
বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর নাম ঘিরে। ব্যক্তিগত জীবনের পরকীয়া সম্পর্কের অভিযোগের মধ্য দিয়েই মূলত আলোচনার কেন্দ্রে আসেন তিনি। কিন্তু অনুসন্ধানে সামনে আসছে আরও গুরুতর বিষয়—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে সমীরণ মিস্ত্রীর সম্পর্ক ছিল শুধু পেশাগত নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একই বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করা, একসঙ্গে চলাফেরা এবং এমনকি ভারত ভ্রমণের ঘটনাও দপ্তরের ভেতরে আলোচিত। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়েই একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি হয়, যা দপ্তরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদ ভবনের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগে তার দায়িত্বকালকে ঘিরে। ই/এম সার্কেল–৩-এর অধীনে ই/এম বিভাগ–৭-এ প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন সমীরণ মিস্ত্রী। এই সময়েই তাকে ঘিরে ওঠে ভয়ংকর দুর্নীতির অভিযোগ। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তিনি সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে কার্যত একজন অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাধর ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং তাকে আড়ালে “টাকাখেকো ইঞ্জিন” বলেও ডাকা হতো।
অনুসন্ধানে যেটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো তথাকথিত ‘আমব্রেলা প্রজেক্ট’। অভিযোগ অনুযায়ী, সংসদ ভবনের ভেতরে ছোট ছোট অঙ্গভিত্তিক প্রকল্প দেখিয়ে ৩০ থেকে ৪০টির মতো আলাদা দরপত্র দেওয়া হয়। কাগজে-কলমে এগুলো ছিল উন্নয়ন প্রকল্প, কিন্তু বাস্তবে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র অনুমোদন ও কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল সমীরণ মিস্ত্রীর হাতেই।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ বাস্তবে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হলেও বিল উত্তোলন করা হয়েছে পুরো অঙ্কে। কোথাও পুরোনো যন্ত্রাংশ দেখিয়ে নতুন কেনাকাটা, কোথাও অপ্রয়োজনীয় সংস্কারের নামে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক নজরদারি কার্যত অনুপস্থিত ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এতসব অভিযোগের পরও সমীরণ মিস্ত্রী এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন। গত ১ সেপ্টেম্বর তাকে ই/এম বিভাগ–৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ–১-এ বদলি করা হয়। একই সময় উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকেও সেখানে বদলি করা হয়। এই একসঙ্গে বদলির বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি অভিযোগের চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল?
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন অনেকেই। এত বড় পরিসরের দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হয়, তাহলে এটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আরেকটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ নজরুল ইসলাম
ফোন নাম্বারঃ+880 1819044472