রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

হাসান হামিদের ‘নাঙ্গেলি’ পড়ে আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম

নারী সে কি দেবী নাকি পণ্য?

নারী যে ছিলো প্রকৃতির মতো সুন্দর,বাইরে কঠিন কিন্তু ভেতরে কোমল। যে ছিলো পুরুষের প্রেরণার উৎস আজ সেই ভোগ্যপণ্য। নারীর যে সৌন্দর্য তা স্রষ্টা দিয়েছিলো দুহাত ভরে অকৃপণভাবে আজ তাতেই বসছে কর। নারী দেহের অপার সৌন্দর্য ও বিষ্ময়ের বস্তু। যুগে যুগে এই নারীদেহের অন্যতম অঙ্গ স্তন ছিলো রহস্যের আধাঁর,যা ছিলো সন্তানের খাদ্যের সংস্থান,তাতেই বসলো কর। আর এই কর দিতে হবে নিম্নবর্গের মানুষের। নিম্ন জাতের মেয়েদের স্তন ঢেকে রাখার জন্য দিতে হবে কর।আর এই কর দিতে অস্বীকার করে এক সাহসী নারী, নাম তার নাঙ্গেলি। এক দ্রোহের, এক বিপ্লবের বীজ বপন করে যার মশাল ভীত নড়িয়ে দেয় এক পুরো সমাজ ব্যবস্থার।

হাসান হামিদের ‘নাঙ্গেলি’ বইটি পড়তে গিয়ে কি ভালো লেগেছে তা বলার আগে বলতে চাই, বইটি যতক্ষণ পড়েছি আমার মনে হয়েছে ওপার বাংলার কোনো কালজয়ী লেখকের লেখা পড়ছি। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য, দারুণ সব শব্দ চয়ন, গল্পের মধ্যে পাঠক হিসেবে আমি এমনভাবেই ডুবে গেছি, চারপাশের সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে।

আমি শুনছি আমার পেছনে কেউ বলছে কাপড়গুলো বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ঘরে নিয়ে আসতে কিন্তু আমি মানসচোক্ষে সেখানে নেই। আমি পৌছে গেছি চিরু, নাঙ্গেলি, উর্মি, ফাতেমার মধ্যে। আমি মন মস্তিষ্ক হারিয়ে গেছে তাদের ভীড়ে। একজন লেখকের স্বার্থকতা মনে হয় সেখানেই।

বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৬ কিন্তু আমি হলপ করে বলতে পারি বইটির প্রথম লাইন থেকেই পাঠক ঐ নিম্নবৃত্তদের বসতি,তাদের জীবন,তাদের যুদ্ধে হারিয়ে যাবে।

বইটি যখন আপনি পড়বেন আপনি উঁচু সমাজের নেতৃত্ব দানকারী রঘুনাথ বা ইমামকে দেখে যখন পুরুষ জাতির উপর বীতশ্রদ্ধ হচ্ছেন তখন আপনি চিরু আর রতনদের দেখে অবাক হবেন।শ্রদ্ধায় নুইয়ে আসবে আপনার মস্তক।পুরুষ ও প্রকৃতি একে অপরের প্রতিযোগী নয় বরং সহযোগী এটায় বিশ্বাস করবেন।যেখানে দারিদ্র্য দুনিয়ায় কামের জয়জয়কার সেখানে ভালোবাসা,আত্বসম্মানের স্থান ও আছে তাই যেন এই চরিত্রগুলো তুলে ধরেছে।

জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে পড়ার পর একদিকে ঐ উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র যেন আপনার খুব কাছের হয়ে যায়।তেমনি আমি ও যেন কখনো ফাতেমা,কখনো ফাতেমার মা,কখনো উর্মি, কখনো নাঙ্গেলিতে পরিণত হয়েছিলাম।

শরৎচন্দ্রের মহেশ পড়ার পর জাতিভেদেরর যে বৈষম্য তা পাঠকের মনে আলোড়ন তুলেছিলো তা যেমন সত্য। তেমনি স্তন কর নামক প্রহসন যে নিজের লালসা চরিতার্থের এক অন্য পাথেয় তা যেন বলাই বাহুল্য।

একজন নারী হিসেবে উর্মির লাঞ্চনাতে আমার মন গুমড়ে কেঁদেছে,তেমনি নাঙ্গেলির যে নিজের আত্বসম্মানকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রয়াস আমাকে উজ্জীবিত করেছে।

একটা কোটেশন পড়েছিলাম,ঈশ্বর বাস করেন ঐ ভদ্রপল্লীতে। আজকে এই বইটি পড়ে মনে হলো ন্যায় বিচারক তো দূরে থাকুক স্বয়ং ঈশ্বর ও এদের দেখলে মনে হয় মুখ ফিরিয়ে নেয়।

সভ্য সমাজে আমরা ধর্ম নিয়ে হানাহানিতে ব্যস্ত। কিন্তু এই সমাজে দারিদ্র‍্যতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম।কারণ এই একটি জিনিসের সুযোগ যেমন ইমাম নিচ্ছে তেমনি নিচ্ছে বাবু সাহেব।আর এসব পুঁজিপতি ও ভন্ড ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে বন্দী ফাতেমা, উর্মি, নাঙ্গেলিরা।

বইটি যেহেতু ছোটো বইটি শেষ করার পর একটু ও অতৃপ্তি নেই।বরং অতিশায়োক্তি বা হাইপারবোলি দিয়ে তেনাপেঁচানো নয় দেখে আমার পড়তে দারুণ লেগেছে।বইটির শেষ লাইন পড়ে মনে হয়েছে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।

শেষকথা বইটি কেন পড়বেন তা বলতে ইচ্ছে করছে না বরং নিজের একটি অনুভূতি প্রকাশ করতে চাই। অঝোর ধারায় বারি ঝরে পড়ছিলো যখন বইটি হাতে নেই, আসন পাতি বারান্দার এক পাশে। নিমগ্ন চিত্তে বইটি পড়তে পড়তে দমকা হাওয়ায় আমি ভিজে যাচ্ছিলাম কিন্তু নিজেকে স্থানচ্যুত করা সম্ভবপর হয়নি।

বইটি শেষ করলাম ১০ঃ৫৮ মিনিটে কিন্তু সে রেশ রয়ে গেলো। বাধ্য করলো আমায় দু লাইন লিখতে। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না নাঙ্গেলির শেষ সিদ্ধান্ত পড়ার পর কাঁটা দিয়ে গেছে। আমি চিন্তা করেছি এক দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূর এত সাহস কি করে হলো

তারপর ভেবেছি ঝাঁসির রাণী, প্রীতিলতা এরা ছিলো তাই তো স্বাধীনতা এলো। আর নাঙ্গেলিরা ছিলো বলেই এ করের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হলো।

পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন – ফাইজা হাবিব নেবুলা


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.