মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০

হাওরের টানে

শারমিন সাঈদ

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপর

একটি শিশির বিন্দু।

কবি যথার্থই বলেছেন, ঘুরতে পছন্দ করলেও জীবনে আমি ঘুরে বেড়াবার সুযোগ পেয়েছি খুবই কম। জীবন আমার কেটেছে নিয়ন বাতির লাল আলোয় ভিজে থাকা ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখে। আমার কাছে সৌন্দর্য সীমাবদ্ধ ছিল স্কুলের ক্লাসরুমের জানালা থেকে শিলকড়ই বটগাছটা, আমার কাছে বৃষ্টি মানে ছিল চারতলার উপর থেকে কাঁদা পানি পায়ে নিয়ে মানুষের হেঁটে যাওয়া, পূর্ণিমা মানে আমার কাছে সোডিয়াম আলো (কেননা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চাঁদের আলো পার্থক্য করা যেত না!) আমার আকাশে আগে তারা গোনা যেত।

সেই আমি যখন বাকৃবিতে আসি তখন আস্তে আস্তে সৌন্দর্যের সংগা বদলাতে থাকে, প্রতিরাতেই যখন রিভার সাইডের ছাদে উঠে দেখতাম আকাশ ভরা তারা, তখন প্রায়ই আফসোস হতো শহরের চারদেয়ালে বন্দি থাকা মানুষগুলোর জন্য। যখন পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলো নদীর পানিতে চিকমিক করত তখন মনে হত এটাই বুঝি গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না।

কিন্তু না! আমার সব ধারণা ভেঙে গেল। ভয়ংকর সুন্দর বলতে আসলেই যে কিছু একটা আছে তা আমি জেনে গেছি এবার। যেই ভয়ংকর সুন্দর দেখার পর সবচেয়ে আপন মানুষটাকে তা দেখাতে ইচ্ছে করবে। আচ্ছা, আসল গল্পে ফিরে আসি! গিয়েছিলাম সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওরে! ছোটবেলা থেকে বইয়ের পাতায় পড়ে আসা সেই জায়গায়! হাওর আসলে কি তা নিয়ে আমার ধারণা ছিল না, কারণ আমি বড় হয়েছি রমনা পার্কের পুকুর দেখে!

খুউব সকালে ঘুম থেকে উঠে ট্রেন ধরবার জন্য আমারা যখন স্টেশনে যাই তখনো বুঝতে পারিনি কি দেখতে যাচ্ছি আসলে! ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে চড়ে মোহনগঞ্জে যাই, লোকাল ট্রেনে গাদাগাদি করে বসে গেছি সবাই, তবুও সবাই কত প্রফুল্ল তা মুঠোফোনের গ্যালারীতে জমে থাকা সেলফিগুলোই প্রমাণ করে।

ট্রেন থেকে নেমে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার উদ্দেশ্যে লেগুনাতে ওঠা, আমি সবসময়ই জানালা বা বাইরের সাইড প্রেফার করি, ধুলা খেতে হবে জেনেও লেগুনাতেও বাইরের পাশেই বসেছিলাম। বাইরের দিকে দৃষ্টি মেলে দেখছিলাম, দুপাশে ধানক্ষেত, মাঝে রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে এগুচ্ছে লেগুনা। আমার পাশেই ছিল বাবু মীম, সুন্দর কিছু দেখলেই দুজন দুজনকে ডেকে দেখাচ্ছিলাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই দৃশ্যপট বদলে গেল, দুপাশে পানি, মাঝে যাচ্ছে আমাদের লেগুনা, পানি স্বচ্ছ নীল, সে পানিতে আকাশের মেঘের ছায়া, রাস্তার গাছের ছায়া আর দূরে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড়।

ঘন্টাখানেক পর লেগুনা থেকে নামলাম, তখন আমরা সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায়, নৌকার যাত্রা হবে সেখান থেকেই। নৌকার নিচতলায় থাকার ব্যবস্থা, যেখানে সব কাজ হামাগুড়ি দিয়ে করতে হয়, দাঁড়ানো যায় না। তবুও খারাপ না, জানালার পাশে বসে স্বচ্ছ পানি আরও কাছ থেকে দেখা যায়। আর নৌকার দোতালা মানে নৌকার ডেক, আমরা সারাদিন নৌকার ডেকেই ছিলাম। নৌকার ডেকে বসে আছি, নৌকা চলছে, যেদিকে দৃষ্টি মেলা যায় শুধু পানি আর পানি! ধু ধু প্রান্তর মরুভূমির মত, থৈ থৈ প্রান্তর জলরাশি! যেহেতু হাওর নদীর থেকে ছোট তাই ভেবেছিলাম কিছুদূর নৌকা যাবার পর হয়ত পথ শেষ হয়ে যাবে আমরা তীরে এসে তরী বেঁধে বসে থাকব আগামী তিনদিন।

তাই হল, খানিকবাদে নৌকা একটা চরের কাছে ভিড়ল, সেখানে ছেলেরা গোসল করল আর মেয়েরা শুধু পা ভিজিয়ে ছবি তুলে নিজেদের সান্ত্বনা দিল। তবুও কম কিসে! এই স্বচ্ছ নীলাভ জলে পা ভিজানোও কি কম সৌভাগ্যের ব্যাপার! দুপুরের ভোজনকার্য শেষে আমাকে অবাক করে নৌকা আবার চলা শুরু করল। তখন মাথার উপর সূর্য। হাওরের ঠিক মাঝে সূর্যের তেজী আলো পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকাকে উজ্জ্বল করে তুলেছে, এই তপ্ত রোদেও পুড়ে যাওয়ার ভয়কে উপেক্ষা করে আমরা মানে আমি, মীম, পূর্ণিমা, কানিজ, ইন্দ্রাণী নৌকার গুলয়ের উপর বসে পা ডুবিয়ে গান গাইছি গলা ছেড়ে। সুরের খেয়াল নেই কারোরই!

নদীর স্বচ্ছ জলের দিকে তাকালে পানির ভেতরের গাছ গুলোও দেখা যায়। আস্তে আস্তে মেঘালয় কাছে আসতে থাকে, পরিষ্কার হতে থাকে আবছা ভাব। চারপাশে মেঘালয় আর হাওরের পানি, সেই পানির মধ্যেও এত ভিন্নতা!! কখনো ‘লাইফ অফ পাই’ মুভিতে দেখা পানির রঙের মত রঙ, কখনো সেই রঙ কিছুটা গাঢ়, কিছুটা হালকা খানিক বাদে ঘোলা পানি! একনজরে পানির দিকে তাকালে মনে হয় ছোট কোন বাচ্চা যেন ইচ্ছেমত রঙ ঢেলে দিয়েছে ড্রয়িং খাতায় আঁকা নদীর এখানে সেখানে!

মাঝে মাঝেই গাছ, সেই গাছ মাটিতে থাকা সাধারণ গাছ না। আকারে ছোট কিন্তু ডালপালা বেশ ছড়ানো। যখন পানির মাঝে গাছ ছিল আর নৌকা সেই পানির মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল সুন্দরবন এসেছি, একটু পরেই হয়ত হরিণ দেখতে পাব, কিন্তু না গাছের পিছন থেকে হরিণ না উঁকি দিচ্ছিল ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। আর সেই ছোট ডিঙি নৌকার মাঝি ছিল পাঁচ বছরের ছোট ছেলেমেয়েরা! ভাবা যায়!! আমাদের কাছে মাটি যেমন ওদের কাছে পানি তেমন তাই হয়ত এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না ওদের জন্য, খানিক বাদে দেখতে পেলাম বিলবোর্ড যেখানে লেখা টাংগুয়ার হাওর! আহা! এই সে হাওর! যার নাম ধাম ঠিকানা সেই ছোটবেলা থেকে মুখস্থ করে আসছি! টাংগুয়ার হাওরে নৌকা ঢুকার পর দেখতে পেলাম এখানে সেই গাছ আরও বেশী পরিমাণে, নৌকার পিচ্চি ছেলে সালামিনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম এটা হিজল বন। দৃশ্যটা রিভিউ করে তবে বলি, আমরা নৌকার গুলয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছি, চারপাশে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে, হিজল বন, পাহাড় এখন খুব কাছে চলে এসেছে, মধ্য দুপুর শেষে এখন পড়ন্ত বিকেল, সূর্যের তেজীভাব কমে তা খানিকটা মায়াবী লালচেভাব ধারণ করেছে, সেই মায়াবী আলো পানিতে পড়েছে এবং সেই আলো ঢেউয়ে ক্ষণে ক্ষণে ভাঙছে।

এবার নৌকা থামল পাঁচতলা একটা টাওয়ারের পাশে। স্যার সময় বেঁধে দিলেন দশমিনিট। তড়িঘড়ি করে টাওয়ারে উঠলাম, পাঁচতলা টাওয়ার থেকে আমি হাওর দেখছি, চোখ যে ঝলসে যায়নি এই সৌন্দর্য দেখার পরও এটাই কি বেশি না!! যেহেতু পড়ন্ত বিকেল তাই সূর্য একপাশে, সেপাশ থেকে লালচে হলুদ আলো হিজল বনের গাছের ফাঁকে গিয়ে পড়ছে, আর বনের ফাঁকে ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের ডিঙি নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মেঘালয় এখন স্পষ্ট আমাদের কাছে, চারদিকে থৈ থৈ প্রান্তর জুড়ে পানি আর পানির মাঝে এই টাওয়ারে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছি আমি!

আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন এই ছোট নৌকায় উঠেছিল, আমাদের নৌকা ছেড়ে দিবে কিন্তু তখনো তাদের নৌকা তীরে পৌঁছায়নি! দুটো নৌকার চারজন কোনরকমে পৌঁছে গেলেও, সারা আর মেহেদীর নৌকা একটু দুরেই ছিল, ঘাবড়ে গিয়ে ওরা যখন একটু নড়াচড়া করছিল তখন নৌকায় পানি ওঠে নৌকা ডুবে যায়। আমরা নৌকার গুলয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি সারা ডুবে যাচ্ছে কিন্তু কিছু করতে পারছি না, ঘাবড়ে গিয়ে মেহেদীও যেন সাঁতার ভুলে গেছে! ওদের নৌকা তখন আমাদের নৌকা থেকে দেড় হাত দূরে, আমাদের নৌকার পিচ্চি ছেলে সালামিন কিছু না ভেবেই নেমে পড়ল পানিতে সাথে পিচ্চি ডিঙি নৌকার পিচ্চি ছেলেমেয়েগুলিও। সবাই মিলে তখন ওদের দুজনকে নৌকায় উঠালো। তখন বুঝতে পারলাম আমরা আসলে সবই থিওরি হিসেবে পারি, থিওরির বাস্তব প্রয়োগ বাস্তব জীবনে প্রয়োজনের তাগিদে পারিনা!

যাইহোক, পরিবেশটা থমথমে, সবাই ডুবে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করছে, নৌকা চলছে আবারও। বসে আছি আগের প্রিয় জায়গাতেই, পাশে আছে মীম আর পূর্ণিমা, প্রিয় দুজন মানুষ।

এখন পড়ন্ত বিকেল শেষে সূর্য ডুবিডুবি অবস্থা। ছোটবেলায় আকাশের নিচে রেখা দিয়ে সূর্যের আলো আঁকতাম, সূর্যের বর্তমান অবস্থা এখন সেরকমই! নৌকা চলছে, দূরে গাছের নিচে সূর্য যেন ঢলে পড়েছে! সত্যি!! দেখে মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে নিচে নেমে আসতে হাঁপিয়ে উঠে সূর্যও যেন কৃষকদের মত গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছে!


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত