শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য পলো

হেমন্তের রোদমাখা শীতে গ্রাম বাংলার বিল-ঝিলের পানি কমে গেলে মানুষ দলে দলে পলো নিয়ে মাছ ধরতে বিলে নামেন। তলাবিহীন কলসির মতো দেখতে, বাঁশ-বেতের তৈরি শৈল্পিক কারুকার্যময় যে জিনিসটি দিয়ে মাছ ধরা হয় আঞ্চলিক ভাষায় তার নাম পলো।

শুষ্ক মৌসুমে গ্রাম বাংলায় খাল-বিলে পানি কমে গেলে দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আশ্রয় নেয় জলাশয়ের তলদেশের আগাছাপূর্ণ স্থানে। তখন কম পানিতে পলো দিয়ে মাছ শিকার করা সহজ।

এ সময়টাতে মাছ ধরতে আনন্দ পান সৌখিন সব মৎস্য শিকারিরা। পলো নিয়ে দলে দলে একসঙ্গে খালে-বিলে বা নদীতে মাছ ধরাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় পলো উৎসব। শীতের শুরুতেই শুরু হয় এই উৎসব।

আড়াই থেকে তিন ফুট লম্বা আকৃতির এ খাঁচা সদৃশ পলো পানিতে তলদেশে ফেলে ওপরের ফাঁকা অংশ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মাছ শিকার করা হয়।

কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চিরচেনা গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য পলো উৎসব। গ্রাম বাংলার পুরাতন এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য শুক্রবার নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর বিলে পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসবের আয়োজন করা হয়।

জানা গেছে, নলডাঙ্গা উপজেলার আগে প্রত্যেক গৃহস্থের বাড়িতেই থাকতো দু-একটি পলো। পলো দিয়ে মাছ ধরার কাজ ছাড়াও হাঁস-মুরগি ধরে রাখার কাজেও ব্যবহার হতো। শুকনো মৌসুমে বিশেষ করে পৌষ মাস থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত চলে পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসব।

পলো উৎসবে যোগ দেওয়া কয়েকজন জানান, বিভিন্ন এলাকার নদ-নদী,খাল- বিল হাওরসহ উন্মুক্ত জলাশয়ে কয়েকদিন পূর্ব থেকেই দিন তারিখ ঠিক করে আশপাশের প্রত্যেক গ্রামের জনসাধারণকে দাওয়াত দেয়া হতো। নির্দিষ্ট দিনে বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সৌখিন মৎস্য শিকারীরা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে জড়ো হতেন।

বিলের এক প্রান্ত থেকে সকলে একই সাথে লাইন ধরে লুঙ্গি আটঘাট করে বেধে অথবা কাছা দিয়ে একসঙ্গে দল বেধে নান্দনিক ছন্দের তালে তালে ঝপ ঝপাঝপ শব্দে পলো দিয়ে মাছ ধরা উৎসবে মেতে উঠতেন।

এর অংশ হিসেবে শুক্রবার নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর বিলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসবের আয়োজন করা হয়। এ উৎসবে ১০ কিলোমিটার দুরের গ্রাম মোমিনপুর, মির্জাপুর গ্রাম থেকে কয়েক শতাধিক সৌখিন মাছ শিকারীরা অংশ নেয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, হালতি বিলের ব্রহ্মপুর বিলে এক প্রান্ত থেকে সকলে একই সাথে লাইন ধরে লুঙ্গি আটঘাট করে বেধে অথবা কাছা দিয়ে এক সঙ্গে দল বেধে নান্দনিক ছন্দের তালে তালে ঝপ ঝপাঝপ শব্দে পলো দিয়ে মাছ ধরা শুরু করেছেন এবং সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতেন সামনের দিকে। অনেকেরই মাথায় গামছা বাঁধা।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত