শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

হাসান হামিদের লেখায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ৫০ বছর

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। এ পরিমাণ আয় নিয়ে বিশ্বের একেবারেই গরিব দেশের তালিকায় জায়গা হয় এ দেশের। তখন বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ। ফাঁকা রাজকোষসহ নানা সংকটে নিমজ্জিত দেশটি তখন সাত কোটি মানুষ নিয়ে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ হলিস বি. চেনারিকে সেসময় প্রশ্ন করা হয়েছিল, মানসম্পন্ন মাথাপিছু আয়ের তালিকায় যেতে বাংলাদেশের কতদিন লাগবে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ১৯৬৫ সালকে ভিত্তি ধরে মাথাপিছু আয় ৮০০ ডলারে বা ১৯৭৩ সালকে ভিত্তি ধরে ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে বাংলাদেশের ১২৫ বছর লাগবে। এই হিসাব বাংলাদেশ ভুল প্রমাণ করেছে অনেক আগেই। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার একসময় যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী জিডিপির বিচারে সেটি আজ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি। কেবল জিডিপি বৃদ্ধিই নয়, অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকেও বাংলাদেশ আজ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাবে নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৪ বছর পর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভূক্ত হয়। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভূক্ত হতে ৩টি শর্ত রয়েছে। প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ৩টি শর্তই পূরণ করতে সক্ষম হয়। পরে ২০২১ সালেও ৩টি শর্ত পূরণে প্রয়োজনীয়তা দক্ষতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ৩টি শর্ত হচ্ছে মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। এই ৩টি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ নির্ধারিত মানের চেয়েও ভালো করেছে। এর আগে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংক এ দেশকে ‘নিম্ন’ থেকে ‘নিম্ন মধ্যম’ আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘের অ্যাওয়ার্ড পায় বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশে এসে ঘোষণা দেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী দক্ষতা সারাবিশ্বের জন্য শিক্ষণীয়।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতার সময়ে বাংলাদেশের যে ভঙ্গুর অবস্থা ছিল, তাতে এত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ উন্নয়নের এই স্তরে পৌঁছাবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ‘ভারত: উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাবে, এ কথা তখন কেউ ভাবেনি। দেশ স্বাধীনের পর অনেকেই তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেউ কেউ তাকে ‘বাস্কেট কেস’ বলে খরচের খাতায় ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, এই দেশকে কোনো অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়াই উচিত নয়। কারণ দেশটি জনসংখ্যা বিস্ফোরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করে উঠতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ অনেকের সেই ভাবনাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ভঙ্গুর অবকাঠামো, খাদ্য সংকট, শূন্য রাজকোষ আর বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়াই পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে থাকে সরকার। তবুও ভেঙে পড়েননি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখান। পাকিস্তানি সেনারা যুদ্ধের সময় পুড়িয়ে দেয় টাকা-পয়সা। ধ্বংস করে শিল্পকারখানা। আর সেই বাংলাদেশে এখন ৬৬টি ব্যাংক ও ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। রয়েছে শতাধিক বীমা কোম্পানি। শিল্প উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। স্বাধীনতার সময় আলো বলতে কেরোসিন পুড়িয়ে টিমটিমে জ্বলা কুপির আলোই বুঝত মানুষ। এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত দেশের ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা। বিশ্বের অনেক দেশ ও বড় বড় কোম্পানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করছে। অনেকে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে। ইস্পাত শিল্প, গাড়ি সংযোজন শিল্পের মতো ভারী শিল্প হচ্ছে দেশে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপান, চীন, ভারত, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ান বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন।

বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি আয় ছিল মাত্র ২৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেসময় জিডিপি’র আকার ছিল ৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।  আর দারিদ্রের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এরপর যত দিন গেছে, শিল্পায়নের ফলে আমদানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রফতানি আয়। ৫০ বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে রফতানি আয় বহুগুণে বেড়েছে, ২০২০ সালের হিসেবে যা ৩৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপি আকার ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে বেড়েছে প্রায় ৩৬৯ গুণ। পরিমাণে যা প্রায় ২৭ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। মাথাপিছু আয় বেড়েছে মোটামুটি ১৬ গুণ। অবশ্য করোনাভাইরাসের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৬.৯৩% হ্রাস পেয়ে ৩৩.৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমেছিল। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থ বছরে রপ্তানি ১৩.৬৪% বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫.১৮ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। পোশাক শিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ঔষুধ, ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য শিল্পের। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় যোগ হয়েছে জাহাজ, ঔষুধ এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। 

কেবলমাত্র আমদানি-রপ্তানি নয়, গত কয়েকদশকে ধারাবাহিকভাবে রেমিটেন্স বেড়েছে। প্রবাসী আয় ২০২০-২১ অর্থ বছরে ২৪.৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। কৃষি-শিল্পের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বেড়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নও হয়েছে। মূলতঃ প্রান্তিক পর্যায়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন, রফতানি বৃদ্ধি -সবমিলিয়েই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশে। এইসব অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর। পাকিস্তানের ছিল ৫৩ বছর। ভারতের ছিল ৪৮ বছর। বাংলাদেশ তাদের পেছনে ফেলেছে। বাংলাদেশের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। ভারত ও পাকিস্তানের গড় আয়ু যথাক্রমে ৬৯ ও ৬৬ বছর। শিশু মৃত্যুহারেও একসময় বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৫৩ জন। যেটি ২০১৮ সালে এসে প্রতি হাজারে মাত্র ২২ জনে নেমে আসে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ পরপর চারবার বার্ষিক শস্য উৎপাদনে মার খায়। ১৯৭১-৭২ সালে আমন উৎপাদন ১৯৬৯-৭০-এর তুলনায় ১৯ শতাংশ কম হয়। প্রয়োজনীয় বীজ, সার, উপকরণের অভাবে বাহাত্তরে বোরো উৎপাদন আগের বছরের চেয়েও ২০ ভাগ কমে যায়। ১৯৭২-৭৩-এ স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহতম খরায় আউশ ও আমন উৎপাদন মার খায়। ১৯৬৯-৭০ সালে যেখানে ২৯ দশমিক ৬৩ লাখ টন আউশ হয়েছিল, ‘৭২-৭৩-এ তা নামে ২২ দশমিক ৭৩ লাখ টনে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে লবণ, তেলসহ অন্য নিত্যপণ্যের দাম। বিশ্ববাজারেও ওই সময় খাদ্যপণ্য সংকট দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্যসহ তেলের দর বেড়ে যায়। সরকার বাধ্য হয় অন্য দেশের কাছে হাত পাততে। সেই বাংলাদেশে এখন উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে দেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন। তাছাড়া কেবল খাদ্যশস্য উৎপাদনই নয়, মাছ উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয় শীর্ষস্থানে রয়েছে। গম ও ভুট্টার বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল না। শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত। সেই অবস্থায় আজকের বাংলাদেশকে চিন্তা করা অসম্ভব ছিল। এটা সম্ভব হয়েছে কৃষিতে বিপ্লব ও শিল্পে রূপান্তরের মাধ্যমে। তৈরি পোশাক ও নির্মাণের মতো কিছু খাত ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি অনেকটা সফল হয়েছে।পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন ও শ্রমশক্তিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। একথা ভাবতে খুব ভালো লাগে, আমাদের দেশটি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে কীভাবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত