শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিওর গল্প

প্রীতম বিশ্বাস

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিওর জন্ম ১৮০৯ সালের ১৮ এপ্রিল। অর্থাৎ এই বছর তাঁর বয়ঃক্রম দুশো বারো বছর সম্পূর্ণ করবে। মহান মানুষের আয়ুষ্কালকে শুধুমাত্র তার হৃদস্পন্দনঘটিত সচলতার সময়সীমা দিয়ে আমরা বিচার করি না। নইলে তো বাইশ বছরের সংকীর্ণ জীবনসীমার মধ্যেই ডিরোজিওর আয়ু নিঃশেষ হওয়ার কথা। তাঁর মৃত্যুর একশো নম্বই বছর পরে আমার এই প্রবন্ধ লিখবারও কোনও  প্রাসঙ্গিকতা থাকত না।

মনীষী মাত্রেই তাঁর মহীয়ান চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে সর্বকালের মানুষের জন্য আলোর হদিস দিয়ে যান। ডিরোজিও নিঃসন্দেহে তেমনি একজন মনীষী। যে জ্ঞানের শিখায় তাঁর চেতনা প্রদীপ্ত হয়েছিল, তাঁর সেই জ্ঞান বাইরের গুটিকয় উপদেশ সম্বলিত ছাপানো বই থেকে আহরিত হয়নি। ডিরোজিওর চৈতন্য উদ্বোধিত হয় তাঁর নিজের প্রতিভার গুণে। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যেই তাঁর মতো মানবশ্রেষ্ঠের পরিচয় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষা তো পায় সকলেই, কিন্তু ক’জন তাকে রক্তের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারে!

কলকাতার এন্টালি এলাকায় ডিরোজিওর জন্ম যে যুগে, সে সময় বাংলার দশা খুব ভাল না। ডিরোজিওর জন্মের প্রায় চল্লিশ বছর আগেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধ জিতে বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেছে। ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা কায়েম করে গজিয়ে তুলেছে ব্রিটিশ পদলেহী জমিদার শ্রেণী। কোম্পানির আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল টোল, পাঠশালা আর মাদ্রাসায় জোড়াতালি মারা।

ইংরেজ শাসনের সূচনায় পূর্বের কাঁচা শিক্ষাব্যবস্থা পাকা পরিপাটি হলেও, তার এই রূপান্তর বাহ্যিকই থেকে যায়। কারণ কোম্পানির পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলনে উৎসাহের অভাব ছিল। তাদের ভয় ছিল, ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের মনকে স্বাধীনতাকামী করে তুলবে। পরে অবশ্য কোম্পানি নিজের স্বার্থে এই মানসিকতা বদলাতে বাধ্য হয়, কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অফিস-আদালতের কর্মরথ টানবার জন্য ইংরেজি শিক্ষিত অনুগত শ্রেণীর দরকার পড়ে। ফলে যে শিক্ষা তখন চালু তার শর্ত ছিল পেটের ভাত জোগাবার। সেখানে মনকে জাগাবার কোনও ব্যবস্থা ছিল না।

এই কৃপণ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষে প্রথম মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠেন রামমোহন রায়। ইংরেজের উদ্যোগে কলকাতা সংস্কৃত কলেজের পত্তনের তিনি বিরোধী ছিলেন। সংস্কৃতের বদলে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনেই রাজা রামমোহন রায়ের আন্তরিক সায় ছিল। রামমোহনের মনোভঙ্গির সঙ্গে সেই সময়কার আপামর বাঙালির মনোভঙ্গির কোনওরকম মিল ছিল না। বাংলাদেশের চারিদিকে তখন কুশিক্ষার কাঁটাবন, অজ্ঞতার অন্ধকার আর গোঁড়ামির অচলাবস্থা। এই পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম ডিরোজিওর।

বিচিত্র রক্তের মিশ্রণে যেমন একটি জাতির শক্তিবৃদ্ধি হয়, ডিরোজিওর দুর্দম প্রাণশক্তির মূলেও হয়তো সেই বিমিশ্রতার একটা ভূমিকা ছিল। ওঁর পিতা ছিলেন পর্তুগীজ এবং মা ছিলেন ইংরেজ। দুই জাতের রক্তের আত্মীয়তায় ডিরোজিওর জন্ম। সে কারণেই হয়তো ওঁর চরিত্রে অপরিমেয় শক্তির সঞ্চার ঘটেছিল। ডিরোজিওর জীবনে এসেছিলেন এক যোগ্য শিক্ষকও। তাঁর নাম ডেভিড ড্রামন্ড।

ড্রামন্ড পরিচালিত ধর্মতলা একাডেমি স্কুলেই ছয় থেকে চোদ্দো বছর পর্যন্ত ডিরোজিওর শিক্ষাগ্রহণ। ড্রামন্ডের সংস্পর্শেই যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তার মন্ত্রে তিনি দীক্ষা নেন। তিনি ধর্মতলা একাডেমি স্কুল ছাড়েন ১৮২৩ সালে আর শিক্ষক হিসাবে হিন্দু কলেজে যোগদান করেন ১৮২৬ সালে। অর্থাৎ ড্রামন্ডের শিষ্যত্ব থেকে গুরু পদে উত্তীর্ণ হতে তাঁর সময় লেগেছে মাত্র তিন বছর।

Derozio home
কলকাতার এজেসি বোস রোডে ডিরোজ়িওর বাড়ি

স্কুলত্যাগ ও কলেজের শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যবর্তী এই তিনটি বছর তিনি সাধারণ সংসারীর পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করেছিলেন। বাধ্য ছেলের মতো পিতৃদেবের কলকাতার অফিসে কেরানির পদ বরণ করেন। তারপর যান ভাগ্যান্বেষণে কাকার ভাগলপুরের নীল কারখানায়। কিন্তু সেখানে কারখানার যন্ত্রপাতি থেকেও তাঁকে বেশি টানতে থাকে ভাগলপুরের গঙ্গার ছায়াস্নিগ্ধ তীর। সেখানে ঘুরতে ঘুরতেই তিনি নিজের কাব্যপ্রতিভা আবিষ্কার করেন। ভাগলপুরেই তিনি কাব্যসাধনার নির্বিঘ্ন অবসর পান। হিন্দু কলেজে যখন তিনি যোগ দিলেন, তখন তাঁর কাব্য প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে গেছে।

ইংরেজ শাসনের পতনের পর বাংলায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব। ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে অফিস-আদালতে বাঙালির ক্রমবর্ধমান প্রবেশ না ঘটলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হত। যাইহোক, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা ছাত্ররাই হিন্দু কলেজের ক্লাসঘর ভরিয়ে রাখত। ডিরোজিও ছাত্র হিসেবে তাঁদেরই পেলেন। বয়সে এঁরা ডিরোজিওর  প্রায় সমান। ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে বয়সের ব্যবধান কম থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গভীর সখ্য রচিত হতে বেশি সময় লাগল না।

ডিরোজিও ছাত্রদের যুক্তিবাদী ও স্বাধীন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনি ছাত্রদের সত্যের শিক্ষায় দীক্ষিত করেন যাতে তাঁরা কোনও কিছুকেই বিনা বিচারে গ্রহণ না করেন। ছাত্রদের সত্যদৃষ্টি উদঘাটনে ডিরোজিওর তৎপরতা তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর প্রবর্তনায় রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, শিবচন্দ্র দেব প্রমুখরা জাতিভেদ, কুসংস্কার ও মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন যা ‘নব্য বঙ্গ’ বা ‘ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন’ নামে মানুষের কাছে পরিচিত।

Hindu_college_calcutta1851
১৮৫১ সালের হিন্দু কলেজ যেখানে শিক্ষকতা করতেন ডিরোজ়িও

ছাত্র মহল মথিত করা এই সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিবাদে তৎকালীন সমাজ প্রচণ্ড নাড়া খায়। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজও নব্যবঙ্গ আন্দোলনকে বিষ নজরে দেখেছিল। এবং এই রক্ষণশীল গোষ্ঠীর চাপেই ১৮৩১ সালে ডিরোজিওকে শিক্ষকতার পদ থেকে সরে যেতে হয়।

ডিরোজিওর এই অপসারণই প্রমাণ দেয় তাঁর দৃঢ়চিত্ততার। একটি বাইশ বছরের যুবকের মধ্যে কতটা আপসহীন মনোবৃত্তি থাকলে, সজোরে ধাক্কা দিয়ে একটি সংস্কারগ্রস্ত সমাজের ঘুম ভাঙানোর সাহস দেখাতে পারেন! এর মধ্যেই তাঁর আন্তরিক শক্তির সত্যতার পরিচয়। নিজের ভিতরে সত্যিকারের সম্পদ না থাকলে, বাইরের মিথ্যার সঙ্গে যুঝবার এমন জোর তিনি কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। তিনি জানতেন বাইরে তাঁর কিছু হারাবার নেই আর ভিতরে যা আছে তা হরণ করবার সাধ্যও কারও নেই। তাই তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে অচল সমাজের বুকে সজোরে শেল হানতে পেরেছিলেন। প্রকৃত জ্ঞানের আত্মবিশ্বাসে সমস্ত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সরব হতে পেরেছিলেন।

তিনি দুঃসাহসি ছিলেন ঠিকই কিন্তু কঠিনপ্রাণ ছিলেন না। সেটা তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়। ছাত্র অন্তপ্রাণ এই মানুষটির মধ্যে ছিল গভীর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা। এ প্রসঙ্গে তাঁর লেখা A Walk By Moonlight কবিতার পংক্তি উদ্ধৃতিযোগ্য বলে মনে করছি, “…the grass has then a voice, / its heart I hear it beat.” যে মানুষ ঘাসের স্পন্দন শুনতে পান, তাঁর অনুভূতির সূক্ষ্মতার বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকে কি?

এখন প্রশ্ন, এমন একজন কোমল অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ কীভাবে সমাজবিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারেন? আসলে ডিরোজিও তার সময়কালের মানুষের গড় উচ্চতাকে অনেকাংশে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য আমি শরীরের উচ্চতা কথা বলছি না। শরীরের উচ্চতার তুলনায় জ্ঞান সঞ্জীবিত আত্মবিশ্বাসের উচ্চতা মানুষের দৃষ্টিকে সহস্রগুণ বেশি প্রসারিত করে।

ডিরোজিও ছিলেন নতুন যুগের জ্ঞানের পুষ্টিতে সবার উপরে মাথা তুলে দাঁড়ানো একজন মানুষ। বহু সাধনায় পাওয়া কোনও ব্যক্তিমানুষের সত্যের উপলব্ধি শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আন্দোলিত করেই সমস্ত তেজ ফুরিয়ে ফেলে না। তার শক্তি বাইরের চারপাশের মিথ্যের খড়কুটোকে উড়িয়ে পুড়িয়ে দিতে চায়। এই তেজ সে ব্যক্তির নয়, এই তেজ সেই পরম সত্যবোধের। ডিরোজিওর ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল। তাই জাত ধর্ম সংস্কার নিরপেক্ষ সত্য প্রতিষ্ঠায় তাঁকে ওইরকম মরিয়া হয়ে উঠতে দেখা যায়।

এমন খাঁটি শিক্ষার মানুষ আজও বিরল। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে চোখে পড়ে অনেক রকম দ্বিচারিতা, বিচিত্র ভন্ডামি। ডিরোজিওর ব্যক্তিত্ব এদের থেকে যে স্বতন্ত্র, তার প্রমাণ গুণে শেষ করা যাবে না। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ডিরোজিওর ভগিনীর প্রণয়মুগ্ধ হওয়ায় প্রবল বিতর্কের ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়। সমস্ত কটূক্তি ও সমালোচনার প্রত্যুত্তরে ডিরোজিও সম্পর্কের পরিণতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বিবেচনা করেন। এই মনোভঙ্গি তাঁর উদারমনস্কতারই প্রমাণ।

ডিরোজিও নিজেকে সর্বান্তঃকরণে ভারতীয় ভাবতেন। ভারতবর্ষের প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা না থাকলে এই দেশের মনস্তাত্ত্বিক আবর্জনাকে সাফ করবার জন্য তিনিই কেনই বা এত অস্থির হয়ে উঠবেন? ভারতবর্ষের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ভালবাসার প্রমাণ আছে To India – my native land কবিতায়। ভারতবর্ষের অতীত গৌরবের প্রতি ব্যাকুলতা ধরা পড়ে প্রাথমিক কয়েকটি পঙক্তিতে, যেখানে কবি বলছেন “my country! in thy days of glory/A beauteous halo circled round thy brow/and worshipped as a deity thou wast-/where is thy glory, where the reverence now?”

Derozio Tomb
ডিরোজ়িওর সমাধি

মাত্র বাইশ বছরের জীবনকালে ইতিহাসে এমন ভাস্বর হয়ে থাকা সহজ কথা না। তিনি বাঙালির সত্তাকে জাগাতে চেয়েছিলেন। অথচ আমরা বাঙালিরা তাঁকে যেন যোগ্য সম্মানের আসন দিতে পারিনি। ভারতীয়দের ইতিহাসচর্চায় ডিরোজিওর অনুপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। দুর্ভাগ্যের কথা, বর্তমান যুগ আর ডিরোজিওর যুগের মধ্যবর্তী দুই শতকের অবসরেও বাঙালি যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তাকে তাঁর জীবনে এখনো সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীভূত করে উঠতে পারল না। আজও দেখি ধর্মের নামে ভ্রষ্টাচার, শিক্ষার নেপথ্যে ভন্ডামি।

রামমোহন রায় ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। ডিরোজিও ধর্মকে কর্মসীমার একেবারে বাইরে রাখলেও, আমি মনে করি, এই দুই মহামানবের চারিত্রলক্ষণ ছিল সদৃশ। রাজা রামমোহন রায়ের পাশাপাশি ডিরোজিও-ও প্রথম আধুনিক মানুষ হিসাবে যুগ্ম স্বীকৃতির যোগ্য দাবিদার। সেই স্বীকৃতি না জানালে ১৮৩১ সালের ২৬ ডিসেম্বরের মৃত্যুদিনকেই জন্মদিবসের থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত