা যায়। এ পদ্ধতি গ্রহণের হার যেখানে জাতীয় পর্যায়ে ৫৮.৩ শতাংশ সেখানে সিলেট অঞ্চলে তা ৪২.৮ শতাংশ। আর হাওর এলাকায় এ হার আরও অনেক কম (BBS, 2017) ।

হাওর এদেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের অন্যতম। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল, ভাটি এলাকা, পাহাড়ী অঞ্চল, ক্ষুদ্রনৃতাত্তিক গোষ্ঠী এবং সর্বোপরি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবার ধরন প্রায় কাছাকাছি। তবে হাওরপাড়ের মানুষজনের মধ্যে ঔষধি গাছগাছালি ও কবিরাজের প্রভাব বেশি লক্ষণীয়। ছোটবেলায় দেখেছি, হাওরের মানুষজন প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। আর এ অঞ্চলের মানুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সেবা নিতে চায় না। আমার কাছে মনে হয়, আগাম বন্যা, ফসলহানি, বর্ষাকালে পয়নিষ্কাশনের নাজুকতা, অসচেতনতা ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি কারণে হাওরের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে তেমন আগ্রহী হয় না।

পিছিয়ে পড়া হাওরের জনগোষ্ঠী আধুনিক শিক্ষা ও সুযোগ সুবিধা থেকে কিছুটা বঞ্চিত। তাই স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের সিদ্ধান্ত কুসংস্কার, প্রথা, ধ্যান-ধারণা ও সনাতনী বিশ্বাস দ্বারা আবর্তিত। এক গবেষণায় দেখা যায়, হাওর এলাকায় অসুস্থতার সময় চিকিৎসা গ্রহণে অনীহা, তান্ত্রিকতার ওপর নির্ভরশীলতা, কবিরাজী এবং সনাতনী পদ্ধতি গ্রহণেই স্বাস্থ্য সেবা গ্রহীতাদের আগ্রহ বেশি। এক্ষেত্রে অবশ্য আর্থিক সঙ্গতিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে। অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের ব্যাপারে মনোভাব হলো অসুস্থতায় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো হাসপাতালে যায় না যতক্ষণ না অসুস্থতার ভয়াবহতায় বিছানায় পতিত হতে হয়। রাখাইন সম্প্রদায় শিশুদের চিকিৎসা সেবায় সর্বদাই হোমিওপ্যাথিককে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের ক্ষেত্রে হাওর, গ্রামাঞ্চল, আদিবাসী ও পাহাড়ীরা এখনও পিছিয়ে রয়েছে যার প্রধানতম চালিকাই হলো সনাতনী মনোভাব ও প্রত্যক্ষণ। তবে আশার কথা সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ফলে এ ধরনের ধ্যান-ধারণায় অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

পানীয় জল স্বাস্থ্য বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিডস এর একটি গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, সুনামগঞ্জ হাওরপাড়ের বেশিরভাগ মানুষ পানীয় জল নলকূপ থেকে সংগ্রহ করে থাকে। এ  থেকে বোঝা যায়, হাওরের মানুষের পানীয় জলের ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা অনুসারে, নলকূপ থেকে সংগ্রহ করে পানি খায় হাওরের ৮৯.০৯ শতাংশ মানুষ। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নলকূপ থেকে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের হার ৯১.১ শতাংশ। নিরাপদ পানির স্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের চলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত অবস্থাদি অবহিত হওয়া যায়। হাওরের মানুষজন মৌলিক অধিকারের সুযোগ থেকে বহুলাংশে বঞ্চিত হলেও, এ হাওরে পানির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারি, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও যৌথ উদ্যোগে গৃহীত কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো।

হাওরপাড়ের মানুষ কত দূর থেকে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনপদের স্বাস্থ্য স্যানিটেশন এবং পানীয় জলের সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে জানা যায়। যেহেতু এ এলাকায় নিজ মালিকানাধীন নলকূপের পরিমাণ কম তাই দূর থেকেও অনেক সময় পানি সংগ্রহ করতে হয়। এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫৪.৭৮ শতাংশ বাড়ির বাইরে কিন্তু ২০০ মিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে থাকে। ১১.৩০ শতাংশ বাড়ির অভ্যন্তরে নলকূপের সংস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থার উপর পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব দৃশ্যমান। দেখা যায়, পুরুষরা সাধারণত পানি সংগ্রহের কাজকে তাদের কাজ বলে গণ্য করে না, পরিবারের মহিলা সদস্যরাই আবহমানকাল থেকে গৃহস্থালীর কাজগুলো করে আসছে। প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষেত্রে (৪৯.৫৭) বাড়ির বয়স্ক মহিলারা নিরাপদ পানি সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে থাকে। এমনকি শিশুরাও পানি সংগ্রহের কাজ করে থাকে (৩৩.০৪ শতাংশ)।

এবার সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চলক স্যানিটেশন ব্যবস্থা হাওরে কেমন সেদিকে খেয়াল করি। স্যানিটেশনের ব্যাপারে হাওরবাসীর সচেতনতা ও জ্ঞানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। উন্নয়ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ৭৫.৫২ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব শৌচাগার রয়েছে এবং ১৭.৩৯ শতাংশ পরিবার প্রতিবেশীর শৌচাগারে বা অংশীদারিত্বর ভিত্তিতে শৌচাগার ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে আশার কথা হলো, ৫০.৪৩ শতাংশ পরিবার রিং-স্লাব শৌচাগার ব্যবহার করছে পক্ষান্তরে বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে এখনও ৩৫.০৬ শতাংশ পরিবার কাঁচা শৌচাগার ব্যবহার করে থাকে (BBS, 2017)। হাওরপাড়ের অধিবাসীদের ৫৭.৩৯ শতাংশের শৌচাগারের অবস্থান বাড়ির বাইরে কিন্তু খুব বেশি দূরে নয় অর্থাৎ ২০০ মিটারের ভিতরে এবং ১৬.৫২ শতাংশের শৌচাগার বাড়ির সাথে লাগোয়া। এসব চলক নির্দেশ করে যে, হাওরের স্যানিটেশন সুবিধাদি কাঙ্খিত মানের নয়।

স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়া যেকোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ধারাবাহিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নাগরিকের সুস্থতা। অথচ হাওর এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দাই আধুনিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র, চিকিৎসকের অভাব, সর্বোপরী কুসংস্কার এবং অজ্ঞতাই এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষার এক গবেষনায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাওর এলাকার ২৭.৮৩ শতাংশ মানুষ অসুস্থতার সময় পল্লী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে থাকে। অন্যদিকে ২১.৭৪ শতাংশ স্থানীয় কবিরাজের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। ৬.৯৬ শতাংশ অসুস্থতার ভয়াবহতা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতাল গমন করে থাকেন। এক্ষেত্রে মূলত বদ্ধমূল ধারণা ও  অসচেতনতার কারণে হাওরবাসীকে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য কবিরাজ, পল্লী চিকিৎসক ও ফার্মেসীর ধারস্থ হয়। অন্যকথায় বলা যায়, বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে ফার্মেসী থেকে চিকিৎসা গ্রহণের হার ৩৯.০৫ শতাংশ। আর হাওরের মানুষজন এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবার আওতায় আসতে পারেনি এটাতো স্পষ্ট।

কোনো এলাকার মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের মান সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্য প্রসবকালীন স্থান একটি প্রয়োজনীয় শর্ত। সন্তান কোথায় জন্ম গ্রহণ করে থাকে তার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নের অবস্থান নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশে এখনও বেশিরভাগ প্রসব সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে হয়ে থাকে। অদক্ষ ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। আর হাওর এলাকায় তা আরও বেশি। হাওরে বেশিরভাগ অর্থাৎ ৮৬.০৯ শতাংশ ক্ষেত্রে নিজ বাড়িতেই সন্তান প্রসব হয়। মাত্র ৩.৪৮ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের স্থান হিসেবে সরকারি হাসপাতাল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে জাতীয়ভাবে সরকারি হাসপাতালে সন্তান প্রসবের হার ১১.৪ শতাংশ (BBS, 2017)। তাছাড়া প্রসবকালীন সময়ে মানুষজন সাধারণত সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন রকমের সেবা গ্রহণ করে থাকে। হাওরাঞ্চলের মানুষজন গ্রামীণ বয়স্ক মহিলার ওপর বেশি নির্ভরশীল। বাংলাদেশে মিড ওয়াইফের কাছ থেকে প্রসবকালীন সময়ে সেবা নেওয়ার হার ৪৭.১ শতাংশ। আর হাওরে সেটা ৭ শতাংশের কিছু উপরে। তার মানে হলো, এ ক্ষেত্রেও হাওরের মানুষজন অনেক পিছিয়ে আছে।

হাওরের মানুষজন প্রকৃতির ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। আবহমানকাল থেকে হাওরবাসীর মাঝে নানারকম কুসংস্কার ও সর্বোপরি অজ্ঞতার প্রভাব রয়েছে। এক্ষেত্রে হাওরবাসীর স্বাস্থ্যমান উন্নয়নকল্পে তাদের মধ্যে বিরাজমান কুসংস্কার দূরীকরণে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কাজের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।জাতীয় সূচকের অনেক বিষয়ে হাওরের অবস্থা অনেক করুণ। কোনো একটা বিষয় নেই যেটাতে হাওর জাতীয় হিসেবের সমান। সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুধাবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো শিশু, বৃদ্ধ ও নারী। তাদেরকে অবহেলা না করে নিরাপদ প্রসব, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা, যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা, শিশুদের নানাবিধ টিকা প্রদান এবং বয়স্কদের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পদক্ষেপগুলো আরও জুরালো করতে হবে। হাওরবাসীর স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিতকল্পে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসকরা যাতে হাওর এলাকায় অবস্থান করেন সেজন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করে হাওরাঞ্চলে স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদি হাওরবাসী স্বাস্থ্য সমীক্ষায় পিছিয়ে থাকে, তবে সার্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি হোচট খাবে।

আর বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য আমাদের দেশে কাঠামোগত ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে সবখানে। আগে সংক্রামক রোগ বড় সমস্যা ছিল, এখন অসংক্রামক রোগ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপ্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি চিকিৎসায় জনগণের খরচ বেড়েছে। বৈশ্বিক মানের তুলনায় আমাদের বাজেটে চিকিৎসা খাতে বরাদ্দও কম। তাছাড়া এদেশে হাসপাতাল বানানো হলো কিন্তু চিকিৎসকের নিয়োগ নেই। হাওরে যারা সচেতন, আয় কম থাকায় তারা বেশি খরচ করে চিকিৎসা নেবে সে সম্ভাবনা কম। হাওরের বেশিরভাগ মানুষ গরিব। আর তাই খরচের বিষয়টি হাওরের স্বাস্থ্যসেবাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সেই ঝুঁকি থেকে হাওরবাসী একদিন বের হবে আমরা সেটাই আশা করি। তার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানো, হাওরের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা কৌশল নির্ধারণ ও সরকারের বাড়তি নজর দেয়া প্রয়োজন।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত