শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১

হীরকডানা: ইতিহাস, মিথ আর কল্পনার দুর্দান্ত সম্মিলন

হাসান হামিদ

বাংলা কথাসাহিত্যে যিনি একটার পর একটা সৃষ্টি দিয়ে অন্য এক মাত্রা সংযোজন করে চলেছেন, তিনি এ সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল ঔপন্যাসিক স্বকৃত নোমান। বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমান সময়ে যারা লিখছেন, তাদের মধ্যে তিনি আমার প্রিয়তম লেখকদের অন্যতম। আমি যখন পড়ি তিনি যা লিখেছেন, তাঁর সেসব লেখায় লেপ্টে থাকে অসামান্য জীবনবোধ, মুখ গুঁজে থাকে বিচিত্র মানুষের শ্বাস। তাঁর রচনায় উঠে আসে প্রকৃতির গোপন অনুষঙ্গ, ইতিহাস আর পুরাণ; এবং অবশ্যই মানুষের সমকালীন জীবন। ইতিহাস, লোককথা এবং মিথ নিয়ে আমাদের এই বাংলাদেশে সফল উপন্যাস খুব কম। আমি কয়েক দিন ধরে স্বকৃত নোমানের লেখা ‘হীরকডানা’ উপন্যাসটি পড়লাম। উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ। আজকে সেটি নিয়ে কিছু বলি।

‘হীরকডানা’ উপন্যাসটির মূল চরিত্র শমসের গাজী। তিনি ভাটির বাঘ বলে পরিচিত, যুদ্ধ করেছিলেন ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে। গাজীনামা’য় শেখ মনোহরের পুঁথির লাইন এই মুহুর্তে মনে পড়ছে-

“এখানে আসিয়া কবি শেখ মনোহর ভনে

শমসের গাজী ভাটির বাঘ জানুক জনে।”

শমসের গাজী সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নিয়েও নিজের যোগ্যতায় একসময় হয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণ পূর্ববাংলা ও ত্রিপুরার রাজা। এই অঞ্চলে প্রচলিত মিথ; লোকালয়, মসজিদ-মন্দির, দীঘি-নালার নামকরণের সাথে শমসের গাজী ও তার সময়ের বহু কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে। লোকে বলে, জোসনারাতে হীরকডানায় ভর করে জিন হয়ে জিনের সঙ্গে, পাখি হয়ে পাখির সঙ্গে উড়ে বেড়ান শমসের গাজী। এসব তথ্যকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে এর সাথে কল্পনা মিশিয়ে স্বকৃত নোমান নির্মাণ করেছেন ‘হীরকডানা’। এতে বর্ণিত হয়েছে শমসের গাজীর উত্থান, বীরত্বগাঁথা এবং ট্রাজিক পরিণতি। উপন্যাসে আমরা দেখি, শমসের গাজী একদিকে অকুতোভয় বীর, প্রজাদরদি রাজা, অন্যদিকে মনকাড়া বাঁশিওয়ালা। গভীর রাতে বাঁশির সুর শুনে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসেন। পরিবেশ সৃষ্টিতে ঔপন্যাসিক স্বকৃত নোমান সিদ্ধহস্ত। তিনি বুঝেন পাঠককে কীভাবে আস্তে আস্তে ঘটনার গভীরে ডুব দেওয়াতে হয়। হীরকডানা উপন্যাসের শুরুটা পড়তে চাই,

‘‘খরানকালের নিরালা দুপুরে মহামায়া খালের পাড় ধরে যেতে যেতে মৃত্যুযন্ত্রণাকাতর লক্ষ্মীনারায়ণের উচ্চারিত শোলোক শুনলেও শুনতে পারো। নিশিরাতে একই পথে যেতে যেতে রানী মহামায়ার উলঙ্গ নাচ দেখাটাও বিচিত্র কিছু নয়। কিংবা মুহুরি নদীর তীর ধরে যেতে যেতে ক্ষুধিত আত্মার আকুল বিলাপ শুনলেও শুনতে পারো। তবে তুমি একাই শুনবে, একাই দেখবে। সাক্ষী-সাবুদ নেই। কারণ, এসবের পেছনের ঘটনা পুরাকালের। কিন্তু এখন, এই গভীর রাতে যখন আসমান-জমিনে ফারাক নেই, রঘুনন্দনগিরির চূড়া থেকে যে সুর ভেসে আসছে তা যে কেউ শুনতে পাবে। দক্ষিণশিকের মানুষেরা তন্দ্রার ভেতর এ সুর শুনতে শুনতে নেশাঘুমে ডুবে যায়। তাদের জোড়া ঠোঁটে লেগে থাকে মুচকি হাসির রেখা। হয়ত তারা খোয়াবের ভেতর দেখতে পায়, পুবের আকাশ থেকে একটা উল্কাপিণ্ড ধেয়ে আসছে মুহুরি নদীর মাঝ বরাবর। রাতের কালো শামিয়ানা ফুঁড়ে জোয়ারের স্রোতে যেসব দস্যু-ডাকাত দাঁড় বাইতে বাইতে উজানের দিকে আসছে তীব্র আলোর ঝলকানিতে তারা আবার পিছু হটতে শুরু করে।…. দখিনা বাতাসে ভর করে রঘুনন্দনগিরি থেকে এখন যার মোহনবাঁশির সুরের লহরী ভেসে আসছে, সে উল্কাপিণ্ড নয়, মানুষের ঔরসে জন্ম নেয়া মানুষ। কিন্তু ঠিক একিন হয় না মানুষদের। মানুষ হলে কী করে রঘুনন্দনগিরির গহিন জঙ্গলে জলজ্যাস্ত একটা বাঘের সঙ্গে লড়ে জিতে গেল! আচ্ছা সেটাও না হয় মানা যায় । কিন্তু বিষেভরা শঙ্খচূড় কি কখনো ঘুমস্ত মানুষের মাথার উপর ফণা তুলে ছায়া দেয়?’’

যে শমসের গাজীকে নিয়ে ‘হীরকডানা’ উপন্যাস, ইতিহাস বলছে তার জন্ম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ বলেন, ১৭০৫ কিংবা ১৭০৬ সালে; আবার কারো মতে ১৭১২ সালে বর্তমান ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার ঘোপাল ইউনিয়নের নিজকুঞ্জরা গ্রামে তার জন্ম। পিতার নাম পীর মোহাম্মদ, তিনি তৎকালীন ওমরাবাদ পরগনার একটি কাছারিতে খাজনা আদায় করতেন। আর মা কৈয়ারা বেগম। আর্থিক অনটনের কারণে ভাগ্য অন্বেষণে শমসের গাজীর পিতা চাকরি ছেড়ে বেদরাবাদ এলাকায় সস্ত্রীক চলে আসেন এবং এখানেও নিদারুণ আর্থিক সংকটে পড়লে স্থানীয় জমিদার নাসির মোহাম্মদ চৌধুরী তাকে আশ্রয় দেন। সেই বাড়িতেই জন্ম শমসের গাজীর।

শৈশবেই  পিতাকে হারানোর ফলে শমসের অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হন। কথিত আছে, একদিন মায়ের বকুনি শুনে ফেনী নদীর তীরে বসে কান্না করার সময় সে পথ ধরে নিজামপুর থেকে ধনুঘাট হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন শুভপুরের তালুকদার জগন্নাথ সেন ও তার  স্ত্রী সোনা দেবী। তালুকদার সাহেবের সন্তান ছিল না বলেই হয়তো শমসের গাজীর প্রতি দুর্বল হয়ে তাকে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে যান, দত্তক নেন শমসেরকে। তারপর থেকে জগন্নাথ সেনের স্নেহ-মমতায়ই বেড়ে উঠতে থাকেন শমসের। হীরকডানা’য় কত সহজ সুন্দর করে বলেছেন স্বকৃত নোমান,

‘‘এই দুঃসময়ে জগন্নাথসেন যখন প্রস্তাব করলেন, শমসেরকে তিনি দত্তক নিতে চান, তখন জোর দিয়ে আপত্তি করতে পারল না কৈয়ারাবিবি। দেখতে রাজপুত্রের মতো ছেলেটাকে পেয়ে তো মহাখুশি জগন্নাথসেন। একবারও বুঝতে পারলেন না ছেলে যে এতটা বেপরোয়া। মৌলবি পণ্ডিত রেখে তাকে পড়াশোনা করাতে চান, অথচ সে বিলকুল বেখেয়াল। অবশ্য বেখেয়ালও বলা চলে না। বেখেয়াল হলে পণ্ডিত একটা প্রশ্ন করলে উল্টো সে তিনটা প্রশ্ন করে কেমন করে? পণ্ডিত বিরক্ত হয়ে মারার জন্য বেত উঠালে একদৌড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা গোলকধাধা তৈরি করে কোথায় যে চলে যায় ঠিকঠিকানা থাকে না। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ধানক্ষেত আখক্ষেত গাদাগুদা যেখানেই খোঁজো, নাগাল পাওয়া যাবে না। কিছুক্ষণ পর রঘুনন্দনগিরি থেকে যখন বাঁশির সুর ভেসে আসে, তার অবস্থান সম্পর্কে তখন নিশ্চিত হওয়া যায়। সুর শুনেই বোঝা যায় সুরকারটা কে। তার বাঁশিতে মন-উচাটন করা যে সুর, তা কঙ্গুরায় কেন, তামাম পরগনায় খুঁজলেও তার মতো বাঁশিওয়ালা পাওয়া কঠিন’’।

স্বকৃত নোমানের সাবলীল বর্ণনা ও উপস্থাপনে কাহিনি তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। শমসের আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। আর বড় হওয়ার সাথে সাথে লাঠি, কুস্তি, তলোয়ার কিংবা তীর-ধনুক চালনা সব ক্ষেত্রেই শমসের পারদর্শীতা শমসের গাজীকে চারদিকে পরিচিতি এনে দেয়। হীরকডানা’য় বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে,

‘‘পড়ালেখায় এতটা বেখেয়ালি হওয়ার পরও কয়েক বছর পর আরবি-পার্সি-উর্দু এবং বাংলা ভাষায় তার মুনশিয়ানা দেখে জগন্নাথসেন তো বটেই, মৌলবি-পণ্ডিতের চোখও থির। গড় গড় করে বলে যেতে পারে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী, সুর দিয়ে গাইতে পারে পার্সি কবি রুমি, খৈয়াম ও হাফিজের শের। তারও কয়েক বছর পর জগন্নাথসেন খেয়াল করলেন, যুদ্ধবিদ্যাতেও ঝোক কম নয় তার পোষ্যপুত্রের। কুস্তিখেলা, লাঠিখেলা এবং তীর-ধনুক চালনায় পটু হয়ে উঠছে দিন দিন। তল্লাটের বহু জাঁদরেল পালোয়ানকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে৷ বাল্যসখা সাদুর সঙ্গে কুস্তিখেলায় মেতে উঠলে শত শত মানুষের ভিড় লেগে যায়। কাচারিদিঘির এপারে ডুব দিল তো দিল, ভেসে ওঠার নামগন্ধ নেই। শত শত মানুষের টান টান উত্তেজনার ভেতর ওপারের কচুরিপানার দঙ্গলে যখন সে দু-হাত উঁচু করে হাতের মুঠোয় শালুক ধরে হাসিমুখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তখন পাড়জুড়ে তুমুল হর্ষধ্বনি শুরু হয়। আধক্রোশ দূরের একটা কলাগাছের মোচা দেখিয়ে তাকে বলো তীরের ফলায় গাঁথতে, নিশান তাক করে সে একবারেই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে’’।

ঘটনা এগিয়ে যায়। যুবক শমসের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠেন। ইংরেজ রাজত্বের প্রারম্ভে জমিদার-তালুকদারের জোর-জুলুম ও লুণ্ঠনে প্রজাগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। শমসের গাজী সমগ্র অঞ্চল দখল করে শাসন শুরু করেন। দরিদ্র কৃষকের কর তিনি মওকুফ করেন। তার অর্থনৈতিক সুব্যবস্থার জন্য জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায়। মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে উপকুলীয় জনপদ থেকে তাদের বিতাড়িত  করেন শমসের গাজী। কবি সৈয়দ গদা হোসেন তার অন্তরে জ্বালিয়ে দেন জ্ঞানের অন্য এক আলো। জমিদারকন্যা দরিয়ার সঙ্গে অসফল প্রেম তার জীবনকে উন্নীত করে ভিন্ন মাত্রায়। কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একসময় তিনি অধিকার করে নেন জমিদারি। কৃষকদের সাথে নিয়ে দখল করেন ত্রিপুরার রাজত্ব। এভাবেই কাহিনি জমে উঠে। পাঠক মন্ত্রমুগ্ধ হয়।

‘হীরকডানা’ উপন্যাসের মূল চরিত্র শমসের গাজী। এ ছাড়াও জগন্নাথ সেন, জমিদার নসিরমন চৌধুরী, তার কন্যা দরিয়া বিবি, পুঁথি লেখক শেখ মনোহর, সৈয়দ গদাপীর, ত্রিপুরার উজির জয়দেব, শমসেরের বাল্যবন্ধু সাদুল্লাহ (সাদু) এসব চরিত্র স্বকৃত নোমানের নির্মাণ দক্ষতায় যথার্থ ভাবে ফুটে উঠেছে। আর ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ, সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা এবং উপন্যাসে বর্ণিত অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রকৃতি সবকিছুই ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক দারুণভাবে। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত ভাষা ব্যবহারের কুশলতায় স্বকৃত নোমান প্রশংসার দাবিদার। আর যথার্থ সংলাপ, পরিবেশ রচনা এসব একটি সার্থক উপন্যাসের প্রাথমিক শর্ত। যে সময়ের কাহিনি লেখক বলেন, সেই সময়কে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের পর সময়োপযোগী ভাষার যথাযথ শক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা স্বকৃত নোমানের আছে। রচিত সংলাপের ভেতর দিয়ে চিরায়ত কিছু রাজনৈতিক সত্যও দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ‘হীরকডানা’ উপন্যাসে। জমিদার শমসের উজির জয়দেবকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,

‘‘কে খুনি নয়? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনি খুনি নন? যুগে যুগে ত্রিপুরার রাজারা কি মানুষের রক্তে হাত রাঙাননি? সিংহাসন অধিকার করতে ত্রিপুরেশ্বর বিজয় মাণিক্য কি কম খুন করেছেন? গিলিয়ার প্রান্তরে মানুষের খুনে কি রঞ্জিত হয়নি নবাব আলীবর্দী খাঁর খঞ্জর? কুরুক্ষেত্রে অর্জুন কি হাজার হাজার মানুষ খুন করেননি? রাবণকে কি খুন করেননি রাম?’’

পলাশীর যুদ্ধের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ইংরেজদের রোষানলের শিকার হন শমসের গাজী। ইংরেজরা প্রথমত তাকে দস্যু হিসেবে অপপ্রচার চালায়। এরপর ত্রিপুরারাজের সহায়তায় সুদক্ষ ইংরেজ বাহিনী প্রেরণ করে তাকে বন্দী ও  হত্যা করে। যাই হোক, দারুণ একটা জার্নি আমার এই ‘হীরকডানা’ উপন্যাস পাঠ। বুঁদ হয়ে ছিলাম এই কদিন। এত সহজ ভাষায় এমন দুর্দান্ত নির্মাণ কিন্তু সহজ নয়। শ্রদ্ধেয় স্বকৃত নোমান, আপনি পারেন, আপনি পেরেছেন।


© দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত