
বিশেষ প্রতিবেদকঃ আরগন ও বিগো ফার্মাসিউটিক্যালসের ভয়ংকর সিন্ডিকেটের সন্ধান । রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ডেমরাভিত্তিক বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক—এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন অনিয়মের পর্যায়ে নেই; বরং তা রূপ নিয়েছে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক গভীর, সুপরিকল্পিত হুমকিতে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক পরিচয়ের আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে এমন সব পণ্য, যেগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান—যার ফলাফল ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভেষজের নামে রাসায়নিক বিষ-কি আছে এসব ওষুধে ?
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যৌনশক্তিবর্ধক সিরাপ ও ক্যাপসুলে অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে— সিলডেনাফিল সাইট্রেট (যা সাধারণত প্রেসক্রিপশন ছাড়া ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ) ট্রাডালাফিল সাইট্রেট, ক্যাফেইন (অতিরিক্ত মাত্রায়), এছাড়া তথাকথিত “ভিটামিন” বা “স্বাস্থ্যবর্ধক” ওষুধে পাওয়া যাচ্ছে—গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ কেমিক্যাল সিপ্রোহেপ্টাডিন (Cyproheptadine) শক্তিশালী স্টেরয়েড গ্রুপের ডেক্সামেথাসন এবং মাত্রাতিরিক্ত সিএমসি (Carboxymethyl Cellulose), এইসব উপাদান দীর্ঘদিন সেবনের ফলে মানবদেহে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে- লিভার বিকল কিডনি নষ্ট, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, “এগুলো কার্যত ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার মতোই অপরাধ।”
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস: লাইসেন্স এক জায়গায়, অপারেশন আরেক জায়গায় : আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও তাদের কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। লাইসেন্সে ‘ল্যাবরেটরি’ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তারা বাজারে বিভিন্ন নামে পণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া তারা অনলাইনেও এই ওষুধের প্রচার প্রসার এবং ওষুধ বিক্রয় করছে। যেটার অনুমোদন তাদের নেই।
অভিযোগ রয়েছে—“ডায়কেয়ার, ‘নাইটেক্স, ‘রিস্টোর সহ বিভিন্ন পণ্য দিয়ে ডায়াবেটিস নিরাময়” বা “ইনসুলিন স্বাভাবিক হবে – এমন বিভ্রান্তিকর দাবি করা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই রোগ নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, *ডায়াবেটিস নিরাময়ের মতো দাবি করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং প্রমাণ ছাড়া এটি সরাসরি প্রতারণার শামিল।”
ডেসটিনি মডেলের পুনরাবৃত্তি? কমিশনভিত্তিক প্রতারণা নেটওয়ার্ক : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ— একটি শক্তিশালী মার্কেটিং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সারাদেশে কমিশনভিত্তিক বিক্রয় চালানো হচ্ছে।
এই নেটওয়ার্কে— সাধারণ মানুষকে “ব্যবসা” করার লোভ দেখানো হচ্ছে, রোগ নিরাময়ের গল্প ছড়িয়ে পণ্য বিক্রি বাড়ানো হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেকে এটিকে অতীতের বহুল আলোচিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতারণার নতুন সংস্করণ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
বিদেশে বসে ‘ব্যবসা’, দেশে মৃত্যুর মিছিল ? অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবু বক্কর যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারসহ অবস্থান করে বাংলাদেশে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য—“দেশের সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।” এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে, যা এই চক্রকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
হুমকি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
এই অনুসন্ধানের সময় ইকরামুল ওরফে সোহেল নামে এক ব্যক্তি এই পত্রিকার সাংবাদিককে হুমকি ধুমকি দিয়ে বলে— “আমরা অনলাইনে ব্যবসা করি আর কেমিক্যাল দিয়ে মাল তৈরি করি, কিন্তু আপনার কী? ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, আপনারা লিখে কিছুই করতে পারবেন না।”
পরবর্তীতে প্রশ্ন শুরু করলে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে ফোন কেটে দেয়।
পরবর্তীতে আমরা যাচাই-বাছাই করে জানতে পারলাম, সে আরগন ফার্মাসিটিক্যালের মালিক আবু বক্করের আপন ছোট ভাই।
আরো জানা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভুয়া নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন লোককে ফোন দিয়ে থাকে এবং অনেকের সঙ্গেই সে খারাপ আচরণ করে।
ডেমরার বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল: দেয়ালঘেরা ‘রহস্য কারখানা’ : ডেমরার মেন্দিপুর এলাকায় অবস্থিত বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কারখানাকে ঘিরে অভিযোগ আরও ভয়াবহ।
স্থানীয়দের দাবি— তিনতলা ভবনটি চারদিকে দেয়ালঘেরা গেট প্রায় সবসময় বন্ধ থাকে সাংবাদিক বা বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।
সাবেক কর্মচারীদের ভাষ্য—এখানে অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ ও ক্যাপসুল তৈরি হয়, অভিযান বা সাংবাদিক আসার খবর পেলেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, ভয়ের কারণে অনেক কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তবে মালিক শাখাওয়াত হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “সবকিছু নিয়ম মেনেই তৈরি করা হয়।”
মৃত মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে কোটি টাকার সাম্রাজ্য : সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগ— এইসব পণ্য সেবনের ফলে অসংখ্য মানুষ ধীরে ধীরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কেউ লিভার নষ্ট হয়ে, কেউ কিডনি বিকল হয়ে, কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন হারাচ্ছেন—আর সেই মৃত মানুষের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠছে কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই লুটপাটের ভাগ পাচ্ছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলও।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— “বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-এতদিন কেন এসব কার্যক্রম চলতে পারলো? কারা দিচ্ছে এই অবৈধ সুরক্ষা?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : বিশেষজ্ঞদের মতে—
অনুমোদনবিহীন বা অজানা উৎসের ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে “ভেষজ” বা “প্রাকৃতিক” নাম দেখেই বিশ্বাস করা যাবে না চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
শেষ কথা: নীরব হত্যাযজ্ঞ থামাবে কে? আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিগো ফার্মাসিউটিক্যালসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়—এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক গভীর আঘাত।
যদি দ্রুত নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়— তাহলে এই ভেষজের আড়ালে বিষের ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এখন দেখার-কর্তৃপক্ষ জাগবে, নাকি এই নীরব মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে

