
বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক হারুন অর রশিদ, যিনি রানা নামেও পরিচিত, তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক ও সাবেক এমপি গোলন্দাজ বাবেলের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি আন্ডার বিলিং, মিটার টেম্পারিং এবং অবৈধ পানির সংযোগে সহযোগিতা করে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। এসব অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে হারুন রানার চারটি বাড়ি রয়েছে। এগুলো টিক্কাপাড়া, ঢাকা উদ্যান, নূরজাহান রোড ও চাঁন মিঞা হাউজিং এলাকায় অবস্থিত। এছাড়াও ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ আছে। গাজীপুরের শ্রীপুর ও মাওনা, ময়মনসিংহের ভালুকা, পাইথল ও গফরগাঁও এলাকাতেও তার স্থাবর সম্পদের কথা বলা হয়েছে। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানার মাখল গ্রামে তিনি বিলাসবহুল দুইতলা বাড়ি তৈরি করেছেন, যার বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হারুন রানার মাসিক বেতন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ চাকরিতে যোগদানের সময় তার বেতন ছিল ১০ হাজার টাকারও কম। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় সহকর্মী ও গ্রামবাসীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব সম্পদ তিনি নিজের নামে না রেখে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের নামে করেছেন।
ময়মনসিংহের বিল মাখল মৌজায় বিভিন্ন দাগ ও খতিয়ানে বহু কাঠা থেকে শুরু করে একরের পর একর জমি কেনার বিস্তারিত বিবরণ অভিযোগে দেওয়া হয়েছে। এসব জমি তিনি আবুল হাসমে, সুরুজ গং, মোতালেব গং, মিরাজ মেম্বার গং, আঃ রহমান, আঃ হেকিম, নাজিম উদ্দিন, কালাম হাফেজ, আবু সাঈদসহ বহু ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই মৌজায় একাধিক একর চাষি জমি কেনার পাশাপাশি গাজীপুর ও ভালুকাতেও জমি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, গাজীপুরের শ্রীপুর ও মাওনায় টিনশেড বাড়ি, ভালুকায় জমি ও ঘর, পাগলার গয়েশপুর বাজারে বাড়ি এবং রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণের কথাও রয়েছে। গফরগাঁওয়ের পাইথলে এক একর জায়গায় মুরগির খামার, পাইথল মৌজায় বাড়ি এবং শিলাশী মৌজায় জমির মালিকানার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, মরহুম আবু তাহেরের পরিবারের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বাড়ি-ভিটা ও কবরস্থানের জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে নুরুল ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন ও সামছুদ্দিনসহ কয়েকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করার অভিযোগ রয়েছে। যারা তার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
হারুন রানার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার স্ত্রী ও কন্যার ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে এবং তার ও পরিবারের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে কোটি টাকা জমা আছে। তিনি একাধিক গাড়ির মালিক বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা মেট্রো-গ-১৭-৪৭৬৩০ নম্বরের একটি গাড়ির কথাও বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, এর আগেও দুই দফা তদন্তের পর দুর্নীতি দমন কমিশন হারুন রানাকে দায়মুক্তি দেয়। ২০১৬ ও ২০২০ সালে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে জানানো হয়। তবে গ্রামবাসী ও ওয়াসার কর্মচারীদের দাবি, তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সম্পদের কোনো মিল নেই। তাই নতুন করে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।
বর্তমানে হারুন রানা ঢাকা ওয়াসার ৩ নম্বর রাজস্ব জোনে কর্মরত। অভিযোগে বলা হয়েছে, আগের জোনগুলোতেও তিনি একই ধরনের অনিয়ম করেছেন। তিনি নিজে ডিউটি না করে বহিরাগত লোক দিয়ে কাজ করান, যা ওয়াসার নিয়মের পরিপন্থী। এমনকি তার সহকারী ও ড্রাইভারকে তিনি নিজের বেতনের কাছাকাছি বেতন দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সব মিলিয়ে অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শূন্য থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া হারুন অর রশিদ রানার উত্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার ও পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের বিবরণসহ আরও একটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

